পুলিশের হেলমেট চুরি করে সটান উৎপল দত্তের শুটিং-এ, তার পর…
এই সময় | ০৮ জুন ২০২৬
১৯৯০ সালের গোড়ার দিকের ঘটনা। সকাল থেকেই জোর তৎপরতা চলছে কলেজ স্ট্রিটের ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট মঞ্চে। উৎপল দত্তের ‘টিনের তলোয়ার’-এর শুটিং চলবে সারাদিন। বিশাল ঝক্কি পোয়াতে এমনিতেই অতি ব্যস্ত উৎপল দত্ত। তার উপর ট্র্যাফিক পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছেন দীপ্তেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। সব যখন রেডি, হঠাৎ দেখা গেল ট্র্যাফিক পুলিশের মাথার হেলমেটটাই নেই। মানে গোডাউন থেকেই আসেনি। মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল দপ করে। উৎপল দত্ত রেগে গেলে যা হয়, প্রায় মারামারি, চিৎকার-চেঁচামেচি, ভাঙচুর-কিছুই আর বাকি রাখলেন না তিনি। শুটিংয়ের সব দায়িত্ব বা তত্ত্বাবধানে ছিলেন মনু দত্ত। তাঁকেই দায়িত্ব দেওয়া হলো এই সমস্যার আশু সমাধানের জন্য। উৎপল দত্তের ক্রোধ কমাতে তিনি যে কর্মটি করেছিলেন তা আজও এক ইতিহাস।
আসল ঘটনাটি বলার আগে বলে নেওয়া দরকার, কে এই মনু দত্ত? সেই সময়ে মনু দত্তকে বলা হতো ‘বাংলা থিয়েটারের মুশকিল আসান’। ফ্রিৎস বেনেডিৎস, শ্রীরাম লাগু, বিবি করন্থ, অমল পালেকর, হাবিব তনবির, পরেশ রাওয়াল, ওম পুরি, নানা পটেকর তো বটেই। এ ছাড়াও শ্যামানন্দ জালান, কুমার রায়, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, উৎপল দত্ত প্রমুখ নাট্য-নির্মাতাদের সঙ্গে তাঁর শিল্প ভাবনার আদান-প্রদানের সেতু ছিলেন তিনি-ই। সুতরাং, এই মনু দত্ত এমন সমস্যায় যে পথে নামবেন তা বলাই বাহুল্য।
তিনি ট্যাক্সি ধরে অ্যাকাডেমির উদ্দেশে রওনা হলেন। কারণ, ওখানেই থিয়েটারের গোডাউন, ওখানেই রয়েছে হেলমেট। রাস্তা তো কম নয়। সময়ও লাগবে। হঠাৎ মনু দত্ত খেয়াল করলেন সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ-এ একজন ট্র্যাফিক সার্জেন্ট হেলমেট খুলে সিটের উপর রেখে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আর দেরি করা নয়, নিমেষে সেই হেলমেট নিয়ে ছুট লাগালেন মনু দত্ত। চোরকে ধরতে পুলিশও তার পিছু নিল। এ যেন দিনদুপুরে চোর পুলিশের জোর লড়াই। ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট মঞ্চের ভিতরে এসে থামল তাদের দৌড়। হলের মধ্যে ঢুকেই মনু দত্ত ততক্ষণে হেলমেটটি তুলে দিয়েছেন দীপ্তেশবাবুর হাতে। সেই সময় উৎপল দত্তের নজরে এল একজন পুলিশ অফিসার শুটিং স্পটে ছুটে এসে কাউকে খুঁজছেন।
‘হ্যালো অফিসার। এখানে এখন অভিনয়ের মহড়া চলছে। আপনার আগমনের কারণ যদি জানতে পারি।’
‘এখনই একজন চোর পুলিশের হেলমেট চুরি করে এখানে এসে ঢুকেছে।’
‘এখানে তো সবাই কলাকুশলী আর প্রোডাকশনের নিজস্ব লোক। আপনার বুঝতে কোথাও ভুল হচ্ছে না তো?’
‘ভুল নয়। আমাকে সেই লোকটিকে ধরিয়ে দিন প্লিজ।’
পুলিশ অফিসার নাছোরবান্দা। চোর উনি ধরবেনই।
উৎপলবাবু পুরো ব্যাপারটি এ বার বুঝতে পারলেন। হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়লেন। একটি চেয়ার এনে পুলিশ অফিসারকে বসিয়ে চা আর টিফিন খাওয়ালেন। বললেন, ‘স্যর, না খেলে কিন্তু চোর ধরে দেবো না।’ উৎপল দত্তের মতো অভিনেতার প্রতিশ্রুতি পেয়ে তিনি সেই আপ্যায়ন গ্রহণ করলেন। তিনিও ভাবতে পারেননি, হেলমেট চোর ধরতে গিয়ে এত বড় অভিনেতার দর্শন পাবেন।
সে দিন এই ঘটনায় শুটিং কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল। ইতিমধ্যেই ভয়ে লুকিয়ে থাকা মনু দত্তকে খুঁজে আনা হলো সেই পুলিশ অফিসারের সামনে। গ্রেপ্তার নয়, তিনিও হাসতে হাসতে জড়িয়ে ধরলেন মনু দত্তকে। শুধু একটা কথাই বলেছিলেন, ‘অভিনয়কে কেউ এত ভালোবাসতে পারেন, আমার জীবনের আরও একটি বড় অভিজ্ঞতা হলো।’