• তোলাবাজি হয়েছে, এবং তাতে রাশ টানা যায়নি, অকপট সৌগত
    এই সময় | ০৮ জুন ২০২৬
  • গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সময়ে ‘বিবেকের’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন তিনি। দলের মধ্যে সব যে ঠিক চলছে না, তা নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্যও করেছেন।তবে তথাকথিত ‘বিদ্রোহী’ বা ‘বেসুরো’ হননি। এ বার বিধানসভা ভোটে তাঁর দলের যে এ ভাবে ভরাডুবি হবে, তা অনেকের মতো ভাবতে পারেননি বর্ষীয়ান তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়ও। তবে রেজ়াল্টের কাটাছেঁড়া করতে গিয়ে সরাসরি নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ভুলকেই কাঠগড়ায় তুলছেন তিনি। ভোটকুশ‍লী সংস্থার হাতে পার্টির দায়িত্ব তুলে দেওয়াও ঠিক হয়নি বলে মত প্রবীণ এই রাজনীতিকের। পাশাপাশি বর্ষীয়ান সাংসদ মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করছেন যে, তৃণমূলের নীচের তলায় তোলাবাজি সাধারণ মানুষের মনে নেগেটিভ প্রভাব ফেলেছে।

    কেন খারাপ ফল? এমন হার কি দূরবর্তী ভাবন‍াতেও ছিল?

    সৌগতর জবাব, ‘আমি তো ভাবিনি। আমাদের ভাবনায় বোধহয় ভুল ছিল। এই রকম রেজ়াল্ট হবে, আমি ভাবতে পারিনি।’ স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের (সার) ‘অ্যাজুডিকেশনে’ ২৭ লক্ষ নাম বাদ পড়াকে একটা বড় কারণ বললেও এটাকেই মুখ্য কারণ বলে মনে করেন না তিনি। প্রবীণ সাংসদের কথায়, ‘পার্টিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অল্প লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এই যে ৭৪ জন (সিটিং) বিধায়ককে হয় টিকিট দেওয়া হলো না, না হয় আসন বদলে দেওয়া হলো— এটারও প্রভাব পড়েছে।’

    এ প্রসঙ্গেই তিনি দলের নিযুক্ত ভোটকুশলী সংস্থার নাম করেই বলছেন, ‘ওদের ভূমিকা তো খুবই খারাপ। এ ব্যাপারে আমি তেমন কিছু জানি না। কারণ আমার সঙ্গে ওরা কথাও বলেনি, দেখাও করেনি।’ তাঁর সংযোজন, ‘আমি ভাবি, কী করে কিছু শিক্ষিত ছেলে, যাঁদের রাজনীতিতে কোনও অভিজ্ঞতা নেই, যাঁরা এই রাজ্যের লোক নন, একটা অফিসে বসে, কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে, তাঁরা বলে দেবেন ভোটে কী করা উচিত! এটার প্রভাব ব্যাপক।’

    এ নিয়ে দলে ক্ষোভের কথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কান পর্যন্ত কি পৌঁছয়নি?

    সৌগতর জবাব, ‘পৌঁছেছিল, ওরা মানেনি। ওদের (ভোটকুশলী সংস্থা) উপরেই নির্ভর করেছে। সেটা ওদের সিদ্ধান্ত।’

    এর দায় কার?

    ‘দায় তাঁদের সবার, যাঁরা এই সিদ্ধান্ত িনয়েছিলেন’— সোজা জবাব সৌগতর। বিজেপির ক্ষমতায় আসার পিছনে পদ্ম-পার্টির হাওয়াও যে বড় ভূমিকা নিয়েছে, সেটাও মেনে নিচ্ছেন সৌগত। তাঁর কথায়, ‘বিজেপির কোনও সংগঠনই ছিল না। ওদের পক্ষে একটা হাওয়া ছিল। এখনও নীচের তলায় যে কর্মীদের দেখা যাচ্ছে, সেটা খুবই নিম্ন মানের। ওদের পক্ষে হাওয়া ছিল, কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থন ছিল। মোদী বারবার মিটিং করেছেন, অমিত শাহ ১৫ দিন একটানা ছিলেন। টাকার কোনও অভাব ছিল না ওদের। বিজেপির কেন্দ্রীয় স্তরের নেতারা এসে দিনের পর দিন এখানে নীরবে কাজ করেছেন।’ একইসঙ্গে নির্বাচন কমিশন পরিচালিত ‘সার’ প্রক্রিয়ায় শুধু ‘অ্যাজুডিকেশনে’র মাধ্যমে ২৭ লক্ষ লোককে বাদ দেওয়া, বিশেষ করে যে সব জায়গায় তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক তুলনায় মজবুত ছিল, সেখানে নাম বাদ পড়াটা যে ফ্যাক্টর হয়েছে— সেটাও জানাচ্ছেন সৌগত। তাঁর সংযোজন, ‘কাউন্টিংয়ের মাঝপথেও তৃণমূলের কাউন্টিং এজেন্টদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠান বিরোধী একটা হাওয়া তো ছিলই। তার উপরে বিজেপি হিন্দু ভোটের মেরুকরণ করেছিল। সবটা মিলে আমরা হেরে গিয়েছি।’

