মার খেয়েছেন। রক্তাক্ত হয়েছেন। কিন্তু ময়দান ছেড়ে পালাননি। তিনি দুধকুমার মণ্ডল। ফাইটার। অনেকটা বক্সার মহম্মদ আলির মতো। বিজেপির দুঃসময়ে সাথী। দলের সুসময়ে মন্ত্রী হলেন। মঙ্গলবার তাঁকে কৃষি দপ্তরের দায়িত্ব দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মন্ত্রিত্ব পেয়ে এই সময় অনলাইন-কে দুধকুমার বললেন, ‘আমি আপ্লুত। দলের কাছে কৃতজ্ঞ।’
সেটা আটের দশক। পশ্চিমবঙ্গে তখন ভরা বাম জমানা। সেই সময়ে কেউ ‘বিজেপি’ করছে শুনলে লোকজন অবাক হয়ে তাকাত। যেন ভিন গ্রহের জীব। রোগাপাতলা চেহারা। মোটা গোঁফ। চকচকে চোখ। ওই চোখ বলে দিত, ছেলেটার রোখ আছে।
দুধকুমার যখন কিশোর, তখনই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘে যোগ দিয়েছিলেন। সেখান থেকে সংসদীয় রাজনীতিতে। ১৯৮৮-তে প্রথম বার পঞ্চায়েত ভোটে লড়েন। শুরুতেই বাজিমাত। বিপুল ভোটে জেতেন। ১৯৯৩ পর্যন্ত ময়ূরেশ্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য ছিলেন।
অনেকে বলেন, বাম জমানায় ময়ূরেশ্বরের মাটিতে বিজেপিকে দাঁড় করানোটা ছিল একক কৃতিত্ব। বিরোধীরাও তা অস্বীকার করে না। ৯৩-এর পঞ্চায়েত ভোটে ফের দাঁড়ান দুধকুমার। সেই বারে জিতে প্রধান হন। পঞ্চায়েত সমিতি, জেলা পরিষদের নির্বাচনেও লড়েছেন। তাঁর উত্থান ‘স্লো বাট স্টেডি’।
২০১১-তে প্রথম বার বিধানসভা ভোটে প্রার্থী হন দুধকুমার। ততদিনে বীরভূমের মাটিতে রাজপাট শুরু করেছে অনুব্রত মণ্ডল। এক খাপে দুই তলোয়ার থাকে না। অনুব্রতর সঙ্গে সংঘাতে জড়ালেন দাপুটে দুধকুমার। চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘আমাকে চমকাবেন না।’ সেই ছবি, খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা রাজ্যে। দুধকুমার হয়ে উঠলেন বঙ্গ বিজেপির পোস্টার বয়। তবে সেই বারের বিধানসভা নির্বাচনে জিততে পারেননি।
২০১৫-য় রাজ্য বিজেপির উপরে তীব্র অসন্তোষে জেলা সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দেন দুধকুমার। শুধু তাই নয়, রাজনীতি থেকেও সাময়িক সন্ন্যাস নেন। অন্য দলে যোগ দেননি। দেওয়া সম্ভবও ছিল না তাঁর পক্ষে। ততদিনে বিজেপি আর তিনি সমার্থক হয়ে গিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অনুরোধে ২০১৬-তে ফের রাজনীতিতে ফেরেন। রামপুরহাট থেকে বিধানসভা নির্বাচনেও লড়েন। কিন্তু সে বারও ভাগ্যলক্ষ্মী মুখ তুলে চাননি। বিভিন্ন সময়ে রাজ্য নেতৃত্বের উপরে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন দুধকুমার। তবে আর দল ছাড়েননি। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বও তাঁকে প্রকাশ্যে তিরষ্কারও করেনি কোনও দিন।
ইতিহাস তৈরি হলো ২০২৬-এ। রাজ্যে জুড়ে গেরুয়া ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে গেল তৃণমূল। দুধকুমারও জিতলেন। সেই ময়ূরেশ্বর কেন্দ্র থেকে বক্সারের মতোই লড়ে ফিরে এলেন। দুধকুমারকে মন্ত্রী করতে দু’বার ভাবেনি রাজ্য বিজেপি।
কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে আপ্লুত দুধকুমার বললেন, ‘মন্ত্রী হতে পারব কোনও দিন ভাবিনি। দল আমাকে যে ভাবে সম্মান জানিয়েছে, আমি আপ্লুত। দলের কাছে চির কৃতজ্ঞ।’ দুধকুমার কৃষক পরিবারের সন্তান। মাটিকে চেনেন হাতের তালুর মতোই। কৃষি মন্ত্রক সামলাতে তাঁর যে অসুবিধা হবে না, সেই নিয়ে একশো শতাংশ আত্মবিশ্বাসী তিনি। দুধকুমারের কথায়, ‘কৃষিমন্ত্রী হয়ে ভালো লাগছে। আরও ভালো লাগবে যদি কৃষকদের জন্য কিছু করতে পারি।’
দুধকুমারের রাজনৈতিক জীবন সংঘর্ষময়। মন্ত্রিত্বে কিছু বদলাবে? নতুন রূপকথা লিখতে পারবেন বিজেপির দুঃসময়ের সঙ্গী?