• এবার মমতার হাতছাড়া সংসদীয় দল ! NDA-কে সমর্থনের চিঠি 20 তৃণমূল সাংসদের
    eTV Bharat | ০৮ জুন ২০২৬
  • নয়াদিল্লি/কলকাতা, 8 জুন: পশ্চিমবঙ্গের বিধায়কদের পর এবার সাংসদরাও তৃণমূল কংগ্রেসকে এবং তার সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বড়সড় ধাক্কা দিয়েছেন। তৃণমূলের সাংসদ কাকলি ঘোষদস্তিদার জানিয়েছেন, লোকসভার 20 জন সাংসদ স্পিকারকে চিঠি লিখেছেন এবং NDA-কে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দলের সাংসদদের এই বিদ্রোহের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক বলয়ে অস্তিত্ব সঙ্কট আরও বেড়েছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের বিশেষজ্ঞরা।

    আজকাল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও দিল্লিতে আছেন। তিনি ইন্ডিয়া ব্লক-এর মিটিংয়ে যোগ দিতে গিয়েছেন। তবে, দিল্লিতে পৌঁছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল সাংসদদের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার কথা ছিল। এর আগেই দলের 20 জন সাংসদ 'বিদ্রোহ'-এর পথ বেছে নিয়েছেন। রাজ্য বিধানসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ছেড়ে 58 জন বিধায়কের বিদ্রোহী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরে যোগ দেওয়ার পর, এবার খাস দিল্লির বুকেও দেখা গেল ঠিক সেই একই ছবি। সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত ভরাডুবির পর থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের সময়টা একেবারেই ভালো যাচ্ছে না। একদিকে ক্ষমতাচ্যুতি, অন্যদিকে দলের অন্দরে ধস— সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগছে একসময়ের 'দোর্দণ্ডপ্রতাপ' এই রাজনৈতিক দল। সময় যত এগোচ্ছে, রাজনৈতিক আঙিনায় ক্রমশ একলা হয়ে পড়ছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভানেত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

    রাজ্যের পর এবার জাতীয় রাজনীতিতেও এক বিরাট ভাঙনের মুখে পড়ল জোড়াফুল শিবির। খোদ দলনেত্রীর উপস্থিতিতেই তাঁর হাতছাড়া হয়ে গেল লোকসভার সংসদীয় দল। লোকসভায় তৃণমূলের মোট 28 জন সাংসদের মধ্যে অন্তত 20 জনই বিদ্রোহী হয়ে দলনেত্রীর সঙ্গ ত্যাগ করলেন। শুধু তাই নয়, সরাসরি লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি পাঠিয়ে তাঁরা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

    জোড়াফুলের এই বিশাল বিদ্রোহী শিবিরের নেতৃত্বে রয়েছেন দলের দুই অতি পরিচিত এবং বর্ষীয়ান নেত্রী— বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার এবং বীরভূমের সাংসদ শতাব্দী রায়। স্পিকারকে পাঠানো চিঠিতে এই 20 জন সাংসদ কেন্দ্রে ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার ইচ্ছেপ্রকাশ করেছেন। দিল্লির বুকে তৃণমূলের এই আড়াআড়ি বিভাজন এমন এক দিনে ঘটল, যা সর্বভারতীয় রাজনীতিতে রীতিমতো বেনজির এবং চরম নাটকীয়।

    সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার দাবি করেছেন যে, তৃণমূলের প্রায় 20 জন সাংসদ এনডিএ-কে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে তাঁদের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। বর্তমানে তৃণমূলের 28 জন লোকসভা সাংসদ ও 12 জন রাজ্যসভা সাংসদ রয়েছেন। কাকলি ঘোষ দস্তিদার জানিয়েছেন যে, কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন জোটকে সমর্থন করার বিষয়ে ওই গোষ্ঠীর ইচ্ছার কথা জানিয়ে স্পিকারের কাছে ইতিমধ্যেই একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে।

    লোকসভায় দলের চিফ হুইপ হিসেবে নিজের অবস্থান বহাল থাকার কথা উল্লেখ করে কাকলি জানান, দলের অন্য সাংসদদের সঙ্গে আলোচনার পরেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দলে অভ্যন্তরীণ সঙ্কট যখন ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে, দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের প্রকাশ্যে মতবিরোধ ও পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে— ঠিক সেই প্রেক্ষাপটেই এই নতুন ঘটনাটি সামনে এল যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলীয় বিপর্যয়কে আরও নিশ্চিত করল।

    সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, তৃণমূল নেতৃত্বের পক্ষে এই বিদ্রোহী সাংসদদের বিরুদ্ধে দলত্যাগ বিরোধী আইনে পদক্ষেপ করার কোনও আইনি সুযোগও আর অবশিষ্ট নেই। দলত্যাগ বিরোধী আইনের খাঁড়া থেকে বাঁচতে হলে মোট সাংসদ সংখ্যার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন হয়। লোকসভায় এই মুহূর্তে তৃণমূলের সাংসদ সংখ্যা 28 (বসিরহাটের সাংসদ হাজি নুরুলের প্রয়াণের পর ওই আসনটি ফাঁকা রয়েছে)। সেই অঙ্কের বিচারে 20 জন সাংসদ একসঙ্গে বিদ্রোহী হওয়ায় তাঁরা অনায়াসেই দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়িয়ে গিয়েছেন। শুধু তাই নয়, স্পিকারকে পাঠানো এই চিঠিতে কাকলি ঘোষ দস্তিদার নিজেকে লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলের মুখ্য সচেতক বা ‘চিফ হুইপ’ হিসেবেই উল্লেখ করেছেন। দলীয় স্তরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই পদের দায়িত্ব দিলেও, সংসদের অধিবেশন না চলার কারণে স্পিকারের দফতরকে তা খাতায়কলমে জানানো হয়নি। সেই আইনি ফাঁক-ফোকরেরই ‘সদ্ব্যবহার’ করেছেন বারাসতের সাংসদ।

    লোকসভার স্পিকারের কাছে এই চিঠি পাঠানোর খবর প্রকাশ্যে আসার আগেই অবশ্য আগামী রাজনৈতিক সমীকরণের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সোমবার দুপুরে এই বিক্ষুব্ধ সাংসদেরা সোজা হাজির হন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং শীর্ষ বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের দিল্লির বাসভবনে। সূত্রের খবর, কাকলি ও শতাব্দীর পাশাপাশি ওই গোপন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, অসিত মাল, বাপি হালদার, জুন মালিয়া, জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়া, কালীপদ সোরেন, অরূপ চক্রবর্তী, পার্থ ভৌমিক এবং শর্মিলা সরকারের মতো প্রথম সারির সাংসদেরা। এমনকি ইউসুফ পাঠান এবং রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো তারকা সাংসদদের নামও এই বিদ্রোহী তালিকায় প্রবলভাবে ঘোরাফেরা করছে।
  • Link to this news (eTV Bharat)