    কিন্তু এগুলোই হারের নেপথ্যে সবকিছু নয়। সৌগত মানছেন, দুর্নীতি একটা বড় ইস্যু ছি‍ল। তাঁর কথায়, ‘দুর্নীতির বড় ঘটনা হচ্ছে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি। এটা তো সামনে চলেই এসেছিল, তখনই এটা সংশোধন করা যেত। পরে সংশোধনের চেষ্টা হলেও তার মধ্যে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গিয়েছে।’ তাঁর সংযোজন, ‘আর বাকি যে দুর্নীতি, সেটা পার্টির নীচের স্তরের দুর্নীতি, যাকে তোলাবাজি বলে, সেটা হয়েছে। এবং, সেটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। আমাদের যাঁরা এমএলএ ছিলেন, যাঁরা লোকাল নেতা ছিলেন, তাঁরা হয় তোলাবাজি করেছেন, নয় তোলাবাজিতে উৎসাহ দিয়েছেন। আর তা না হলে তোলাবাজিতে বাধা দেননি।’

    পার্টি যখন ক্ষমতায়, তখন সৌগতই প্রশ্ন তুলেছিলেন, দলীয় কাউন্সিলাররা যে এত মেলা-খেলা করছেন, এত টাকা পাচ্ছেন কোথা থেকে? সেই কথা কি কানে ওঠেনি নেতৃত্বের? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে বা কানে এই প্রসঙ্গ তোলার চেষ্টা করেছিলেন? সৌগতর জবাব, ‘দু’-একবার করেছি। বেশি মিটিং তো আর হয়নি তাঁদের সঙ্গে!’ তার জন্য দুঃখ হয় না? সাংসদের জবাব, ‘আমি একটা রাজনৈতিক দলে জেনেবুঝেই বেছে নিয়েছি। সেই রাজনৈতিক দলের সিম্বল নিয়ে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছি, জিতেছি। সুতরাং এখন দলকে দোষ দেবো কেন? হারের দায় আমিও নিচ্ছি।’

    সংখ্যালঘু তোষণ কতটা প্রভাব ফেলল? প্রবীণ সাংসদ বলেন, ‘বিজেপির ক্ষেত্রে পজ়িটিভ হলো। মুসলিমরা এই রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ। তাঁদের অধিকাংশের অবস্থা যে খুব খারাপ, সাচার কমিটির রিপোর্টে তা বেরিয়ে আসে। যদি মুসলিমদের জন্য কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ করা হয়ে থাকে, তা নিয়ে আপত্তির কী থাকতে পারে! কিন্তু তা নিয়ে বিজেপি একটা ন্যারেটিভ তৈরি করল। আমরা তার মোকাবিলা করতে পারিনি।’ আরজি করের মতো ঘটনাকেও হারের নেপথ্য কারণ হিসেবে দেখছেন সৌগত। বলছেন, ‘আরজি কর ডেফিনিটলি একটা বড় ইস্যু। এটা তখনই বোঝা গিয়েছিল। পরবর্তীতে আমরা এতে অ্যাটেনশন দিইনি।’ আগে থেকে যদি সেটাকে গুরুত্ব দেওয়া যেত, তা হলে কি ভালো হতো? ‘নিশ্চয়ই, অনেক আগেই এটা ডিল করা উচিত ছিল।’

    এতকিছুর পরেও তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়ক জিতেছেন। কিন্তু এখনই কলকাতায় তো বটেই, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে, পুরসভায় ভাঙন, মেয়র-কাউন্সিলারদের পদত্যাগ চলছে। এই ভাঙনের জায়গা কেন তৈরি হচ্ছে? এই মুহূর্তে কি পার্টির রাস্তায় নামার প্রয়োজন নেই?

    সৌগত বলছেন, ‘নিশ্চয়ই রয়েছে। তবে আমরা হেরেছি এক মাসও হয়নি। সব পার্টিই হেরে গেলে ওঠার জন্য একটা সময় লাগে। আমাদের কর্মীদের বিরুদ্ধে কেস দিচ্ছে, মারছে, তাদের বাড়ি ভাঙচুর করছে, পার্টি অফিস বন্ধ করে দিচ্ছে। এটাকে সামলে তো রাস্তায় নামতে হবে।’ কিছুটা স্বগতোক্তির সুরে তাঁর সংযোজন, ‘যে কোনও রাজনৈতিক দলে কিছু লোক থাকে, যারা দুর্বল, যাদের মনের জোর নেই, কোমরের জোর নেই। তারা এক সময়ে দলে থেকে সুবিধা নিয়েছে। এটা এক দিক থেকে ভালোই হচ্ছে।’

    বিজেপি নেতৃত্ব তো বটেই, এমনকী কংগ্রেসও বলতে শুরু করেছে, তৃণমূল দলটাই থাকবে না। জবাবে সৌগত বললেন, ‘বলা খুব সহজ। আমরাও আগে বলতাম যে, কংগ্রেস উঠে গিয়েছে, বিজেপির কিছু নেই। কিন্তু তা কি হয়েছে?’ তা হলে কী করে ঘুরে দাঁড়াবে দল? তাঁর জবাব, ‘রাস্তায় নামতে হবে। বিজেপির এই যে অত্যাচার, তার বিরুদ্ধে। কারণ, আসল ইস্যু তো অ্যাড্রেসড হচ্ছে না। এই যে পেট্রল, ডিজে়লের দাম বাড়ছে। এটা নিয়ে রাস্তায় নামতে হবে। পাবলিককে তো বিজেপি ডিস্টার্ব করবে, কিন্তু পাবলিককে ইস্যুটা ধরিয়ে দিতে হবে।’

    কিন্তু ধরাবেন কে? কারণ, সৌগতর এই সাক্ষাৎকারের পরে তো দলের ভাঙন স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে প্রতিদিন।

  • Link to this news (এই সময়)