• জ‍ন্মহার পত‍নের সাফল্য, উদ্বেগের কারণও দেখছেন মাস্ক
    এই সময় | ১০ জুন ২০২৬
  • এই সময়: এক সময়ে এ দেশে পরিবার পরিকল্পনার স্লোগান ছিল—‘হাম দো, হামারে দো’। সর্বোচ্চ দুই সন্তানের ছোট পরিবার গড়ে তোলার সেই বার্তা গত কয়েক দশকে এতটাই সফল হয়েছে যে আজ বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দেশ ভারতই জন্মহার হ্রাসের নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। দেশে প্রজনন হার (টোটাল ফার্টিলিটি রেট বা টিএফআর) প্রত্যাশিতের চেয়েও নীচে নেমে যাওয়ার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ঘিরে যখন জনসংখ্যাবিদদের মধ্যে আলোচনা তুঙ্গে, তখনই বিষয়টি আন্তর্জাতিক মনোযোগ কেড়েছে বিশ্বের অন্যতম ধনী শিল্পপতি ইলন মাস্কের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে।

    সম্প্রতি সমাজমাধ্যম ‘এক্স’-এ একটি পোস্ট শেয়ার করে মাস্ক মন্তব্য করেছেন, ভারতের জন্মহার এখন প্রতিস্থাপন–স্তর বা রিপ্লেসমেন্ট লেভেলের নীচে নেমে গিয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই প্রবণতা আরও আগে থেকেই স্পষ্ট ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ওই পোস্ট দ্রুত ভাইরাল হয়। তার পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে— দীর্ঘদিন জন-বিস্ফোরণ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকা ভারত কি ধীরে ধীরে নিম্ন জন্মহারের যুগে প্রবেশ করছে?

    জনসংখ্যাবিদদের মতে, কোনও দেশের জনসংখ্যাকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রাখতে মোট প্রজনন হার ২.১ হওয়া প্রয়োজন। একে বলা হয় ‘রিপ্লেসমেন্ট লেভেল ফার্টিলিটি’ বা প্রতিস্থাপন স্তরের প্রজনন হার। কিন্তু সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের টিএফআর এখন ১.৯। অর্থাৎ গড়ে একজন ভারতীয় মহিলা দু’টিরও কম সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। এক দশক আগেও এই হার ছিল ২.৩। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এই পতন জনসংখ্যার গতিপ্রকৃতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

    আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো রাজ্যভিত্তিক চিত্র। দেশের দক্ষিণ ও পূর্ব অংশের অধিকাংশ রাজ্য ইতিমধ্যেই প্রতিস্থাপন স্তরের নীচে নেমে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরালা, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গনা, ওড়িশা-সহ বহু রাজ্যে জন্মহার ২.১-এর অনেক নীচে। রাজধানী দিল্লিতে টিএফআর নেমে এসেছে ১.২-এ, যা দেশে সর্বনিম্ন। এর পরেই রয়েছে বাংলা (১.৪)। আর তার পরে যৌথ ভাবে রয়েছে তামিলনাড়ু, কর্নাটক ও অন্ধ্রপ্রদেশ (১.৭) এবং তেলঙ্গনা ও কেরালা (১.৮)। অন্য দিকে বিহার (২.৭) এখনও সর্বোচ্চ প্রজনন হারের রাজ্য। এর পরে যৌথ ভাবে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ ও ঝাড়খণ্ড (২.২)। মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানের (২.১) মতো রাজ্যের টিএফআর-ই এখন কেবল প্রতিস্থাপন স্তরের সমান রয়েছে।

    বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ। মহিলাদের শিক্ষার হার বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে তাঁদের অংশগ্রহণ, নগরায়ন, দেরিতে বিয়ে, সন্তান প্রতিপালনের বাড়তি খরচ এবং পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে সচেতনতা এবং নানা কারণে বন্ধ্যত্বের বৃদ্ধি—সব মিলিয়েই কমেছে টিএফআর। তাই পরিবার পরিকল্পনাতেও এখন অনেক রাজ্যেই ঢিলেমি দেখা যাচ্ছে সরকারি স্তরে। পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্য বলছে, এক দশক আগেও বাংলায় বছরে ১৭.৫-১৮ লক্ষ শিশু জন্মাত। কলকাতায় সেই সংখ্যাটা ছিল প্রায় ৫০-৫২ হাজার। আর এখন সারা রাজ্যে বছরে বড়জোর ১৫ লক্ষ শিশু জন্মায়। কলকাতায় সেই সংখ্যাটা ৩৫ হাজার।

    বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমা উন্নয়নেরই সূচক। এতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপরে চাপ কমবে। অন্য দিকে অর্থনীতিবিদদের একাংশ সতর্ক করছেন, জন্মহার দীর্ঘদিন ধরে কমতে থাকলে ভবিষ্যতে কর্মক্ষম তরুণ জনসংখ্যার অনুপাত হ্রাস পেতে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে উৎপাদন, কর আদায়, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর দেখভালের উপরে। যে বিপদ ইতিমধ্যেই ঘনিয়েছে চিন, জাপান, সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্কে।

    স্বাস্থ্য ভবনের এক কর্তার কথায়, ‘শিশুর সংখ্যা লাগাতার কমে যাওয়ার ফলে বহু স্কুলও বন্ধ হয়ে যায়। অথচ বিষয়ের গভীরে না ঢুকে এ নিয়ে সর্বত্রই রাজনৈতিক দোষারোপ চলে।’ তাঁর বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে সরকারি নথিতে। ইউনিফর্ম ডিস্ট্রিক্ট ইনফর্মেশন সিস্টেম ফর এডুকেশন (ইউ–ডাইস)-এর পরিসংখ্যান বলছে, করোনা–পর্বের আগের তিন বছরে সারা দেশে অন্তত ৬১,৩৬১টি সরকারি প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক স্কুল পড়ুয়ার অভাবে প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অন্য আরও কারণের সঙ্গে জন্মহারে পতনও এর কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। এ রাজ্যের ছবিটাও আলাদা নয়। সরকারি সূত্রের দাবি, গত এক দশকে বাংলায় প্রায় ৮,২০৭টি স্কুল ধুঁকছে ছাত্রছাত্রীর অভাবে। বিকাশ ভবনের সূত্র বলছে, ওই সব স্কুলে যে হাতেগোনা কয়েক জন পড়ুয়া ও শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন, তাঁদের সবাইকে নিকটবর্তী ‘ঠিকঠাক চলা স্কুলে’ স্থানান্তর ও বদলির প্রক্রিয়া চলছে বেশ কিছু দিন ধরেই। এবং প্রক্রিয়া আগামী দিনেও চলবে।

  • Link to this news (এই সময়)