করণ আদানি সহ একাধিক শিল্পপতির সঙ্গে পরপর মিটিং শুভেন্দুর, তালিকায় কারা?
আজ তক | ০৮ জুন ২০২৬
গত ৯ মে ব্রিগেডে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। দেখতে দেখতে একমাস হয়ে গেল। পরিবর্তনের এক মাসেই বাংলা দেখল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকারের একাধিক বড় ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। মহিলাদের জন্য প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকার 'অন্নপূর্ণা যোজনার' ঘোষণা থেকে শুরু করে বিনামূল্যে বাসযাত্রা, সরকারি চাকরির বয়সসীমা ৪৫ বছর করা এবং আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প চালু তারমধ্যে অন্যতম। শুধু সরকারি প্রকল্প চালুই নয় রাজ্যে বড় শিল্প আনার লক্ষ্যে এগোচ্ছে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
প্রসঙ্গত, এ বারের বিধানসভা ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রচারের হাতিয়ারগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল রাজ্যের শিল্প পরিস্থিতি। তৃণমূল জমানায় কতগুলি কোম্পানি বাংলা থেকে ব্যবসা গুটিয়ে ভিন রাজ্যে চলে গিয়েছে, সেই পরিসংখ্যান তুলে ধরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে লাগাতার বিঁধেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী, শমীক ভট্টাচার্য, সুকান্ত মজুমদাররা। এখন বিজেপি–ই শাসক শিবিরে। ফলে দেশ এবং পৃথিবীর বড় উদ্যোগপতিদের বাংলায় বিনিয়োগ করার আর্জি নিয়ম করে জানাচ্ছেন বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্ব। গত ৪ মে বিধানসভা ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই শিল্প ও বণিকমহলকে বিজেপি একটাই বার্তা দিতে চাইছে— নতুন পশ্চিমবঙ্গ ‘ইনভেস্টর ফ্রেন্ডলি’। সেই বার্তা আরও জোরালো করতে সম্প্রতী কলকাতার ‘ভারত চেম্বার অফ কর্মাস’–এর মঞ্চ থেকে রাজ্যের বণিকমহলকে ‘একশো দিনের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। গত একমাসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুও বাংলায় শিল্প আনার জন্য একাধিক শিল্পপতির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তালিকায় কারা রয়েছেন? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো (L&T)-র চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক
রাজ্যের পরিকাঠামো উন্নয়ন, বিপুল বিনিয়োগ টানতে এবং যুবসমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে গত শনিবার কলকাতায় এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন মুখ্যমন্ত্রী। কলকাতা বিমানবন্দরে দেশের প্রথম সারির পরিকাঠামো ও নির্মাণ সংস্থা লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো (L&T)-র চেয়ারম্যান তথা ম্যানেজিং ডিরেক্টর (CMD) এস এন সুব্রহ্মণ্যনের সঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন তিনি। প্রায় ৩০ মিনিটের এই সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠকে বাংলার শিল্পের পুনরুজ্জীবন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বৈঠক শেষে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে একটি পোস্ট করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই বৈঠককে অত্যন্ত 'ফলপ্রসূ এবং দূরদর্শী' বলে বর্ণনা করেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী লিখেছিলেন, 'কলকাতা বিমানবন্দরে লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো (L&T)-র সিএমডি এস এন সুব্রহ্মণ্যন মহাশয়ের সঙ্গে এক অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও গঠনমূলক বৈঠক সম্পন্ন হলো। আমাদের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল পশ্চিমবঙ্গের শিল্পক্ষেত্রের পুনরুজ্জীবন।' তিনি আরও জানান, রাজ্যে শিল্পোন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী পরিকাঠামো (Robust Ecosystem) গড়ে তোলা, মেগা বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং অর্থনৈতিক গতি বৃদ্ধি করে রাজ্যের যুবকদের জন্য অর্থপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার বিষয়ে তাঁদের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ মতবিনিময় হয়েছে। রাজনৈতিক ও শিল্প মহলের মতে, নবান্নে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের সঙ্গে মেগা রেল প্রকল্পগুলি নিয়ে বৈঠকের পর, এলঅ্যান্ডটি (L&T) প্রধানের সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর এই বিমানবন্দর-বৈঠক অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। রাজ্যে লগ্নি টানতে এবং বন্ধ হয়ে থাকা বড় বড় শিল্প প্রকল্পগুলিকে পুনরায় চালু করতে নতুন সরকার যে অত্যন্ত তৎপর, মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘনঘন বৈঠক ও তৎপরতা সেটাই প্রমাণ করছে।
আমূল কর্তার আশ্বাস
অন্যদিকে, গত শনিবার নবান্নতে এক বৈঠকে রাজ্যে বিনিয়োগের আশ্বাস দিয়েছেন আমূল কর্তাও। রাজ্য সরকার থেকেও সমস্ত ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই বৈঠক প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছিলেন, 'নবান্নে গুজরাত কো-অপারেটিভ মিল্ক মার্কেটিং ফেডারেশন (GCMMF)-এর সম্মানীয় ম্যানেজিং ডিরেক্টর শ্রী জয়েন মেহতা মহোদয় এবং কায়রা ডিস্ট্রিক্ট কো-অপারেটিভ মিল্ক প্রডিউসার্স ইউনিয়ন তথা আমূল ডেয়ারির কর্ণধার শ্রী অমিত ব্যাস মহোদয়ের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশগ্রহণ করলাম। আগামিদিনে পশ্চিমবঙ্গে আমুলের মতো বৃহৎ, স্বনামধন্য সংস্থার বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দুগ্ধশিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গে সংস্থার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং দুগ্ধ শিল্পের উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে এবং আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গ ও আমূলের পারস্পরিক সহযোগিতায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আমি আশাবাদী।' জানা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে মেগা প্রকল্প আনতে চলেছে দেশের স্বনামধন্য দুগ্ধ উৎপাদক সংস্থা আমূল (Amul)।
শুভেন্দু-আদানি বৈঠক
রাজ্যে বিজেপি সরকার গড়তেই বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে আদানি গোষ্ঠীও। গত সপ্তাহে গোষ্ঠীর কর্ণধার গৌতম আদানির পুত্র করণ আদানি নবান্নে এসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করেন। নবান্ন সূত্রে এই সাক্ষাৎ সৌজন্যমূলক বলে জানানো হলেও প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে দু'জনের বৈঠক চলে। আদানি গোষ্ঠীর পক্ষে রাজ্যে বন্দর, ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ ও রাস্তা সহ পরিকাঠামোয় বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। প্রসঙ্গত, এক সময়ে তাজপুরে গভীর সমুদ্র বন্দরে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছিল এই গোষ্ঠী। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য জানিয়ে দেন , জমি না থাকার ফলে তাজপুরে গভীর সমুদ্রবন্দর হওয়া সম্ভব নয়। বিকল্প হিসাবে দাদনপত্রবাড়ে হতে পারে গভীর সমুদ্রবন্দর। আদানিকে সেই প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার আগেই জানিয়েছিল তাদের মূল লক্ষ্য হল কর্মসংস্থান । আর সেই লক্ষ্য পূরণের জন্যই শিল্পে বিনিয়োগ করতে চাইছে সরকার । রাজ্যে ক্ষমতার বড়সড় রদবদলের পর শিল্প পরিকাঠামো পুনর্গঠন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কোমর বেঁধে নেমেছে নতুন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, রাজ্যের মূল লক্ষ্য হলো দ্রুত কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং লজিস্টিক হাব গড়ার মাধ্যমে রাজ্যকে বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত করা।