অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুদেষ্ণা ঘোষাল, নয়াদিল্লি
একে একে নিভিছে দেউটি! পুর–দল, পরিষদীয় দলে ভাঙন ধরেছিল আগেই, সোমবার ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে লোকসভায় সংসদীয় দলও। এ বার কি পালা রাজ্যসভায় জোড়াফুলে ভাঙনের? সেই সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে সোমবার রাতে রাজ্যসভায় তৃণমূলের তিন সাংসদ দিল্লিতে বিজেপির এক হেভিওয়েট নেতার সঙ্গে বৈঠকে বসার পরে। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে লোকসভার ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ এনডিএ–তে যোগদানের কথা জানিয়ে সোমবারই চিঠি দিয়েছিলেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে। স্পিকার সোমবার দিল্লিতে ছিলেন না।
আজ, বুধবার তাঁর রাজধানীতে ফেরার কথা। তারপরেই লোকসভায় ভাঙন পর্ব চূড়ান্ত আকার নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সোম ও মঙ্গলবার দিল্লিতে এই ঘটনাপ্রবাহ যখন চলছে, তখনও রাজধানীতেই ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ২৪ ঘণ্টা আগে তাঁরা যোগ দিয়েছিলেন ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকে, যেখানে আবার নাম না–করে তৃণমূলকে খোঁচা দিয়েছিলেন রাহুল গান্ধী। আর এ দিন মমতা গিয়েছিলেন কংগ্রেসের সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন সনিয়া গান্ধীর বাসভবনে। সেখানে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা দু’জনের মধ্যে কথা হয়। বৈঠক নিয়ে সনিয়া বা মমতা কোনও মন্তব্য করেননি। তবে বিজেপির এক প্রবীণ নেতার স্পষ্ট কথা, ‘আমরা কিন্তু দরজা খুলিনি। ওঁদের দলের নেতারাই নিজেদের ঘরের দরজার তালা ভেঙে বেরিয়ে পড়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তাঁর অনুগামীরা যতই বালির বাঁধ দিন, এই স্রোত কিন্তু আটকাতে পারবেন না।’
বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন বলেন, ‘তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দলের উপরে নিয়ন্ত্রণই রাখতে পারেননি৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও শুধু ক্ষমতা উপভোগ করে গিয়েছেন৷ সাধারণ মানুষের থেকে তাঁরা ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়েছেন৷ দলের নিচু স্তরের নেতারা লাগামহীন দুর্নীতি করেছেন, কিন্তু শীর্ষ স্তর থেকে কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি৷ সর্বস্তরে দুর্নীতিটাই একটা অভ্যেসে পরিণত হয়েছে৷ দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বাকি অংশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন না, তাঁদের কথা শুনতেন না, তাঁদের সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করতেন না৷ শুধু চিরকুট লিখে আদেশ জারি করা হতো৷ একনায়কতন্ত্র চলত দলে৷’ তাঁর সংযোজন, ‘রাজ্যের মানুষের প্রতি তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের কোনও দায়বদ্ধতাই ছিল না৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন দলের জয়ী বিধায়কদের বৈঠক ডেকেছিলেন, তখন সেখানে বহু বিধায়ক গরহাজির ছিলেন৷ এই ঘটনাই প্রমাণ করে দেয় যে, দলের উপরে ওঁর কোনও নিয়ন্ত্রণই ছিল না৷’
সোমবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বাংলার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ পর্যবেক্ষক ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠক করা বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদরা তাঁদের শক্তি আরও বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন বলেই সূত্রের দাবি৷ সোমবার যাঁরা বিদ্রোহীদের দলে নাম লেখাতে ইতস্তত করছিলেন, মঙ্গলবার রাতের মধ্যে তাঁদের মধ্যে অন্তত তিন জন সাংসদ বিদ্রোহ করতে রাজি হয়ে দিল্লির বিমানে উঠে পড়েছেন বলেও সূত্রের দাবি৷ এর রেশ ধরেই রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদদের একাংশ বিদ্রোহী হয়েছেন বলে খবর৷ এর মধ্যে রাজ্যসভার তিন তৃণমূল সাংসদ সোমবার গভীর রাতে দিল্লিতে বিজেপির হেভিওয়েট এক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন বলেই সূত্রের দাবি৷
এই আবহে এ দিন সকালে দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক করে প্রথমে বিদ্রোহীদের নিশানা করেন তৃণমূলের আইনজীবী সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘ওঁদের নেতা পাল্টে গিয়েছেন। ওঁদের নেতার নাম নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু ডাইরেক্টলি বলতে পারছেন না যে, বিজেপি করি। যদি রাজনৈতিক নৈতিকতা থাকে, যদি সৎ হন, তবে নিজেদের বলবেন না তৃণমূলের সাংসদ। বিদ্রোহীদের যদি ক্ষমতা থাকে, তা হলে তাঁরা দল এবং সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে আবার ভোটে লড়ে জিতে দেখান। তাঁদের যদি ক্ষমতা থাকে তো, তাঁরা সরাসরি বিজেপিতেই যোগ দিন।’
