এই সময়, তমলুক ও হলদিয়া: রাস্তায় বেরিয়ে খিদে পেলে কেউ হয়তো মিষ্টির দোকানে ঢুকলেন। কেউ পথের ধারে রোল সেন্টার থেকে চাউমিন খেলেন। কেউ খেলেন ভাত-তরকারি। খাওয়ার পরে খিদে তো মিটল, কিন্তু কতটা স্বাস্থ্যকর খাবার খেলেন সেটা নিয়ে কেউ কি মাথা ঘামান? কয়েক বছর আগে বিভিন্ন খাবার দোকান, রেস্তোরাঁয় ভাগাড়ের মাংসের ব্যবহার নিয়ে হইচই বেধে গিয়েছিল। বেশ কয়েক জন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তখনই রাস্তায় ফুটপাথে, হোটেল, রেস্তোরাঁর সরবরাহ করা খাদ্যের গুণমান যাচাইয়ে সরকারি নজরদারির খামতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
রাজ্যে নতুন সরকারের আমলে এ বার সেই খাবারের গুণমান যাচাইয়ের উপরে জোর দেওয়া হয়েছে। সতর্ক করা হয়েছে খাবারে ভেজাল মেশানোর বিষয়ে। শুধু খাবার নয়, ওষুধপত্র থেকে অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও সতর্ক করে সম্প্রতি কড়া বার্তা দিয়েছেন পূর্ব মেদিনীপুরের জেলাশাসক নিরঞ্জন কুমার। খাবারে ভেজাল, ক্ষতিকর রং কিংবা নকল ওষুধ- জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে কোনও রকম আপস নয়। জেলাশাসক স্পষ্ট জানিয়েছেন, রেস্তোরাঁ থেকে ছোট বড় সমস্ত খাবারের দোকানে ভেজাল বা শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর উপাদান মেশানোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সরাসরি এফআইআর দায়ের করা হবে। এমনকী পরিস্থিতি অনুযায়ী 'খুন'-এর মতো কঠোর ধারাও প্রয়োগ করা হতে পারে। জেলাশাসকের এমন মন্তব্যে শোরগোল পড়েছে।
বিশেষ করে পর্যটন নির্ভর দিঘা, মন্দারমণি, শঙ্করপুর কিংবা তাজপুরের মতো এলাকায় বার বারই খাবারের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ, একাধিক হোটেল, রেস্তোরাঁ ও রাস্তার ধারের খাবারের দোকানে নিয়ম না মেনে খাবার তৈরি করা হচ্ছে। কোথাও অতিরিক্ত কৃত্রিম রং, কোথাও নিম্নমানের তেল, আবার কোথাও কাপড়ে ব্যবহৃত রং পর্যন্ত খাবারে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। প্রশাসনের মতে, এই ধরনের খাবার নিয়মিত খেলে সাধারণ মানুষের শরীরে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। দিঘায় জগন্নাথ মন্দির হওয়ার পরে এখানে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যাও বাড়ছে। সেদিকে থেকে এই বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ফুড সেফটি দপ্তর, স্বাস্থ্য দপ্তর এবং প্রশাসনের অন্যান্য আধিকারিকদের নিয়ে বৈঠকে বসেন জেলাশাসক। বৈঠকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, জেলার সমস্ত খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁকে দ্রুত বৈধ রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনতে হবে। যে সব দোকানের এখনও লাইসেন্স বা রেজিস্ট্রেশন নেই তার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি পুলিশ-প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে অবৈধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি বা বিক্রি করা দোকানগুলিতে অভিযান চালানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, শুধুমাত্র অভিযান নয়, সচেতনতার দিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে। আগামী দিনে দোকানদার ও খাদ্য ব্যবসায়ীদের নিয়ে প্রশিক্ষণ শিবিরের পরিকল্পনাও করা হয়েছে। কী ভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে খাবার তৈরি ও সংরক্ষণ করতে হবে, সেই বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। নিরঞ্জন কুমার বলেন, 'খাবারে রং সহ বিভিন্ন ক্ষতিকারক জিনিস মেশানো হয়। এর ফলে মানুষের শরীর মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই ভাবে নকল ওষুধ বিক্রিও বরদাস্ত করা হবে না।
কেউ যদি এই ধরনের কাজ করেন, তাহলে এফআইআর হবে। প্রয়োজনে মার্ডার চার্জও লাগানো হবে। সবাইকে জেলে পাঠানো হবে।' তিনি আরও বলেন, 'আমরা প্রথমে সবাইকে সতর্ক করছি। এখনই সচেতন হয়ে যান। নিয়ম মেনে ব্যবসা করুন। না হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবো।' জেলা খাদ্য দপ্তরের আধিকারিক কর্মচারিদের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার বিডিও, পুলিশ এই অভিযানে থাকছেন। বিভিন্ন স্কুল, আইসিডিএস সেন্টার, সংশোধনাগার, হোমে খাদ্য প্রস্তুত করা হয়। গুণমান বজায় রাখার জন্য সেই সমস্ত জায়গাতেও এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। যারা বাধা দেবেন, আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।
প্রশাসনের এই কড়া অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যকর্মীদের একাংশ। তাঁদের মতে, পর্যটনের জেলায় খাবারের গুণগত মান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, এতে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকবে। তেমনই জেলার পর্যটন শিল্পের ভাবমূর্তিও অক্ষুণ্ণ থাকবে। নন্দীগ্রামের বাসিন্দা অলকেশ দাস বলেন, 'জেলা প্রশাসনের তরফে এটি খুব ভালো পদক্ষেপ। ভেজাল বন্ধ হলে মানুষ সুস্থ জীবন পাবেন।' হলদিয়ার বাসিন্দা তনুভা তনুভা সামন্ত বলেন, 'ভেজাল রুখতে প্রশাসনের উদ্যোগে অভিযান খুব ভালো ভাবনা। মানুষ উপকৃত হবেন। মিষ্টির দোকান, ওষুধ দোকান, হোটেল, রেস্তোরাগুলিতে লাগাতার সারপ্রাইজ ভিজিট দরকার। তবে ভেজালমুক্ত খাদ্য পাবেন সাধারণ মানুষ।'
তবে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও জেলায় খাদ্য দপ্তরে পর্যাপ্ত সংখ্যক কর্মী, আধিকারিকের যে অভাব রয়েছে তাতে এই অভিযান কতটা সাফল্যের সঙ্গে করা যাবে প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়েও। কারণ, সুচারুভাবে অভিযান চালাতে আরও কর্মী এবং আধিকারিক প্রয়োজন বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে।