• রাজ্যের মদ ব্যবসায় ব্যাপক দুর্নীতি ! কোটি কোটি টাকা তছরুপে নাম জড়াল অভিষেকের
    eTV Bharat | ১০ জুন ২০২৬
  • কলকাতা, 10 জুন: রাজ্যে মদের ব্যবসায় একাধিক অনিয়মের কথা ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে। তবে এবার এই বিষয় আরও বড় একটি আর্থিক তছরুপের খবর প্রকাশ্যে এলো। রাজ্যে মদের দোকানিদের থেকে 'beer carrying cost' খাতে নির্দিষ্ট অংকের টাকা নেওয়া হয়, যার বিলে কোনও উল্লেখ থাকে না। আর এই খাতে প্রায় 100 কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে বলেই বিস্ফোরক দাবি করেছে ওয়েস্ট বেঙ্গল লিকার অ্যাসোসিয়েশন। মদের ব্যবসা নিয়ে একাধিক আর্থিক তছরুপের খবর প্রকাশ্যে আসার পরই এবার মুখ খুলল ওয়েস্ট বেঙ্গল লিকার অ্যাসোসিয়েশন।

    অ্যাসোসিয়াশের দাবি যে, এর আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাঁদের সমস্যার কথা জানালেও তাঁদের কথায় কোনরকম গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এমনকি তাঁদের বিভিন্ন ভাবে ভয় দেখিয়ে বা হুমকি দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এবার রাজ্যে পালা বদলের পর তারা কিছুটা সাহস ও ভরসায় ভর করে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দুর্নীতি নিয়ে প্রকাশ্যে মুখই খোলেননি বরং তারা তাদের দীর্ঘদিনের সমস্যা নিয়ে অর্থ দফতরের অ্যাডিশনাল চিফ সেক্রেটারি এবং রাজ্যের এক্সাইজ কমিশনারকে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে একটি চিঠিও পাঠিয়েছেন।

    রাজ্য সরকারের বেভারেজ কর্পোরেশন বেভকো (Bevco)। এখানে বলে রাখা ভালো যে বেভকো (Bevco) দেশের অন্যান্য রাজ্যে শুরু হলেও সেগুলি মুখ থুবড়ে পড়ে। তাই হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি রাজ্যেই এখন বেভকো (Bevco) রয়েছে। সংগঠনের সেক্রেটারি বিজন পত্র ইটিভি ভারতকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে ডিস্ট্রিবিউটর দের থেকে মদের দোকানদাররা অর্ডারের মাধ্যমে যেই মাল নিতেন সেই মাল দোকানির দোকান পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার দ্বায়িত্ব ছিল ডিস্ট্রিবিউটরদেরই।

    বেভকো (Bevco) গঠন হওয়ার পর তারা যে মাল ডিস্ট্রিবিউটরদের দিতেন সেই মাল কীভাবে তারা বিতরণ করতে সেই বিষয় স্পষ্ট করে বেভকো (Bevco) র গেজেটে উল্লেখ করা রয়েছে। সেই গেজেট নোটিফিকেশন কোথাও বলা হয়নি যে লাইসেনসি দের থেকে জন্য রকম carrying বাবদ টাকা নেওয়া হবে। বরঞ্চ সেখানে খুব স্পষ্ট করে লেখা হয়েছে যে মালের অর্ডার দেওয়ার পরে বেভকো (Bevco)র দায়িত্ব সেই মাল দোকানে দোকানে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু 2023 সাল থেকেই দেখা গেল বিয়ারের ক্যারিং কস্ট হিসাবে ওনারা একটা টাকার অংক দোকানীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেন। প্রতি ক্রেটের দশ টাকা করে ক্যারিংচার্জ দিতে হবে। ভীষণ পাত্র জানান যে এই বিষয় নিয়ে যখন জিজ্ঞেস করায় তাদের জানানো হয় যে এই টাকা না দিলে ডিস্ট্রিবিউটরদের অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। অথচ সেই টাকার কোনও লিখিত অর্ডার লিসেন্সি দের কখনও দেওয়া হয়নি। এবং এই টাকা বিলে দেখানো হতো না।