তিনি সরাসরি তোপ দাগেন বিদ্রোহী দলের দুই সদস্য কাকলি ঘোষ দস্তিদার ও শতাব্দী রায়কে নিশানা করে। তাঁর কথায়, ‘কাকলি ঘোষ দস্তিদার ছাড়া সকলেই ২০১১-র পরে দলে এসেছেন। কেউ লড়াই করেননি। ফিল্মস্টাররা সব ভিনদেশি তারা। কেষ্ট (অনুব্রত মণ্ডল) না থাকলে শতাব্দী (রায়) জিততে পারতেন না ২০০৯-এ।’ যদিও এ দিন শতাব্দী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘এত বড় বিপর্যয় হলো। রাতে যাঁরা রাজা–রানি, সকালে কেউ কিছু নয়। তারপরেও কোনও আলোচনা হলো না। এতবড় হারের পরেও কোনও বিশ্লেষণ হলো না, কেন হারলাম!’ তাঁর সংযোজন, ‘নির্বাচনের আগেও প্রার্থী বাছাই নিয়ে কথা শোনা হয়নি। বলা হয়েছে, চিঠি দিয়ে জানাতে। অনেক চিঠি লিখেছি। কিন্তু এতবড় বিপর্যয়ের পরে তো নিজেদের কাছে অন্তত হারটা স্বীকার করতে হবে। দলের পিছনে তো আমাদেরও সামান্য হলেও ভূমিকা আছে। ৪ মের পরেও যখন দেখছি আলোচনা হলো না, সেটাই আমার রাগের প্রধান কারণ।’
সোমবার ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে বিদ্রোহী সাংসদদের বৈঠকে ছিলেন তৃণমূলের অভিনেতা–সাংসদ দেবও। সূত্রের খবর, মিটিংয়ে সৌজন্য বিনিময়ের সময়ে তাঁর গালে টোকা দেন শুভেন্দু অধিকারী। এ দিন পূর্ব মেদিনীপুরের কোলাঘাটে মুখ্যমন্ত্রীর ডাকা প্রশাসনিক বৈঠকেও ছিলেন দেব। বৈঠকের পরে সাংবাদিকদের দেব বলেন, ‘আমি সারা জীবন সৌজন্যের রাজনীতি করে এসেছি। আজ পর্যন্ত আমার মঞ্চ থেকে কাউকে অসম্মান করিনি।’ এরপরেই ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে তিনি বলেন, ‘আমার ভালোবাসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য সারাজীবন থাকবে। আমি নতুন তৃণমূলে যাচ্ছি না, যতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেঁচে আছেন আমি তাঁর সঙ্গে আছি। ভবিষ্যতে কী হবে, এখনই কিছু বলতে চাইছি না। আমি কাল দিল্লি গিয়েছিলাম তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ হিসেবে। আজও এখানে এসেছি তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ হিসেবে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, আপাতত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থাকার বার্তা দিলেও ‘ভবিষ্যৎ’ শব্দটির মধ্যে ধোঁয়াশা রেখে দিয়েছেন দেব।
এ দিন দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠকে দেব–শুভেন্দুর সাক্ষাতের প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছেন কল্যাণও। বিদ্রোহীদের উদ্দেশে তাঁর সতর্কবার্তা, ‘আমি লিখে দিচ্ছি, বিজেপি এঁদের কাউকে নেবে না। কারণ, ওরা এঁদের খুব ভালো করে চেনে। বিজেপি জানে, এঁরা কে কী করেছেন।’
বিদ্রোহী শিবিরে নাম লেখানো বাঁকুড়ার তৃণমূল সাংসদ অরূপ চক্রবর্তী এ দিন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা ২০ জন সাংসদ বলেছি আমরা পার্লামেন্টে বসার আলাদা জায়গা চেয়েছি। আমরা বলেছি আমরা কংগ্রেসের সঙ্গে যাব না। তবে বিজেপি আমাদের সাহায্য চাইলে আমরা দেবো উন্নয়নের স্বার্থে।’
এ সবের মাঝে মঙ্গলবারও অভিষেকের ১৮১ সাউথ অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে ছিলেন মমতা। তাঁর সঙ্গে সারাদিন সাক্ষাৎ করতে আসেননি কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব৷ ছিল না সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের আগ্রহও৷ বিকেল সাড়ে ৩টে নাগাদ দশ জনপথে সনিয়া গান্ধীর বাসভবনের উদ্দেশে রওনা দেন মমতা৷ বিদ্রোহী শিবিরের একাংশের বক্তব্য, শুধু ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠক লক্ষ্য নয় মমতা–অভিষেকের। তাঁরা নিজেরা রাজধানীতে পড়ে থেকে একটা চেষ্টা করছেন বিদ্রোহীদের মন ভেজাতে, যাতে আজই লোকসভার স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে বিদ্রোহী সাংসদরা নতুন কোনও পদক্ষেপ না–করেন। অভিষেকের তরফেও বিক্ষুব্ধদের কয়েকজনকে ফোন করার চেষ্টা হয়েছে বলে খবর। যদিও অনেকেই ফোন ধরেননি বা এড়িয়ে গিয়েছেন বলেই জানা গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীর কটাক্ষ, ‘গোটা তৃণমূল দলটা বিজেপির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। দলের যিনি নেত্রী আর খোকাবাবু দেখুন, যে এটাকেই বলে পোয়েটিক জাস্টিস।’