• নিজদুর্গে একলা মমতা, হাত ছাড়ছেন মালাও! দিল্লির পথে দক্ষিণ কলকাতার সাংসদ
    eTV Bharat | ১০ জুন ২০২৬
  • কলকাতা, 10 জুন: ​রাজ্য রাজনীতিতে একের পর এক ধাক্কায় যখন তৃণমূল কংগ্রেসের সামগ্রিক অস্তিত্বই চরম সংকটের মুখে, ঠিক তখনই জোড়াফুল শিবিরের অন্দরে ফের নেমে এল রাজনৈতিক বিপর্যয় । ভবানীপুর ও রাসবিহারীর মতো খাসদুর্গে বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের ক্ষত এখনও দগদগে । খোদ দলীয় নেত্রীর নিজের ঘরের মাঠে এই ভরাডুবির ধাক্কা সামলানোর আগেই এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একদা নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র তথা দলের সবচেয়ে সুরক্ষিত দুর্গ বলে পরিচিত দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রেও বড়সড় ভাঙন রেখা স্পষ্ট হল ।

    রাজনৈতিক মহলের সমস্ত জল্পনাকে সত্যি করে এবার বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিতে চলেছেন দক্ষিণ কলকাতার প্রবীণ তথা অত্যন্ত প্রভাবশালী তৃণমূল সাংসদ মালা রায় । লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে জমা পড়তে চলা 'এনডিএ সমর্থক ব্লকে' তিনি স্বাক্ষর করছেন বলে সুনিশ্চিত খবর মিলছে । ​নবান্ন ও কালীঘাটের অলিন্দে এখন একটাই আলোচনা - মালা রায়ের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে চলেছে ।

    বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার বিকেলেই বিশেষ বিমানে সপরিবারে দিল্লির উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন দক্ষিণ কলকাতার এই সাংসদ । তাঁর সঙ্গে রয়েছেন স্বামী নির্বেদ রায় এবং ছেলে ও মেয়ে । রাজনৈতিক শিবিরের একাংশের দাবি, মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যেই যদি সমস্ত কাগজপত্রের কাজ সম্পন্ন না হয়ে থাকে, তবে আজ, বুধবারই তিনি বিদ্রোহী ব্লকের চিঠিতে নিজের সই বসিয়ে দেবেন । কলকাতা পুরসভার চেয়ারপার্সন পদের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি দক্ষিণ কলকাতার প্রতিটি ওয়ার্ডের রাজনৈতিক সমীকরণ ও সাংগঠনিক শক্তি মালা রায়ের নখদর্পণে । ফলে তাঁর মতো একজন বিশ্বস্ত ও প্রবীণ নেত্রীর এমন আকস্মিক সিদ্ধান্ত কলকাতার তৃণমূল শিবিরের ভিত একপ্রকার নাড়িয়ে দিয়েছে।

    ​দলে এই অসন্তোষ এবং দূরত্ব তৈরির প্রক্রিয়া অবশ্য হঠাৎ হয়নি। গত কয়েকদিন ধরেই কাকলি ঘোষ দস্তিদার, সায়নী ঘোষ, পার্থ ভৌমিক কিংবা ইউসুফ পাঠানের মতো শীর্ষ সারির সাংসদরা মমতার মূল শিবির থেকে দূরত্ব বাড়াতে শুরু করেছিলেন । তা সত্ত্বেও ঘাসফুল শিবিরের একটা বড় অংশ মনে করেছিল, দলের চরম দুর্দিনে আর কেউ না-হলেও মালা রায় অন্তত দল ছাড়বেন না, নেত্রীর পাশেই থাকবেন। কিন্তু সেই আশাতেও জল ঢেলে প্রবীণ এই নেত্রী মমতা-অভিষেকের নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করায় তোলপাড় শুরু হয়েছে কলকাতার রাজনীতিতে।

    ​বিদ্রোহী তৃণমূল শিবিরের এক শীর্ষ নেতার দাবি, মালা রায়ের এই পদক্ষেপে লোকসভায় তাঁদের গোষ্ঠীর ক্ষমতা অনেকটাই বৃদ্ধি পেল । নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বিক্ষুব্ধ নেতা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "সোমবার রাতেই আমাদের 16 জন সাংসদ স্পিকার ওম বিড়লাকে উদ্দেশে লেখা চিঠিতে সই করে দিয়েছেন। মঙ্গলবার সায়নী ঘোষের নাম যুক্ত হওয়া নিয়ে প্রবল জল্পনা তৈরি হয়েছিল। এবার মালা রায় এবং মিতালি বাগও যদি এই খাতায় সই করে দেন, তবে আমাদের দাবি করা 20-র গণ্ডি পার হওয়া এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।" ওই নেতার এই বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার যে, সংসদের অন্দরে তৃণমূলের ফাটল কতটা চওড়া হয়েছে।

    ​স্বাভাবিকভাবেই এই নজিরবিহীন পরিস্থিতির জেরে লোকসভায় কার্যত একাকী ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, মহুয়া মৈত্ররা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ কলকাতার সাংসদের এই দলত্যাগ নিচুতলার সাধারণ কর্মীদের মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, "সংসদের অলিন্দে একদিকে যেমন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, মহুয়া মৈত্র, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা কীর্তি আজাদরা সম্পূর্ণ কোণঠাসা এবং সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছেন, তেমনই কলকাতার পুর রাজনীতি ও সামগ্রিক দলীয় সংগঠনের উপরেও এর এক মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে চলেছে।"

    খাস কলকাতার বুকেই যদি দলের এই দশা হয়, তবে আগামী দিনে নিচুতলার সংগঠনকে ধরে রাখাই শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে চলেছে।
  • Link to this news (eTV Bharat)