• কালীঘাটের হাতছাড়া হবে দলের নাম, প্রতীকও? প্রস্তুতি বিদ্রোহী শিবিরে
    এই সময় | ০৯ জুন ২০২৬
  • এই সময়: নিছক ভাঙন নয়, ভাঙনের পরে বিদ্রোহের প্রবল ঢেউয়ে এ বার দলের অফিশিয়াল নাম, নির্বাচনী প্রতীকও হাতছাড়া হতে চলেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের? তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবির সূত্রের দাবি, অফিশিয়াল দলীয় নাম ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’, দলের নির্বাচনী প্রতীক ‘জোড়াফুল’ এখনও খাতায়কলমে থাকা কালীঘাটের নেতৃত্বের হাতছাড়া হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

    তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরই যে ‘প্রকৃত তৃণমূল’, সেই বৈধতা চেয়ে খুব শিগগিরই নির্বাচন কমিশনে দরবার করা হতে পারে। কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার আগে বিদ্রোহী শিবির তৃণমূলের নতুন সভাপতি, কোষাধ্যক্ষ–সহ বিভিন্ন পদাধিকারী বাছাই করতে পারে বলে সূত্রের দাবি। রাজ্যের প্রাক্তন এক হেভিওয়েট মন্ত্রী, যিনি মমতার জমানায় ‘কিচেন ক্যাবিনেটের’ সদস্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তিনিই ‘নতুন সভাপতি’র দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন বলে বিদ্রোহী িশবির সূত্রের দাবি। এই সাংগঠনিক কাঠামো তৈরির কাজ সম্পূর্ণ হলে তাঁরাই যে ‘প্রকৃত তৃণমূল’, সেই স্বীকৃতি চেয়ে বিদ্রোহী শিবির আনুষ্ঠানিক ভাবে নির্বাচন কমিশনে চিঠি পাঠাতে পারে। এ নিয়ে জল্পনার মধ্যেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি দেওয়া নিয়ে সোমবার কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন বর্ষীয়ান তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। ১১ জুন, বৃহস্পতিবার এই মামলার শুনানি হতে পারে।

    আইনি লড়াই শুরু হলেও মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরের হাত থেকে যে ভাবে ‘অফিশিয়াল শিবসেনা’র নিয়ন্ত্রণ একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিবিরের হাতে গিয়েছে— সেই ভাবেই জোড়াফুলের বিদ্রোহী শিবির ‘প্রকৃত তৃণমূলের’ স্বীকৃতি পেয়ে যেতে পারে বলে কালীঘাট ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতা আশঙ্কা করছেন। বিদ্রোহী শিবিরের এক নেতার কথায়, ‘রাজ্যের প্রাক্তন এক ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে সভাপতি করা নিয়ে আলোচনা চলছে। এটা একটা প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ রাজ্যের প্রবীণ এক নেতার পর্যবেক্ষণ, ‘এই ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন শুনানি করে। পরিষদীয় দলে, সংসদীয় দলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোন পক্ষের হাতে রয়েছে, তা বিবেচনা করে কমিশন সিদ্ধান্ত জানাবে।’

    অতীতে রাজনৈতিক দলে আড়াআড়ি ভাঙন ঘিরে ‘প্রকৃত দল’ কারা, নির্বাচনী প্রতীক কাদের দখলে থাকবে, এ নিয়ে শিবসেনা ছাড়াও বহুবার সংঘাত হয়েছে। সিপিআই ভেঙে সিপিএম গঠিত হওয়ার সময়েও এই টানাপড়েন চলেছিল। সিপিআই ‘কাস্তে ধানের শিষ’ নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে ধরে রাখে। সিপিএম ‘কাস্তে হাতুড়ি তারা’ প্রতীক পায়। কংগ্রেসেও এই সংঘাতের কারণে অতীতে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে থাকা কংগ্রেস ‘জোড়া বলদ, গাই–বাছুর’ নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে পেয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে সোমবার বিধানসভায় কলকাতার সদ্য–প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে ঋতব্রতর দীর্ঘক্ষণ কথা হয়েছে। যদিও এই বৈঠক নিয়ে ফিরহাদ বিশদে কিছু বলতে চাননি। বিধানসভা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে তাঁর সংক্ষিপ্ত মন্তব্য, ‘নো কমেন্টস’। ফিরহাদের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে ঋতব্রত বলেন, ‘ববিদার সঙ্গে আমার বহু পুরোনো সম্পর্ক। উনি অনেকক্ষণ ছিলেন। আলাদা কথাও হয়েছে। আমরা চাই, উনি যখন বিধানসভায় আসবেন, আমাদের সঙ্গে এমন ভাবেই যেন কথা হয়। এর বেশি কিছু এখন বলছি না।’

