• ভারতে বর্ষার বিন্যাস পাল্টাচ্ছে ‘আটলান্টিক কোল্ড ব্লব’
    এই সময় | ০৮ জুন ২০২৬
  • কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

    প্রশ্নটা উঠেই গেল। ভারতের দক্ষিণ–পশ্চিম মৌসুমি বাতাস কি তার গতিপথ ক্রমশ পাল্টে ফেলছে? জুন থেকে সেপ্টেম্বর— দেশে বর্ষার প্রধান চারটি মাসে বৃষ্টিপাতের বিন্যাসেও কি সেই পরিবর্তিত গতিপথের প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে? বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের প্রতিটি রাজ্যে বৃষ্টিপাতের প্যাটার্ন বিশ্লেষণের পরে এমনই ইঙ্গিত পেতে শুরু করেছেন আবহবিদরা।

    তাঁরা দেখছেন, গাঙ্গেয় অববাহিকায় বৃষ্টির পরিমাণ ক্রমশ কমছে এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের দিকে বর্ষার চার মাসে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়ছে।কিন্তু কী কারণে এই অবস্থা?ভারত থেকে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার দূরের গ্রিনল্যান্ডের কাছাকাছি আটলান্টিক মহাসাগরের উপরের একটি শীতল অংশের প্রভাবেই নাকি ভারতে বর্ষার এমন চরিত্র পরিবর্তন।

    ওই শীতল অংশকে বলা হচ্ছে 'আটলান্টিক কোল্ড ব্লব'।কান টানলে মাথা আসার মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই, কারণ কান তো মাথার সঙ্গেই লেগে রয়েছে। কিন্তু একটি জায়গা যদি 'কলকাঠি নেড়ে' তার প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার দূরের কোনও জায়গার জলবায়ুর উপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তা হলে? যে কারণে 'আটলান্টিক কোল্ড ব্লব'–এর আচরণ এবং তার প্রভাব অবাক করছে বিজ্ঞানীদের।

    তাঁরা দেখছেন, গত প্রায় সিকি শতকে ভারতের দক্ষিণ–পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর চরিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে চলেছে। দেশের উত্তর-পশ্চিম অংশে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। উল্টো দিকে, বৃষ্টির ঘাটতির ফলে গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে অর্থাৎ গঙ্গা-যমুনা অববাহিকার সমতলে বৃষ্টি ক্রমশ কমে খরার ঝুঁকি বাড়ছে।উর্বর জমি থাকায় এবং বিপুল পরিমাণে খাদ্যশস্য ও অন্যান্য কৃষিজাত সামগ্রী উৎপাদিত হয় বলে ভারতের প্রায় ১৫০ কোটি মানুষ গাঙ্গেয় সমভূমির উপর নির্ভরশীল।

    তা ছাড়া ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকশো কোটিরও বেশি মানুষের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করে দক্ষিণ–পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে নামা বৃষ্টির উপর। তার জন্যই বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে সাক্ষাৎ প্রাণস্বরূপ মৌসুমি বাতাসের গতিপথের পরিবর্তন হলে এবং তার ফলে বর্ষার চার মাসে বৃষ্টির বিন্যাস পাল্টে গেলে দক্ষিণ এশিয়ায় বড় দুর্ভোগ নেমে আসবে।তবে মৌসুমি বায়ুর গতিপথ পরিবর্তন সংক্রান্ত বিষয়ে নির্ভুল পূর্বাভাস দিতে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সমস্যার মুখে পড়ছেন। কারণ, বর্তমানে ব্যবহার হওয়া বহু জলবায়ু–মডেল ধরতে পারছে না মৌসুমি বায়ুর চরিত্রগত পরিবর্তনগুলো।

    'আমেরিকান জিওফিজ়িক্যাল ইউনিয়ন'-এর সম্পূর্ণ ওপেন-অ্যাকসেস বিজ্ঞান-পত্রিকা 'এজিইউ অ্যাডভান্সেস'–এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে দেখানো হয়েছে, বর্তমানে যে জলবায়ু–মডেলগুলো ব্যবহার করা হয়, সেগুলো আটলান্টিক মহাসাগরের তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং সেই পরিবর্তনের সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের আবহাওয়ার সম্পর্ককে ঠিকঠাক ভাবে ধরতে পারে না। ফলে, এই জলবায়ু–মডেলগুলো মৌসুমি বায়ুর পরিবর্তন আগাম ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই প্রসঙ্গেই উঠে এসেছে 'কোল্ড ব্লব'-এর বিষয়টি।

    বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, 'কোল্ড ব্লব' হলো গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণে আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত অস্বাভাবিক শীতল জলের একটি বড় অঞ্চল। গবেষকরা জলবায়ু–মডেলে এই কোল্ড ব্লব–এর প্রভাব যোগ করে দেখতে পাচ্ছেন, এটি 'জেট স্ট্রিম'-এর গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। জেট স্ট্রিম কী? জেট স্ট্রিম হলো মাটির প্রায় ৯ থেকে ১৬ কিলোমিটার উপর দিয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে প্রবাহিত সরু অথচ দীর্ঘ একটি 'বাতাসের নদী'।

    এর প্রভাবে বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা উত্তর-পশ্চিম ভারতের দিকে বেশি সরে যায়, একই সঙ্গে অন্য কিছু অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির আবহাওয়া– ব্যবস্থা গঠনের সম্ভাবনাও কমে।বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, গত কয়েক বছরে ভারতে মৌসুমি বায়ুর আচরণে যে পরিবর্তন দেখা গিয়েছে, এই ব্যাখ্যাটি তার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। যখন বৃহৎ পরিসরের বায়ুপ্রবাহের ধরন ছোট পরিসরের আবহাওয়া–ব্যবস্থার বিকাশকে বাধা দেয়, তখন তাকে বলে 'ব্যারোট্রপিক গভর্নর মেকানিজ়ম'। এই মেকানিজ়ম ইদানীং ভারতের মতো বিশ্বের মধ্য-অক্ষাংশীয় অঞ্চলগুলোয় ঝড়ের কার্যকলাপ বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতেও সাহায্য করে।

  • Link to this news (এই সময়)