দলের সঙ্গে দূরত্ব রচনায় তাঁর কোনও অপরাধবোধ নেই। অপরাধবোধ নেই লোকসভায় তৃণমূলের নতুন ‘ব্লক’ গড়া নিয়েও। শুধু একটি বিষয়েই অপরোধবোধ কাজ করছে বিদ্রোহী শতাব্দী রায়ের মধ্যে। তা হলো— খারাপ সময়ে দিদির সঙ্গত্যাগ করতে হচ্ছে!
তবে ‘এই সময় অনলাইন’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বীরভূমের তৃণমূল সাংসদ স্পষ্ট জানালেন, অপরাধবোধ কাজ করলেও এই মুহূর্তে তাঁর কিছু করার নেই। তার জন্য দায়ীও স্বয়ং তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই! শতাব্দীর কথায়, ‘আমার একটাই অপরাধবোধ কাজ করছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের খারাপ সময়ে তাঁকে ছাড়তে হচ্ছে। কিন্তু দিদিই সেই জায়গায় নিয়ে গেল আমাদের!’ সাংসদ জানান, তিনি এখনও তৃণমূলনেত্রীর সঙ্গে ‘ইমোশনালি অ্যাটাচড’ (মানসিক ভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে)। এই মুহূর্তে তিনি যে নেত্রী মমতার পাশে নেই, তাতে তাঁর কষ্টও হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বললেন, ‘আমার দুঃখটা যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগে কেয়ার করতেন, তা হলে এটা হতো না।’
কোন পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত, তাও জানিয়েছেন সাংসদ। বলেন, ‘ ভোটের রেজ়াল্টের পরে যখন কালীঘাটের বাড়িতে বৈঠক ডাকা হলো, আমরা গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানেও হার নিয়ে কোনও বিশ্লেষণ নেই। দিদির মনে হচ্ছে, উনি হারেননি। কিন্তু দলের ভিতরে হার নিয়ে কথা বলতেই হবে। কিন্তু সেখানে তো উনি জিজ্ঞেস করবেন, তোমার এলাকার কেন এ রকম ফল হলো। সে রকম কোনও আলোচনা নেই। শুধু বলছেন, চিঠি লেখো। দু’-একজন বলতে গেল। থামিয়ে দেওয়া হলো। চ্যানেলে-ইন্টারভিউতে দিদি যা বলছেন, সেগুলোই ওখানে বলা হচ্ছে। এ ভাবে দল চলতে পারে না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এই দলের সঙ্গে আর থাকা যায় না।’
গত সোমবার তৃণমূলের যে ক’জন সাংসদ লোকসভার স্পিকারকে চিঠি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারকে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে শতাব্দী অন্যতম। সূত্রের খবর, সেই দিন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে বৈঠকের পরেই তাঁরা এই সিদ্ধান্ত নেন। সেই বৈঠকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন। পরে সন্ধ্যায় দিল্লিতে শতাব্দীর বাসভবনে বিদ্রোহীদের আরও একপ্রস্ত বৈঠক বসেছিল। সেখানেও গিয়েছিলেন শুভেন্দু। শতাব্দী জানান, লোকসভায় মোদী সরকারকে সমর্থনের পাশাপাশি, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও বেশ কিছু প্রত্যাশার কথা জানিয়েছিলেন তাঁরা। তার মধ্যে অন্যতম হলো— তৃণমূল জমানায় যে যে ভুল হয়েছে, তা যেন আর না হয় এ রাজ্যে। শতাব্দী বলেন, ‘উনি আমাদের কথা শুনেছেন। সে সব ব্যাপারে পদক্ষেপ করা হবে বলে আশ্বাসও দিয়েছেন। সেই মতো কাজ হচ্ছেও রাজ্যে।’
