আজকাল ওয়েবডেস্ক: ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠানের হয়ে মাঠে কথা বলত তাঁর ব্যাট। কিন্তু রাজনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ময়দান। আর বাংলার বহরমপুর থেকে নির্বাচিত তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ পাঠান এখন এক কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।
তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্য়ানার্জির ওপর যখন তাঁর দলের বিধায়ক ও সাংসদদের নিয়ন্ত্রণ আলগা হয়ে আসছে, তখন পাঠান এক উভয়সঙ্কটের মুখে পড়েছেন। পাঠান নিজের অবস্থান বা মতামত গোপন রেখেছেন। তৃণমূলের অন্দরে সঙ্কট তীব্র। দলের ২০ সাংসদ ইতিমধ্যেই বিদ্রোহী। কাকলি ঘোষদস্তিদারের নেতৃত্বে এই ২০ সাংসদ এনডিএ শিবিরকে সমর্থনের বিষয়ে দুর্বল। এই পরিস্থিতে ইউসুফ পাঠান মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছেন।
সোমবার দিল্লিতে 'কনস্টিটিউশন ক্লাব'-এ যখন মমতা ব্যানার্জি 'ইন্ডিয়া' জোটের বৈঠকে বিরোধী ঐক্যের বিষয়ে আলোচনা করছিলেন, ঠিক তখনই মাত্র কয়েক ব্লক দূরে তাঁর নিজের দলই ভাঙনে কবলে।
দলের সংসদীয় শাখায় ভাঙনের প্রথম ইঙ্গিতটি আসে প্রবীণ তৃণমূল নেতা ও রাজ্যসভায় দলের মুখ্য সচেতক (চিফ হুইপ) এবং মমতার অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী সুখেন্দু শেখর রায়ের পদত্যাগের মাধ্যমে।
এরপর একের পর এক রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে থাকে। সুখেন্দু শেখর রায়ের সঙ্গে তৃণমূলের বিদ্রোহী লোকসভা সাংসদদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক এবং পরবর্তীতে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে মমতার ঘোর বিরোধী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ। এসব ঘটনা স্পষ্ট করে দেয় যে, তৃণমূলের অন্দরের বিদ্রোহ বাংলা ছাড়িয়ে জাতীয় রাজধানী পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
দিনের শেষে তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার দাবি করেন যে, দলের ২৮ জন সাংসদের মধ্যে অন্তত ২০ জনই মমতা ব্যানার্জির দল ছেড়ে এনডিএ-তে যোগ দিতে আগ্রহী। তবে তৃণমূলের বিদ্রোহীদের তালিকায় ইউসুফ পাঠানের নাম যুক্ত করায় দলের ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়। এর আগে সঙ্কটের শুরুতেও ইউসুফ প্রকাশ্যে ও দ্ব্যর্থহীনভাবে মমতার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ফলে সাংসদ ইউসুফ, মহুয়া মৈত্রের মতো মমতা-অনুগতদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন।
সোমবার বিকেলে পাঠান যখন দিল্লিতে পৌঁছান, তখন মহুয়া তাঁর ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, "আমাদের জেলা আপনাকে বিপুল ভোটে জিতিয়েছে। অন্তত কিছুটা লজ্জা ও মেরুদণ্ড বজায় রাখুন।"
মহুয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেন যে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তলব করায় পাঠান তড়িঘড়ি করে নয়াদিল্লি ছুটে এসেছেন। ক্রিকেটার হিসেবে অফ-স্টাম্পের বাইরের বল ছেড়ে দেওয়ার জন্য পরিচিত না হলেও, মহুয়ার তীব্র আক্রমণের মুখে পাঠান নীরব থাকাই ভাল মনে করেছেন। তিনি তৃণণূলের বিরোধী শিবিরে যোগ দিতে চলেছেন, ইউসুফ পাঠান কাকোলির এই দাবিতে যেমন সিলমোহর দেননি, তেমনই বহরমপুরের সাংসদ এনডিএ-তে যোগ দেওয়ারও কোন ইঙ্গিতও দেননি।
ইউসুফ পাঠান বহরমপুর থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নির্বাচনী এলাকায়, মুসলিম জনসংখ্যা ৫০ শতাংশেরও বেশি। এই কেন্দ্র এনডিএ-বহির্ভূত দলগুলিকেই বার বার ভোটে জিতিয়েছে। এই অবস্থায় ইউসুফের নীরবতা যেন আরও বেশি জোরালো ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সময় এগোচ্ছে। পাঠান হয়তো ধীরে ধীরে বুঝতে পারছেন যে- নীরবতা হয়তো আর তাঁর সবচেয়ে বড় সহায়ক হবে না। ক্রমবর্ধমান প্রশ্ন ও নানামুখী সন্দেহের আবহে, ইউসুফ পাঠানকে যে শেষ পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক আনুগত্যের বিষয়টি স্পষ্ট করতেই হবে, তা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। কারণ, গত বছর হিংসার সময় তাঁর নির্বাচনী এলাকা যখন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল, তখনও নীরব ছিলেন তিনি। যা তাঁকে পরিস্থিতি সামাল দিতে সাহায্য করেছিল বলে মনে করা হয়। যদিও এবার এই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পরিস্থিতিতে অবশ্য বেশিদিন আর 'নীরবতা'কে পুঁজি করে পার পাবেন না বলেই মনে করা হচ্ছে।