• বর্গী হানার সেই পথ এখনও রয়েছে
    এই সময় | ০৮ জুন ২০২৬
  • প্রশান্ত পাল, পুরুলিয়া

    ‘ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো, বর্গী এল দেশে।’ বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় ছড়ার এই লাইনের সঙ্গে বাঙালির পরিচয় যেন চিরকালীন। যে পথ ঘরে বর্গীরা হানা দিয়েছিল বাংলায়, সেই পথ পুরুলিয়া-বাঁকুড়া হয়ে মিশেছে কলকাতায়। চৈনিক পর্যটক হিউয়েন সাং যে পথ দিয়ে বাংলায় এসেছিলেন। সেই রাস্তাই পুরুলিয়া-বাঁকুড়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় ‘অহল্যাবাই রোড’ নামে পরিচিত।

    ১৮৭৩’৭৪–এ রচিত ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক জেডি বেগলারের ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে রিপোর্ট’ থেকে তৎকালীন মানভূমের বা অধুনা পুরুলিয়ার বুকে ছড়িয়ে থাকা যে তিনটি প্রধান রাস্তার কথা জানা যায়, তার অন্যতম ছিল অহল্যাবাই রোড। কলকাতা থেকে বারাণসী, পুরুলিয়া-বাঁকুড়ার বুক চিরে চলে যাওয়া এই রাস্তাটি অন্যতম বিখ্যাত প্রাচীন রাস্তা।

    জেলার অন্যতম লোক গবেষক সুভাষ রায় জানাচ্ছেন, অহল্যাবাই ছিলেন মালব প্রদেশের রানি। ইন্দোর ছিল তাঁর রাজধানী। মলহর রাওয়ের ছেলে কুন্তজির স্ত্রী। অল্প বয়সে স্বামীহারা হয়েছিলেন তিনি। নিজের ছেলেকে সিংহাসনে বসালেও স্বল্পকালের মধ্যে তার মৃতু হয়। ১৭৬৬–তে ৩১ বছর বয়সে অহল্যাবাই নিজের হাতে শাসনভার তুলে নেন। বারাণসী থেকে কলকাতা, এই পথের সংস্কার করেন তিনি। তারপর থেকে তাঁর নামানুসারে রাস্তাটি অহল্যাবাই রোড নামে পরিচিতি পায়।

    বাঁকুড়া থেকে পুরুলিয়ার তালাজুড়ি, রঘুনাথপুর, দুবড়া, পাহাড়িগোড়া হয়ে ঝাড়খণ্ডের চাষ, চন্দনকিয়ারি, বোকারো দিয়ে বারাণসী পর্যন্ত চলে গিয়েছে এই রাস্তা। সরকারি নথিতে অবশ্য এই রাস্তার পরিচিতি রঘুনাথপুর-চাষ রোড। অতীতে যে রাস্তার নাম ছিল ‘উত্তরাপথ’ বলে জানাচ্ছেন গবেষকেরা। ১৭৪২–৫২–এ বর্গীরা এই পথ ধরে বাংলা এবং ওডিশায় আক্রমণ চালিয়েছিল। এই পথ ধরে বখতিয়ার খিলজি অতর্কিতে লক্ষ্মণ সেনের রাজধানী আক্রমণ করেছিলেন।

    বর্গী হানার পরবর্তী সময়ে ১৮২১–এ কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম থেকে ১২ কিলোমিটার অন্তর হাওড়া, হুগলি, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া জেলা হয়ে বিহারের মুঙ্গের পর্যন্ত রাস্তার সমান্তরালে পোড়া ইটের উঁচু টাওয়ার তৈরি করা হয়েছিল। যেগুলিকে সিমাফোর স্তম্ভ বা অবজ়ারভেটিভ টাওয়ার বলা হতো। ১৮২১-এ এই স্তম্ভগুলি গড়ে উঠেছিল প্রথমে লে ওয়েস্টন ও পরে ক্যাপ্টেন প্লেফেয়ারের নেতৃত্বে। টেলিগ্রাম পূর্ববর্তী ব্যবস্থায় আলোক সঙ্কেতের মাধ্যমে তথ্যের আদা–নপ্রদান ছিল উদ্দেশ্য। পুরুলিয়ায় এই অহল্যাবাই রোডের উপরেই আজও কয়েকটি সিমাফোর স্তম্ভ দাঁড়িয়ে রয়েছে। টেলিগ্রাম আবিষ্কৃত হওয়ার পরে এই স্তম্ভগুলি গুরুত্ব হারায়।

    ইতিহাস গবেষকদের অনেকেই জানাচ্ছেন, গঙ্গাসাগর যাওয়ার জন্য রানি অহল্যাবাই এই রাস্তার সংস্কার করেছিলেন। সুভাষ বলছেন, ‘এই সম্ভাবনাই প্রবল। কারণ সেই সময়ে রাস্তাগুলি হয় তীর্থযাত্রার জন্য, না–হলে ব্যবসার জন্যই মূলত ব্যবহৃত হতো।’

  • Link to this news (এই সময়)