• রেস্তোরাঁর নাম ‘নবান্ন’? মমতার চোখ পড়তেই পাল্টে হয় ‘পার্বণ’
    এই সময় | ১০ জুন ২০২৬
  • সঞ্জয় দে, দুর্গাপুর

    নামে কিন্তু অনেক কিছুই এসে যায়! নাম ছিল ‘নবান্ন’, সেটা বদলে করতে হয়েছি‍ল ‘পার্বণ’। আর নাম বদলের জন্য সুপ্রিয় গঙ্গোপাধ্যায়কে গুণাগার দিতে হয়েছিল অন্তত লাখ পনেরো টাকা! তার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন রাজ্যের পূর্বতন সরকারকেই দায়ী করছেন সুপ্রিয়।

    এই ‘নবান্ন’ ছিল দুর্গাপুরের একটি রেস্তোরাঁ, সুপ্রিয়র হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় ২০০৮–এ। জমির নতুন আমন ধান কাটার পরে অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম দিনে নবান্ন উৎসবে মেতে ওঠে গ্রামবাংলা। সেই সূত্রেই সুপ্রিয় রেস্তোরাঁর নাম রেখেছিলেন ‘নবান্ন’। এই নামটিকে ট্রেডমার্ক করার জন্য ২০০৮–এর ৭ অগস্ট ভারত সরকারের কাছে আবেদন aকরেছিলেন তিনি। খাতায়কলমে ২০০৯–এর ৪ মার্চ তার অনুমোদনও পেয়ে যান। কিন্তু সেই সাধের নামে ভাগ বসায় রাজ্যের প্রশাসনিক সচিবালয় ‘নবান্ন’।

    মঙ্গলবার সুপ্রিয় জানান, ২০১৬–র ২৬ ফেব্রুয়ারি দুর্গাপুরের সৃজনী হলে প্রশাসনিক বৈঠক করতে এসেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সুপ্রিয়র ‘নবান্ন’ থেকে সেই প্রশাসনিক বৈঠকে স্ন্যাক্স–সহ খাবার সরবরাহ করা হয়। খাবারের প্লেট, টিস্যু পেপার, চামচ, রেস্তোরাঁর স্টাফদের পোশাক, সব কিছুতেই ছিল ‘নবান্ন’ লেখা লোগো। তা নজরে আসে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর। ওই বছরের ২৮ জুলাই রাজ্যের তরফে দুর্গাপুর পুরসভায় একটি চিঠি পাঠানো হয়। তাতে জানিয়ে দেওয়া হয়, রেস্তোরাঁর নাম ‘নবান্ন’ রাখা যাবে না। ‘নবান্ন’ ও ‘উত্তরকন্যা’ এই দু’টি নাম কোনও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে না। সরকারি নির্দেশ মানতে বাধ্য হন সুপ্রিয়। তখনই ‘নবান্ন’ নামটি বদল করে সুপ্রিয় রেস্তোরাঁর নাম রাখেন ‘পার্বণ’। এই নামেই ২০১৭–তে নতুন করে যাত্রা শুরু হয় তাঁর রেস্তোরাঁর।

    এ দিন তিনি বলেন, ‘রেস্তোরাঁর নাম বদলের জন্য আমার প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়। ক্রকারিজ়, কাঁসার থালা, বাটি, গ্লাস–সহ স্টাফদের পোশাকে নবান্ন ট্রেডমার্ক ছিল। সব ফেলে দিয়ে নতুন কিনতে হয়েছে।’ তাঁর সংযোজন, ‘নাম বদলের পরে প্রথমে বিক্রিও কিছুটা কমে গিয়েছিল। যাঁরা নিয়মিত আসতেন, তাঁরা ভেবেছিলেন, রেস্তোরাঁর হাতবদল হয়েছে। আমি নিজে বসে থেকে অতিথিদের বুঝিয়েছি, হাতবদল হয়নি। নামবদল হয়েছে। খাবারের স্বাদও সব একই আছে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর আজ পার্বণ একটা পরিচিত নাম।’ তবে সাধের নাম সরকারি নির্দেশিকা জারি করে বদলে ফেলার যন্ত্রণা তাঁর ভিতরে ভিতরে রয়েই গিয়েছিল।

    রাজ্য প্রশাসন সূত্রের খবর, ২০১৩–এর ৫ অক্টোবর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে রাইটার্স বিল্ডিংস থেকে সচিবালয় উঠে যায় হাওড়ার শিবপুরের ‘নবান্ন‍ে’। এই বহুতল ভবনটি তৈরি হয়েছিল বাম জমানাতেই, গারমেন্ট হাব হিসেবে ব্যবহারের জন্য। তবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জমানায় সেখানে গারমেন্ট হাব চালু হয়নি। তার আগেই ক্ষমতার বদল হয় রাজ্যে। তখন এই বহুতলের আলাদা কোনও নাম ছিল না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই সচিবালয়ের নাম রাখেন ‘নবান্ন’।

    সূত্রের খবর, শুধু নামকরণ নয়, ২০১৫–তে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে রাজ্যের পূর্ত দপ্তরের তরফে বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়ে দেওয়া হয় কোনও আবাসন বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ‘নবান্ন’ নামটি ব্যবহার করা যাবে না। পরবর্তী সময়ে মমতা দুর্গাপুরে প্রশাসনিক বৈঠকে এলে জানতে পারেন, সুপ্রিয়র ‘নবান্ন’র কথা। যদিও প্রশ্ন উঠেছে— সুপ্রিয় যদি ‘নবান্ন’ নামটির ট্রেডমার্ক সরকারি ভাবেই নিয়ে রাখেন, তা হলে কী ভাবে চার বছর বাদে প্রশাসনিক সচিবালয়ের নামকরণ ‘নবান্ন’ করল তৎকালীন রাজ্য সরকার? দুর্গাপুর পুরসভার তৎকালীন মেয়র, তৃণমূলের অপূর্ব মুখোপাধ্যায়ের জবাব, ‘নবান্ন থেকে নির্দেশ এসেছিল। সেই মতো রেস্তোরাঁর নাম বদল করেছিলেন সুপ্রিয়।’

    রাজ্যে পালাবদলের আগে বিষয়টি নিয়ে হইচই হয়নি স্বাভাবিক ভাবেই। সুপ্রিয়ও রাজ্য সরকারের সঙ্গে কোনও আইনি লড়াইয়ে যাননি। তবে এখন বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় রাজ্যের পূর্বতন সরকারকে নিশানা করেছেন দুর্গাপুর পূর্ব কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়। এ দিন তিনি বলেন, ‘ভারত সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদিত ট্রেডমার্ক নবান্ন। সেটা প্রথম পেয়েছিলেন সুপ্রিয় গঙ্গোপাধ্যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্দেশিকা জারি করে তা বন্ধ করতে পারেন না। তদন্ত করলে দেখা যাবে, মাননীয়া জোর খাটিয়ে এমন অনেক কিছুই করেছেন।’

    সেই সাধের নাম কেড়ে নেওয়ার জন্য এখনও কষ্ট পান সুপ্রিয়। তবে আর পিছন ফিরে তাকাতে চান না তিনি— এই পালাবদলের পার্বণেও! বলেন, ‘ন’বছর ধরে অনেক স্ট্রাগল করে ‘পার্বণ’কে দাঁড় করিয়েছি। আমার দিক থেকে আগের নাম ফেরত পাওয়ার কোনও চাহিদা নেই। এখন সরকারের দিক থেকে যদি নামটা ফেরত নিতে বলা হয়, তখন ভেবে দেখব।’

  • Link to this news (এই সময়)