জগন্নাথ মন্দির নাকি জগন্নাথ ধাম? দিঘায় মন্দির প্রতিষ্ঠার সময়েই নামকরণ নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, পুরীতে ‘জগন্নাথ ধাম’ রয়েছে। তার পরেও দিঘার মন্দিরের সঙ্গে কেন সেই ‘ধাম’ শব্দ জোড়া হলো? অবশ্য শত বিতর্কের মধ্যেও অনড় ছিল তৎকালীন তৃণমূল সরকার। নাম পরিবর্তন হয়নি। অবশেষে রাজ্যে পালাবদলের পরে মঙ্গলবার দিঘার জগন্নাথ ধাম থেকে ‘ধাম’ শব্দটি প্রত্যাহারের ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
পুরীর সাংসদ সম্বিত পাত্রকে পাশে বসিয়ে এ দিন নবান্ন থেকে সাংবাদিক বৈঠক করেন শুভেন্দু। উপস্থিত ছিলেন মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়ালও। সেখানেই নাম পরিবর্তনের ঘোষণা করে শুভেন্দু বলেন, ‘দিঘার শ্রীশ্রীজগন্নাথ ধাম কালচারাল সেন্টার থেকে ধাম শব্দটি প্রত্যাহার করা হলো। এখন থেকে নাম হবে শ্রীশ্রীজগন্নাথ মন্দির সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।’ তবে সব নিয়ম মেনে পুজো, ভজন চলবে বলেই জানিয়েছেন তিনি।
গত বছরের ৬ মে ‘জগন্নাথ ধাম’ নামকরণ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি লিখেছিলেন ওডিশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝি। অনুরোধ করেছিলেন, দিঘার জগন্নাথ মন্দির থেকে যেন ‘ধাম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই সময়ে ওডিশা সরকারের আপত্তিতে কর্ণপাত করেনি তৎকালীন রাজ্য সরকার। পালা বদলের পরে সেই একই আর্জি জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি পাঠান মোহন চরণ মাঝি। এ দিন সেই চিঠি নিয়েই নবান্নে আসেন পুরীর সাংসদ সম্বিত পাত্র।
সাংবাদিক বৈঠকে পুরীর ‘জগন্নাথ ধাম’ মাহাত্ম্যের কথা স্মরণ করিয়ে সম্বিত বলেন, ‘সনাতন সংস্কৃতিতে চারটি ধাম রয়েছে। তার মধ্যে পুরীর জগন্নাথ ধাম অন্যতম। আদি শঙ্করাচার্য এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।’ পূর্বতন তৃণমূল সরকারকে কটাক্ষও করেন তিনি। সম্বিতের কথায়, ‘সব জানার পরেও আগের সরকার মন্দিরের সঙ্গে ধাম শব্দটি জুড়ে দিয়েছিল। শুধু পুরী নয়, পশ্চিমবঙ্গের ভক্তরাও এতে কষ্ট পেয়েছিলেন।’ এর পরেই শুভেন্দুর কাছে আর্জি জানান তিনি, ‘রাজ্যে পালাবদল হয়েছে। নতুন সরকার সনাতনী সংস্কৃতি মেনে চলে। তাই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুজির কাছে অনুরোধ, তিনি যেন ধাম শব্দটি প্রত্যাহার করে নেন।’
সম্বিতের অনুরোধ মেনে নিয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘নথিপত্রে দিঘার মন্দিরকে শ্রীশ্রীজগন্নাথ ধাম কালচারাল সেন্টার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু দিঘায় ধাম শব্দটি সনাতন সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য পূর্ণ নয়।’ এর পরেই ‘ধাম’ শব্দ প্রত্যাহারের ঘোষণা করেন তিনি। শুভেন্দুর কথায়, ‘এখন থেকে ধাম শব্দটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হলো। নথিপত্রে এটি শ্রীশ্রীজগন্নাথ কালচারাল সেন্টার হিসেবে উল্লেখ করা হবে। আর পরিচিতি হবে শ্রীশ্রী জগন্নাথ মন্দির হিসেবে।’ তবে পুজো-পাঠ, আচার-অনুষ্ঠান একই ভাবে চলবে বলে জানিয়েছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সনাতনী সংস্কৃতি মেনে যেমন পুজো হচ্ছে হবে। অনুষ্ঠান, ভজন সব চলবে।’
রাজ্য সরকারের নাম বদলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন দিঘা জগন্নাথ মন্দিরের ট্রাস্টি ও প্রধান পুরোহিত তথা ইস্কন কলকাতার সহ-সভাপতি রাধারমণ দাস। তাঁর কথায়, ‘এই সিদ্ধান্তকে মতবিরোধের বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং দুই প্রতিবেশী রাজ্যের মধ্যে আধ্যাত্মিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার একটি সুযোগ।’ যখন ভক্তসমাজ ও সরকার সদিচ্ছা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ভক্তিভাব নিয়ে একসঙ্গে কাজ করে, তখন সব কিছুরই সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।