গত কয়েকদিন ধরে দফায় দফায় আলোচনা শেষে অবশেষে নয়া মন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন করা হল। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজের হাতে রেখেছেন। বাকি দপ্তরগুলি অভিজ্ঞতা এবং নতুন মুখের ভারসাম্য বজায় রেখেই বণ্টন করা হয়েছে। তবে এর মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল শিক্ষাদপ্তর। পূর্বতন তৃণমূল আমলে নিয়োগে দুর্নীতি-সহ একের পর এক অভিযোগ সামনে আসে এই দপ্তরকে ঘিরে। রয়েছে একাধিক চ্যালেঞ্জও। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষা বিভাগের রাশ জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় এবং দীপক বর্মণের হাতে তুলে দেওয়া হল। জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়কে দেওয়া হয়েছে উচ্চশিক্ষা দপ্তর এবং দীপক বর্মন পেলেন স্কুল শিক্ষাদপ্তর। তাৎপর্যপূর্ণভাবে তাঁরা দু’জনেই ‘সংঘের লোক’। অর্থাৎ আরএসএসের নিয়ন্ত্রণেই যে এই শিক্ষাদপ্তর, তা বলাই যায়।
গত কয়েকদিন আগেই স্কুল-পাঠ্য বইয়ে ভারতের গৌরবময় ইতিহাস বাদ দিয়ে বিকৃত ইতিহাস পড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। দেশের আসল ঐতিহ্য তুলে ধরতে পাঠক্রমে সঠিক ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন বলেও সওয়াল করেন তিনি। শমীক জানান, তরুণ প্রজন্মের নিজের দেশ সম্পর্কে জানা উচিত। জাতীয়বাদের পাঠ দিতে গিয়ে ব্যকরণবিদ ও ভাষাতত্ত্ববিদ পাণিনি, কবি কালীদাস সহ বৈদিক যুগের একাধিক মহারথীর ইতিহাস মনে করিয়ে দেন তিনি। রাজ্যের বাঙালিদের তিনি মনে করিয়ে দেন, তাঁরা প্রথমে ভারতীয়, তারপর বাঙালি।
শুধু শমীক ভট্টাচার্যই নয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কিংবা বিভিন্ন নেতাদের বক্তব্যেও একাধিক সময়ে দেশের বিকৃত ইতিহাস বদলের কথা উঠে এসেছে। উঠে এসেছে জাতিয়তাবাদের কথা। উঠে এসেছে সনাতনী ভারতের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা। উঠে এসেছে বৈদিক বিজ্ঞান-সংস্কৃতির কথা। এমনকী বারবার স্বাধীনতা সংগ্রামের কথাও উঠে এসেছে প্রধানমন্ত্রী-সহ বিভিন্ন নেতাদের বক্তব্যে। এই অবস্থায় বাংলার শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম, শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক মান-সহ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছে আরএসএস নেতৃত্ব। আর এখানেই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে এবার ‘বিকৃত ইতিহাস’ মুছে জাতীয়তাবাদের পাঠ বাংলায়?
তবে দায়িত্ব নেওয়ার পরেই মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টপাধ্যায় জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে জ্ঞানসাগর-গুণসাগরে ছিল। আগামী পাঁচ বছরে এই সরকারের লক্ষ্য বাংলার শিক্ষাক্ষেত্রকে আবার ভারত সেরা করার। এজন্য যা যা করণীয় তা করা হবে। মন্ত্রী বলেন, ”পশ্চিমবঙ্গের মানুষ রাষ্ট্রবাদকে সমর্থন করে এই সরকারকে নিয়ে এসেছে। সেই রাষ্ট্রবাদের উপর আধারিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং ভারতের সঙ্গে অঙ্গীভূত করে, উৎকর্ষতা, নৈপুণ্যে চর্চা করে শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করা হবে।”
এদিকে বাম জমানায় শিক্ষা দপ্তরকে ভাগ করা হয়েছিল। এর পিছনে শরিকদের চাপ ছিল! এমনকী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের শুরুতেও সেই ধারা অব্যাহত ছিল। কিন্তু পরবর্তীসময়ে শিক্ষাদপ্তরকে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রথমে পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং পরে ব্রাত্য বসুকে আলাদা আলাদাভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয় শিক্ষাদপ্তরের। কিন্তু একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। আইনি জটিলতায় আটকে যায় নিয়োগ। নিয়োগের দাবিতে দফায় দফায় উত্তাল হয়েছে বাংলার রাজপথ। এই পরিস্থিতিতে আরএসএসের দীর্ঘদিনের দুই সৈনিক জগন্নাথ এবং দীপকের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।