• বিমানবন্দরে অপেক্ষাই সার, স্ক্রুটিনির টেবলেই কংগ্রেসের বিমানকে মাটিতে নামাল BJP! মধ্যপ্রদেশে দিনভর তুমুল নাটক
    এই সময় | ১০ জুন ২০২৬
  • BJP-র ‘ঘোড়া কেনাবেচা’ আর দল ভাঙানোর রাজনীতি থেকে নিজেদের বিধায়কদের বাঁচাতে গোছানো হয়েছিল সুটকেস। লক্ষ্য ছিল, ভোপাল থেকে সোজা উড়ে যাওয়া কংগ্রেস শাসিত রাজ্য কর্নাটকে। মঙ্গলবার এই পরিকল্পনা নিয়েই ভোপালের রাজা ভোজ বিমানবন্দরে হাজির হয়েছিলেন মধ্যপ্রদেশের ৬২ জন কংগ্রেস বিধায়ক। কিন্তু দিনভর তাঁরা ঘর গোছাতে ব্যস্ত থাকার মধ্যে যে রাজনীতির রানওয়েতে তাঁদের বিমান ওড়ার আগেই গোত্তা খেয়ে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়বে, তা শুধু তাঁরা কেন হয়তো অতিবড় কোনও রাজনৈতিক বিশ্লেষকও কল্পনা করতে পারেননি!

    এ দিন কংগ্রেস বিধায়করা যখন স্যুটকেস হাতে বিমানবন্দরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বিমান ছাড়ার অপেক্ষা করছিলেন, ঠিক তখনই ঘটে বিনা মেঘে বজ্রপাত— খবর আসে স্ক্রুটিনিতে বাতিল হয়ে গিয়েছে মধ্যপ্রদেশ থেকে তাদের রাজ্যসভার একমাত্র প্রার্থী মীনাক্ষী নটরাজনের মনোনয়নপত্র! ফলে কর্নাটকের রিসর্টে গিয়ে ভোট বাঁচানোর সমস্ত প্রস্তুতি মাটি হয়ে যায় এক লহমায়। সুটকেস হাতেই মুখ কালো করে বিমানবন্দর থেকে ফিরে আসতে হয় ‘হাত’ শিবিরের জনপ্রতিনিধিদের।

    রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, স্ক্রুটিনির টেবিলে BJP যে ভাবে কংগ্রেসকে টেক্কা দিয়েছে, তা এককথায় নজিরবিহীন। রাজ্যসভার এই নির্বাচনে কংগ্রেসের মীনাক্ষী নটরাজনের বিরুদ্ধে তাদের তৃতীয় প্রার্থী হিসেবে মহেশ কেওয়াতকে দাঁড় করিয়েছিল BJP। এর পরেই মীনাক্ষীর মনোনয়নে আইনি মোচড় দেয় তারা।

    রিটার্নিং অফিসারের কাছে BJP-র রাজ্য সাধারণ সম্পাদক, রাহুল কোঠারি লিখিত অভিযোগ করেন, মীনাক্ষী তাঁর নির্বাচনী হলফনামায় (Form 26) হায়দরাবাদের নামপল্লী আদালতে বিচারাধীন একটি মামলার তথ্য সম্পূর্ণ গোপন করেছেন। এই অভিযোগ খতিয়ে দেখে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মীনাক্ষী নটরাজনের মনোনয়নপত্রটি বাতিল করার নির্দেশ দেন রিটার্নিং অফিসার অরবিন্দ শর্মা। তাঁর অর্ডারে স্পষ্ট বলা হয়েছে, মীনাক্ষী অসম্পূর্ণ হলফনামা জমা দিয়ে ভোটারদের কাছে সত্য গোপন করেছেন।

    মধ্যপ্রদেশ বিধানসভায় BJP-র ১৬৫ জন বিধায়ক রয়েছে। তাই দু’টি আসনে জয় তাদের নিশ্চিত ছিল। কিন্তু তৃতীয় আসনে নিজেদের প্রার্থী মহেশ কেওয়াতকে জেতাতে আরও ৯ থেকে ১১টি অতিরিক্ত ভোটের প্রয়োজন ছিল গেরুয়া শিবিরের। সেই কারণেই কংগ্রেসের আশঙ্কা ছিল, ক্রস-ভোটিং করানোর জন্য তাদের বিধায়কদের নিশানা করতে পারে BJP।

    এই আশঙ্কাতেই তড়িঘড়ি দলের ৬২ জন বিধায়ককে কর্নাটকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কংগ্রেস হাইকম্যান্ড। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিমানের ছাড়পত্র পেতে বেশ কয়েক ঘণ্টা দেরি হয় এবং বিধায়কদের সুটকেস হাতে বিমানবন্দরের বাইরেই অপেক্ষা করতে হয়। আর সেই অপেক্ষার মাঝেই সন্ধ্যাবেলা যখন মীনাক্ষী নটরাজনের মনোনয়ন বাতিলের খবর আসে, তখন কর্নাটক যাত্রার আর কোনও অর্থ বা প্রাসঙ্গিকতা অবশিষ্ট ছিল না।

    এই নজিরবিহীন ধাক্কার পরে মীনাক্ষী নটরাজন ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, গণতন্ত্র ও সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই কাজ করেছে BJP। দলের পক্ষে সওয়াল করার জন্য তাঁদের আইনজীবীদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ভোপালে মুখ্য নির্বাচনী অফিসারের দপ্তরের বাইরে বি আর আম্বেদকরের ছবি হাতে সারা রাত বিক্ষোভ দেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জিতু পাটোয়ারী ও উমঙ্গ সিংহরা। পাশাপাশি, বুধবার দুপুর ১২টায় দিল্লির নির্বাচন সদনে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হচ্ছে কংগ্রেসের এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল।

    তবে BJP তা নিয়ে ভাবিতই নয়। নটরাজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার খবর আসতেই পদ্ম শিবিরে শুরু হয়ে যায় অকাল দোল উৎসব। মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব এই ঘটনাকে অপরাধের রেকর্ড লুকিয়ে রাখার বদঅভ্যাসের বিরুদ্ধে বড় জয় বলেছেন। তবে সবচেয়ে বড় বোমাটি ফাটিয়েছেন সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কৈলাশ বিজয়বর্গীয়। কংগ্রেসের অন্দরেই বড় মাপের অন্তর্ঘাতের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি দাবি করেছেন, ‘তেলঙ্গানার কিছু কংগ্রেস বন্ধুই আমাদের এই কাজে (মীনাক্ষীর মামলার তথ্য পেতে) সাহায্য করেছেন।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই একটি বাক্যেই স্পষ্ট যে, এ দিন কংগ্রেসের রিসর্ট পলিটিক্সই শুধু ব্যর্থ হলো তাই নয়, দলের ভিতরের ফাটলটাও সম্ভবত আরও চওড়া হয়ে গেল।

  • Link to this news (এই সময়)