• কোটি টাকার তোলাবাজি ! নিউটাউনের ফ্ল্যাট থেকে গ্রেফতার প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সব্যসাচী দত্ত
    eTV Bharat | ০৯ জুন ২০২৬
  • নিউটাউন, 9 জুন: বিপুল অঙ্কের টাকা তোলাবাজি, খুনের হুমকি এবং মানসিক নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ ৷ গ্রেফতার হলেন রাজারহাট-নিউটাউনের প্রাক্তন বিধায়ক তথা বিধাননগরের দাপুটে তৃণমূল নেতা সব্যসাচী দত্ত।

    সোমবার রাতে নিউটাউনে তাঁর অভিজাত ফ্ল্যাট থেকে প্রথমে তাঁকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। এরপর বিধাননগর উত্তর থানায় দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের শেষে গভীর রাতে গ্রেফতার হন প্রাক্তন বিধায়ক ৷ এই গ্রেফতারিকে কেন্দ্র করে বিধাননগরের রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

    এদিন গ্রেফতারের পর মেডিক্যাল পরীক্ষার জন্য বিধাননগর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যায় বিধাননগর পুলিশ। সকালেই কড়া পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে তাঁকে হাসপাতালে আনা হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন হয় বলে খবর।

    পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্তকে আদালতে পেশ করার আগে নিয়ম অনুযায়ী মেডিক্যাল পরীক্ষা করানো হয়। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই আজ সব্যসাচী দত্তকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতাল চত্বরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল। পুলিশের একাধিক আধিকারিকও উপস্থিত ছিলেন।

    মেডিক্যাল পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তাঁকে ফের পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। এরপরই বিধি মেনে সংশ্লিষ্ট আদালতে পেশ করা হবে। আদালতে তদন্তকারী সংস্থা তাদের বক্তব্য তুলে ধরবে এবং প্রয়োজন হলে হেফাজতের আবেদন জানাতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

    পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার বিকেলে সল্টলেকের বাসিন্দা তথা পেশায় ব্যবসায়ী মধুসূদন চক্রবর্তী বিধাননগর উত্তর থানায় সব্যসাচী দত্তের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেখানে তিনি সব্যসাচী দত্তের বিরুদ্ধে তোলাবাজি, প্রাণনাশের হুমকি এবং তীব্র মানসিক নির্যাতনের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনেন।

    এই অভিযোগ পাওয়ার পরপরই সক্রিয় হয়ে ওঠে বিধাননগর উত্তর থানার পুলিশ। সোমবার রাত 12টা নাগাদ নিউটাউনে সব্যসাচী দত্তের ফ্ল্যাটে হানা দেন তদন্তকারীরা। প্রাক্তন বিধায়ক সেই সময় ফ্ল্যাটেই ছিলেন। সেখান থেকে প্রথমে তাঁকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। এরপর শুরু হয় রুদ্ধদ্বার জিজ্ঞাসাবাদ। বয়ানে অসঙ্গতি থাকায় এবং তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগে গভীর রাতে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

    সব্যসাচী দত্তের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

    ব্যবসায়ী মধুসূদন চক্রবর্তীর দায়ের করা এফআইআর অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত 2018 সালে। সব্যসাচী দত্ত তাঁকে ফোন করে কড়া ভাষায় হুমকি দেন এবং এক ঘণ্টার মধ্যে 2 লক্ষ 30 হাজার টাকা দাবি করেন। সব্যসাচী তাঁকে সরাসরি ফোনে বলেছিলেন যে, টাকা না পাঠালে পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ হবে। ব্যবসায়ী মধুসূদন তখন নিরুপায় হয়ে পড়েন।

    সব্যসাচী সেই সময় প্রতিনিধি হিসেবে বিদ্যুৎ গঙ্গোপাধ্যায় ওরফে 'গুজি' নামে এক ব্যক্তিকে মধুসূদনবাবুর অফিসে পাঠান ৷ এই ব্যক্তি মধূসূদনের থেকে নগদ টাকা সংগ্রহ করে নিয়ে যান বলে অভিযোগ।

    এছাড়াও ব্যবসায়ী তাঁর অভিযোগে এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে জানিয়েছেন, তাঁর স্ত্রী সে সময় ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁর চিকিৎসার জন্য জরুরি প্রয়োজনে বাড়িতে সর্বক্ষণ কিছু নগদ টাকা মজুত রাখতে হত। বাধ্য হয়ে স্ত্রীর চিকিৎসার টাকা এবং ধার করা অর্থও তুলে দিতে হয়েছিল সব্যসাচীর প্রতিনিধি বিদ্যুৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতে।

    এফআইআর-এ ব্যবসায়ী আরও লিখেছেন, "সব্যসাচী দত্ত পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন শাসকদলের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। তাই তাঁর ভয়ে অন্য কোনও উপায় বা পথ খুঁজে না পেয়ে, স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ঘরে রাখা টাকার কিছু অংশ নিই এবং বাকি টাকা অন্য এক পরিচিত ব্যক্তির থেকে ধার করে তাঁর প্রতিনিধির হাতে তুলে দিতে বাধ্য হই।"

    এই গ্রেফতারি নিয়ে বিধাননগর উত্তর থানার পুলিশের অন্দরে তৎপরতা তুঙ্গে থাকলেও এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, সব্যসাচী দত্ত বা তাঁর আইনজীবীদের পক্ষ থেকেও এই মুহূর্তে আইনি পদক্ষেপ বা অভিযোগের সত্যতা নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

    সব্যসাচী দত্ত বরাবরই বিধাননগর ও রাজারহাট অঞ্চলের অত্যন্ত পরিচিত এবং দাপুটে মুখ। পুর প্রশাসনে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি সংগঠনেও তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। এছাড়া, 2026-এর বিধানসভা নির্বাচনে বারাসত কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের প্রার্থী ছিলেন তিনি। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই দুর্নীতি, নিয়োগ কেলেঙ্কারি এবং তোলাবাজির অভিযোগে তৃণমূলের একাধিক নেতা-মন্ত্রীকে হাজতবাস করতে হচ্ছে। এবার সেই তালিকায় নয়া সংযোজন সব্যসাচী দত্ত।
  • Link to this news (eTV Bharat)