    এর ফলে ইনকাম ট্যাক্সের থেকে লাইসেন্স এদের একাধিক প্রশ্ন করা হয় যে তারা যে এই ক্যারিং কস্ট হিসাবে টাকাটা দিচ্ছে সেটা তারা কেন দিচ্ছে কারণ বেভকো (Bevco) নির্দেশিকা এত এমন কোন টাকা দেওয়া হবে বলে বলা নেই অর্থাৎ যে আর্থিক স্ক্যাম টা চলছে তাতে লাইসেন্সও জড়িত রয়েছে।

    তিনি আরও জানান যে বিয়ারের ডিস্ট্রিবিউটার এককভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং একমাত্র এই রাজ্যেই বিয়ার ক্যারিং কোস্ট বাবদ টাকা নেওয়া হয়। এই বিষয় নিয়ে দোকানিরা তীব্র আপত্তি জানালে ডিস্ট্রিবিউটররা কিছুটা নড়েচড়ে বসে। এই পাহাড় প্রমাণ অংকের টাকা কার কাছে যেতো সেটা তারা জানতেন না। তবে তারা স্পষ্ট জানিয়েছন যে ভাবে তাঁদের দিনের পর দিন শোষণ করা হয়েছে যার ফলে ব্যবসা চালিয়ে যেতে তাঁদের নাভিশ্বাস উঠেছে।

    কোভিড কালে স্পেশাল ফি এবং রাউন্ড আপ

    শুধু এখানেই শেষ নয় কোভিড কালে স্পেশাল ফি এবং রাউন্ড আপ বলে দুটি বিষয় চালু করা হয়। এই বিষয় বিজন পত্র জানান যে 2021 সালে করোনার সময়ে রাজ্য সরকার প্রতি বোতল মদের স্পেশাল পারপাস ফি চালু করেছিল। পাশাপাশি রাউন্ড অফ Round-off বলে আরও একটি বিষয় চালু করে। বেভকো (Bevco) থেকে মদ কেনার সময় প্রতি বিলে টাকার অঙ্ক রাউন্ড-অফ বা পূর্ণ সংখ্যায় নিয়ে যাওয়ার নামে বাড়তি টাকা নেওয়া হচ্ছে। এই দুটি নিয়মও বন্ধ করা দাবি তোলেন তারা।

    বর্তমানে সমস্ত খরচ বাদ দিয়ে খুচরো বিক্রেতাদের হাতে মাত্র 3.5 থেকে 4 শতাংশ লাভ থাকে। তাঁরা দাবি করেন যে এই লাভের অংশ বাড়িয়ে কমপক্ষে 10 শতাংশ করা হোক। এছাড়াও লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় যত্রতত্র নতুন মদের লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

    বিজন পত্র জানান যে, বাড়তি করের বোঁঝায় তাঁদের ব্যবসা চালানো দায় হয়ে পড়েছে। তাই তাঁরা নতুন সরকারের কাছে এই নিয়মগুলো পুনর্বিবেচনা করার আর্জি জানিয়েছেন।

    রাজ্যে পালাবদলের পর গত সরকারের আমলে যে সর্বগ্রাহী দুর্নীতি হয়েছে একে একে তার পর্দা ফাঁস হচ্ছে। আর এবার মদ ব্যবসা ক্ষেত্রেও যে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে এবং মদ বিক্রেতাদের থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণ দর্শিয়ে যেভাবে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে সেই নিয়ে সরব হল ওয়েস্ট বেঙ্গল লিকার অ্যাসোসিয়েশন।

    কীভাবে এই আর্থিক তছরুপ শুরু হল?

