• ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’, জাহাঙ্গিরের গ্রেপ্তারিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন বজবজের কাজ হারানো শ্রমিকরা
    এই সময় | ১০ জুন ২০২৬
  • গালে বড় বড় দাড়ি। চোখ ঢুকে গিয়েছে। মুখে ক্লান্তির ছাপ। ফলতার তৃণমূল নেতা জাহাঙ্গির খানকে যেন চেনাই দায়। মঙ্গলবার যখন তাঁকে ডায়মন্ড হারবার মহকুমা আদালতে তোলা হলো, দেখে কে বলবে, এই সেই পুষ্পা। এক মাস আগেও যিনি হুঙ্কার দিচ্ছিলেন, ‘ঝুঁকেগা নেহি।’ আর আজ, মাটিতে যেন নুয়ে পড়েছেন। জাহাঙ্গিরের গ্রেপ্তারির খবরে খুশির হাওয়া বইছে গোটা দক্ষিণ ২৪ পরগণায়। তবে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছেন বজবজ গ্যাস প্ল্যান্টের কাজ হারানো কয়েক শ শ্রমিক। বুকের কাছে হাত দু’টো জড়ো করে ইশ্বরকে প্রণাম করেছেন তাঁরা। ঠাকুর এত দিনে মুখ তুলে চাইল। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।’

    প্রশিক্ষণ নিয়ে নিয়ম মেনেই চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। পরিবারের খুশির জোয়ার বয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিলেন, এ বারে মোটা ভাত-কাপড়ের অভাব ঘুচবে। কিন্তু সেই আনন্দে জল ঢেলে দিয়েছিলেন জাহাঙ্গির। অভিযোগ, ঘনিষ্ঠদের চাকরি পাইয়ে দিতে বহু শ্রমিকের জীবন-জীবিকা কেড়ে নিয়েছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, অনেককেই বেধড়ক মারধর করা হয়েছিল। এমনকী বেতন আটকে দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ।

    মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে প্রায় ১২০ জন শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে দাবি করলেন দীপঙ্কর ভাদুড়ি, গোপালচন্দ্র ভাণ্ডারীরা। কেউ এক মাস জেল খেটেছেন। কেউ তিন মাস। কেউ বা আরও বেশি। শুধু তো শ্রমিকরা নয়, তাঁদের গোটা পরিবারেরই আতঙ্কে কেটেছে। এখনও অবশ্য তার রেশ কাটেনি। উদ্বেগ রয়েছে। লড়াই চলছে। কাজ ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলনও চলবে বলেই জানালেন তাঁরা।

    জাহাঙ্গিরের খেয়ালখুশিতে কাজ হারিয়েছেন বলে অভিযোগ ওই কারখানার শ্রমিক দীপঙ্করের। তাঁর কথায়, ‘অনেক শ্রমিক ১৫ থেকে ২০ বছর ওই কারখানায় কাজ করেছেন। চাকরি হারিয়ে আজ তাঁরা সর্বস্বান্ত।’ দিন পনেরো আগে বজবজ থানায় এই নিয়ে অভিযোগ দায়ের করেন তাঁরা। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও সুরাহা হয়নি। এখন শুধু অভিযুক্তদের শাস্তি আর চাকরি হারানো শ্রমিকদের পুনর্বহালের দাবি তাঁদের।

    জাহাঙ্গিরের বিরুদ্ধে মোট ১১টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ফলতা থানায় ৯টি আর রামনগর থানায় ২টি। বেশির ভাগই খুনের চেষ্টা, তোলাবাজি আর ভয় দেখানোর অভিযোগ। সব ক’টি মামলারই তদন্ত করছে ডায়মন্ড হারবার পুলিশ। কিন্তু তৃণমূল জমানায় কেন তাঁর বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি তা এখনও বোধগম্য হয় না বজবজ গ্যাস প্ল্যান্টের বহু শ্রমিকেরই।

    বকেয়া পাওনার দাবিতে গত বছরের ১ জুন আন্দোলন করছিলেন তাঁরা। সেই সময়ে তাঁদের উপরে হামলা হয় বলে অভিযোগ। হামলাকারীদের ছবি তাঁদের কাছে রয়েছে বলে দাবি করে এক শ্রমিক বললেন, ‘কী অত্যাচারটাই না করেছে। আমাদের উপরে গ্যাস ছেড়ে দিয়েছিল। তার পরে আমাদেরই মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়।’ জাহাঙ্গির খানের ঘনিষ্ঠরা কারখানায় তোলাবাজি চালাত বলে অভিযোগ করলেন গোপালচন্দ্র ভাণ্ডারী। তিনি বললেন, ‘এখনও তাঁরা এই কারখানায় কাজ করছেন। কিন্তু অনেকেরই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেই।’

    কাজ হারানো শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়ে গোটা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করেছেন বিজেপির ডায়মন্ড হারবার সাংগঠনিক জেলার সভাপতি সোমা ঘোষ। তিনি বলেন, ‘সত্য সামনে আসুক। যারা দোষী, তারা শাস্তি পাক।’ কর্মহারাদের পুনরায় কাজে ফেরানোর দাবিও জানিয়েছেন তিনি। তবে এই নিয়ে মুখ খোলেননি তৃণমূল নেতৃত্ব।

    গত সোমবার নেপাল সীমান্ত থেকে জাহাঙ্গিরকে গ্রেফতার করেছে রাজ্য পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)। পালানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছে যান এসটিএফ-এর সদস্যরা। তার পরেই পাকড়াও করা হয় জাহাঙ্গিরকে। এ দিন তাঁকে তোলা হয় আদালতে। জাহাঙ্গিরের পরনে ছিল সাদা শার্ট আর অফ হোয়াইট ট্রাউজার্স। তাঁকে দেখতে ভিড় জমিয়েছিলেন অনেকেই। এ দিন তাঁর হয়ে দাঁড়াননি কোনও আইনজীবীই। শেষে পুলিশের আবেদন মেনে ফলতার তৃণমূল নেতাকে পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।

  • Link to this news (এই সময়)