দু’হাত পিছনে রেখে বোর্ডিং স্কুলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে শিশুটি। কয়েক ফুট দূরেই গাড়িতে উঠে রওনা দিচ্ছে তার মা-বাবা। ফিরে তাকানোর ইচ্ছা নেই, উপায়ও নেই। সম্পূর্ণ অচেনা বদ্ধ জগতে এ বার বড় হওয়ার পালা তাঁদের সন্তানের। গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়ার শব্দ শুনে বুকটা ধড়াস করে ওঠে সেই খুদের! চোখ ছলছল, মন বলছে, ‘ভিড় মে ইউঁ না ছোড়ো মুঝে, ঘর লওটকে ভি আ না পাউঁ মা!’ শেষ লাইনটি পড়ে বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না, কালজয়ী সিনেমা ‘তারে জমিন পর’-এর দৃশ্যের কথা। হস্টেল বা বোর্ডিং কালচার একটি শিশুকে সাবলম্বী হতে শেখায় না কি দমবন্ধ পরিবেশের একটি কালো অধ্যায় হয়ে জীবন খাতায় থেকে যায়? এ নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু ‘শৃঙ্খলাবদ্ধ’ জীবন একটি শিশুকে কতটা ক্রুদ্ধ, নিষ্ঠুর করে তুলতে পারে যে, মুক্তির স্বাদ পাওয়ার জন্য আরও একটি শিশুর প্রাণ কেড়ে নিতে দ্বিধাবোধ করে না? কৃষ্ণনগরের ঘটনা সেই প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।
নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে কুইন্স উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। ৬ জুন স্কুলের হস্টেলের বাথরুম থেকে উদ্ধার হয় এক প্রথম শ্রেণির পড়ুয়ার দেহ। সেই হত্যার তদন্তে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ওই স্কুলের হস্টেলে থাকা নবম শ্রেণির দুই পড়ুয়াকে। হত্যার ‘মোটিভ’ ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে পুলিশেরও। জেরায় ওই দুই পড়ুয়া জানিয়েছে, হস্টেলের বন্দি জীবন থেকে মুক্তি পেতেই ‘বড় ঘটনা’ ঘটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা। একটা অঘটন ঘটলে, তবেই হইচই শুরু হবে, তবেই বন্ধ হবে হস্টেল ও স্কুল, তবেই মিলবে মুক্তি! এই বাসনা থেকে একটি ছোট্ট মেয়েকে বালতির জলে ডুবিয়ে খুনের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে। এমনটাই দাবি পুলিশের।
নদিয়ার কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, এই দুই পড়ুয়ার ফ্যামিলিও ‘স্টেবল’ নয়। মা-বাবা বা পরিবারের অন্য সদস্যদের ভালোবাসা, যত্নের ছোয়া থেকে বিরত ছিল দুই পড়ুয়া। পারিবারিক ঝামেলাও রয়েছে। পড়ুয়াদের মানসিক বিকাশে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে অনেকটাই। তারও প্রভাব পড়েছে। তবে দু’জনেই খুনের কথা স্বীকার করেছে।
নবম শ্রেণির দুই পড়ুয়াই বয়ঃসন্ধির দোরগোড়ায়। এই বয়সে বাইরের জগতে মেলামেশার প্রবণতা অনেকটাই বেড়ে যায়। সেই মনস্কামনা পূরণ করতেই কিছু একটা করার জন্য ছটফট করত দুই পড়ুয়া। তদন্তকারী অফিসারের মতে, ‘আমরা কোনও কারণে বাইরে যেতে পারছি না। আমাদের বাড়ির লোক এখান থেকে নিয়ে যাচ্ছে না। এমন একটা কিছু হলে আমরা এখান থেকে মুক্ত হতে পারব। এই ভাবনা চলছিল। সঙ্গে বাড়িতে থাকলে ফোন হাতে পাওয়া যাবে। সেটা হস্টেলে সম্ভব নয়। এই ভাবনা থেকেই এই কাণ্ড।’
স্বাধীনতার স্বাদ পেতে অপরাধ সংগঠিত করার বীজ অঙ্কুরিত হতে পারে কৈশোর মনে? রিহ্যাবিলিটেশন সাইকোলজিস্ট আনন্দি মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘এ ক্ষেত্রে একটি জেনেটিক এফেক্ট থাকতে পারে। মা-বাবার আচরণ দেখে এই মানসিকতা তৈরি হতে পারে। অথবা, ওই দুই পড়ুয়া আগে কোনওভাবে হেনস্থার শিকার হয়েছিল, সেই থেকে এই প্রবণতা হতে পারে। তবে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এই বয়সের ছেলেমেয়েদের অনেক সময়ে পরিণতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকে না। সেই কারণে এরকম একটি অপরাধ করে ফেলে তার জীবনে কী ক্ষতি হতে পারে, সেই অজ্ঞানতা থেকেই অপরাধ করে ফেলে।’
দুই ছাত্রীর ঘরে তল্লাশি চালিয়ে কিছু খাতা এবং ডায়েরি পেয়েছেন তদন্তকারীরা। কোথাও লেখা, ‘বিরাট কিছু ঘটতে চলেছে।’ আবার কোথাও লেখা হয়েছে, ‘বন্ধ হবে হস্টেল।’ প্ল্যান করেই এই ঘটনা, তা পরিষ্কার।