কিন্তু প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে শতাব্দীর অনুযোগ (কিছু ক্ষেত্রে তা ক্ষোভ-অভিমানও বটে), তিনি একটা সময়ের পরে জনপ্রতিনিধিদের কথা শোনাই বন্ধ করে দিয়েছিলেন। বিদ্রোহী সাংসদ বলেন, ‘দিদি অনেক দিন ধরেই কথা শোনা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। প্রার্থিতালিকা ঘোষণার সময়ে শেষ দিনেও দিদিকে হোয়াটসঅ্যাপ করেছিলাম। বীরভূমে কোথায় কী ভুল হচ্ছে প্রার্থীচয়নে, জানিয়েছিলাম। তখনও এক লাইনে উত্তর এসেছিল। কোনও এক ব্যক্তির নাম করে বলছেন, ওর বদমায়েশি। মমতার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আমার নেই। কিন্তু একটা এলাকায় ১৭ বছর ধরে রয়েছি। এলাকার কোন লোকটা ভালো, কে খারাপ-দুর্নীতিবাজ, এটা বোঝার তো ক্ষমতা ছিল। কিন্তু উনি শোনেননি।’
এ প্রসঙ্গে, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেকের প্রসঙ্গও টানেন শতাব্দী। তাঁর বক্তব্য, অভিষেক তাঁর কথা শুনেছেন। তাঁর থেকে নানা সময়ে মতামতও নিয়েছেন। শতাব্দীর কথায়, ‘অভিষেক কিন্তু শুনত। অন্যের কথা বলতে পারব না। আমার ক্ষেত্রে শুনেছে। অনেকেরই মতামত জানতে চাইত। এই গুণটা ছিল। স্টেপও নিয়েছে।’
সংসদে বিদ্রোহীরা মিলে যে নতুন ‘ব্লক’ তৈরি করেছেন, তা আদতে তাঁদের প্রতীকী প্রতিবাদ বলেই জানিয়েছেন শতাব্দী। তিনি বলেন, ‘আমরা এই দলের সঙ্গে থাকতে চাইছি না। যে ভাবে দলের অহঙ্কার-ঔদ্ধত্য বেড়ে গিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। যত দিন মুকুল রায় ছিলেন, তত দিন উনি শুনতেন। দলে বলার জায়গায় ছিল। সব সমাধান হতো না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত উনি শুনতেন। উনি চলে যাওয়ার পর থেকে আর শোনার কেউ ছিলেন না। দলে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। অভিষেকপন্থী আর মমতাপন্থী। কর্মীর আরও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন।’ তবে শতাব্দীর বক্তব্য, তাঁদের এই মুহূর্তে বিজেপিতে যোগদানের কোনও পরিকল্পনা নেই। তাঁর কথায়, ‘আমরা আলাদা ব্লক। আলাদা বসব। আলাদা আলোচনা করব।’
কেন বিধানসভা ভোটে হার, তার কারণও বিশ্লেষণ করেছেন শতাব্দী। বলেছেন, ‘যাঁরা আবেগ দিয়ে ভালোবেসে দল করতেন, তাঁদের দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। সংস্থার উপর ভরসা করা হয়। নেতাদের ভরসা না করার ফল এটা। তবে সবচেয়ে বড় কারণ দুর্নীতি। বিশাল দুর্নীতি।’ অভিষেক প্রসঙ্গে তাঁর মত, ‘অভিষেক খুব বুদ্ধিদীপ্ত। অভিষেকের জীবনযাপন মানুষ ভালো চোখে দেখেননি। দলটার ইউএসপি ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিপ্লিসিটি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাটির সঙ্গে থাকা। ২০০৯-তেও ইলেকশন করেছি। কেউ টাকাপয়সা চায়নি। তখন আবেগে ভোট হতো। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এত বছরের অভিজ্ঞতা এবং অভিষেকের প্রযুক্তি নির্ভর পদ্ধতি, দু’জনে একসঙ্গে থেকে কাজ করলে দলের ভালো হত। ইতিহাসে লেখা থাকবে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো জনপ্রিয় নেত্রীর দল একমাসে শেষ হয়ে গেল।’