    ঋতব্রত এ দিন বিদ্রোহী শিবিরের বিধায়ক সংখ্যা আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিধানসভার বিরোধী দলনেতার কথায়, ‘আমাদের সংখ্যা আরও বাড়বে। অধ্যক্ষ এখন নেই। এখন আলাদা করে অধ্যক্ষকে চিঠি দিতে হবে। বিধায়ক শামিম আহমেদ এসেছিলেন। ওঁর কিছু কথা ছিল, উনি বলেছেন।’ শামিম দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলার জোড়াফুলের বিধায়ক। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামী নেতা হিসেবে জানাতৃণমূলের অভ্যন্তরে পরিচিত এই শামিম। ঋতব্রতর সঙ্গে বৈঠক সেরে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে কুণাল ঘোষের সঙ্গেও ফিরহাদের কথা হয়। কুণালের কথায়, ‘ফিরহাদ হাকিম মমতার আস্থাভাজন পুরোনো সৈনিক। তিনি কেন গিয়েছেন, কী কী কথা হয়েছে— আমি জানি না। আমার সঙ্গেও ফিরহাদ হাকিমের দেখা হয়েছে। কিছু কথা হয়। কিন্তু এটা নিয়ে মন্তব্য করব না।’ ঋতব্রতর সঙ্গে বৈঠক করে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে শামিম বলেন, ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছি। আলাপচারিতা হয়েছে।’

    বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলের পরিষদীয় দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছেন। কলকাতা পুরসভা–সহ রাজ্যে বহু পুরসভায় জোড়াফুলের অনেক কাউন্সিলার কালীঘাটের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছেন এই মুহূর্তে। লোকসভায় কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে তৃণমূলের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ সোমবার স্পিকার ওম বিড়লার দপ্তরে চিঠি দিয়েছেন। বিধানসভার মতোই লোকসভায় কাকলির নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের টিম আগামী দিনে ‘অফিশিয়াল তৃণমূল’ হিসেবে বৈধতা পেতে পারে। এই বৈধতা চলে আসার পরে বিদ্রোহী শিবির ‘প্রকৃত তৃণমূলের’ সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ার প্রক্রিয়ার গতি আরও বাড়াতে পারে। তৃণমূলের পরিষদীয় দল ও সংসদীয় দলে ভাঙন–সহ বর্তমান পরিস্থিতি তৈরির আগে মমতাকে ভুল ‘ফিডব্যাক’ দেওয়া হয়েছে বলেও কুণালের পর্যবেক্ষণ। বেলেঘাটার বিধায়ক এ দিন বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কারা বোঝাচ্ছেন? কারা ফিডব্যাক দিয়েছেন? এতজন ক্ষুব্ধ, নেতৃত্ব কি জানতে পারেননি? শুধু কি ফ্ল্যান ক্লাব, ভিডিয়োতে ‘বস, বস’ আওয়াজ তুলে ইয়ার্কি হচ্ছিল?’ তৃণমূলের এই মুষলপর্ব দেখে রাজ্যের বর্ষীয়ান মন্ত্রী তাপস রায় বিধানসভার প্রেস কর্নারে কটাক্ষ করেছেন, ‘শিসা হো ইয়া দিল হো, আখির টুট জাতা হ্যায়।’

  • Link to this news (এই সময়)