    কীভাবে এই আর্থিক তছরুপ শুরু হল এই বিষয় জানতে হলে আমাদের বেশ কিছুটা পিছিয়ে যেতে হবে। 2017 সালের আগে পর্যন্ত মদের ব্যবসায় সরাসরি রাজ্য সরকারের কোনও হস্তক্ষেপ ছিল না। তবে 2017 সালের পর ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট বেভারেজেস কর্পোরেশন লিমিটেড বা WBSBCL গঠন করা হল। এরপর থেকেই মদের ব্যবসায় সরাসরি রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপ শুরু হল। এরপর 2021 সাল পর্যন্ত সবকিছুই ঠিকঠাক চললেও তারপর থেকেই মদ বিক্রেতাদের বিভিন্ন ধরনের আর্থিক চাপ ও শোষণের মুখে পড়তে হল যার ফলে তাঁদের যেমন একাধিক খাতে অর্থ ব্যয় হতে লাগলো এবং লোভাংশ কমতে শুরু হলো। তারা জানায় যে একের পর এক বাড়তি খরচের জেরেই তাঁদের ব্যবসার লাভ কমে যাচ্ছে এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকান চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

    মদ ব্যবসায় অনিয়মের বিষয়টি প্রাসঙ্গিকতা পেল কীভাবে?

    সম্প্রতি 8 জুন আইএফবি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর পক্ষ থেকে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ অফ ইন্ডিয়া কে একটি চিঠি পাঠানো হয় যেখানে উল্লেখ করা হয় যে সম্প্রতি আইএফবি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিব মনোজ কুমার আগরওয়ালকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন যেখানে সংস্থা জানিয়েছে যে কীভাবে মদের ব্যবসা করতে গিয়ে আইএফবি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিস লিমিটেড সমস্যা পড়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে যে ব্যবসা করতে গিয়ে রাজ্যের এক্সাইজ অথরিটিসের পক্ষ থেকে তাঁদের প্রতি পদে 'ইলিগ্যাল ইন্টারফিয়ারেন্স' হয়েছে যার ফলে তাঁদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই এই বিষয় একটি স্বতন্ত্র তদন্ত করার আবেদন জানিয়েছেন সংস্থা। এখানে বলে রাখা ভালো যে 2020 সালের 25 জুন দক্ষিণ 24 পরগনার নুরপুরে এই সংস্থার প্ল্যান্টে ভাঙচুর চালায় এবং প্ল্যান্টের কর্মীদের উপর হামলার অভিযোগে কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

    এক্ষেত্রে অভিযোগের তীর ছিল ফলতার প্রাক্তন তৃণমূল কংগ্রেস নেতা জাহাঙ্গির খানের দিকেই। জাহাঙ্গির খানের পাঠানো গুন্ডা বাহিনী আইএফবি-র নুরপুরের প্ল্যান্টের ভাঙচুর চালায় বলেই অভিযোগ ওঠে। সেই সময় বিষয়টি জেলাশাসক থেকে শুরু করে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল। এরপর পুলিশি নিরাপত্তা নিয়ে আবারও 3 জুলাই নূরপুরের প্ল্যান্ট পুনরায় চালু করা হয়েছিল।

    আইএফবি-র ঘটনাটি শুধু একমাত্র ঘটনা নয়। এই ধরনের একাধিক ঘটনায় এই রাজ্যে পূর্বতন সরকারের আমলে ঘটেছে যেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মাপের ব্যবসা রাজ্য সরকারের বিভিন্ন ধরনের তোলাবাজির চাপের মুখে পরে কোমায় চলে গিয়েছে। আর যাঁরা প্রতিবাদ করেছে, তাঁদের আইএফবি-র মতোই দশা হয়েছে। তবে আইএফবি একটি বড় মাপের লিস্টেড (NSE) সংস্থা বলেই হয়তো শেষ রক্ষা পেয়েছিল।

    প্রসঙ্গত, 2017 সালের আগে পর্যন্ত রাজ্যের মদের লাইসেন্সি (যারা লাইসেন্স নিয়ে মদের দোকান চালান) তাঁরা খুব নির্ঝঞ্ঝাটে ব্যবসা করতে পেয়েছেন এবং যথাযথ লভ্যাংশ ও পেয়েছন কিন্তু যেদিন থেকে সরকার নিজের হাতে মদের ব্যবসা নিয়েছে সেদিন থেকেই ডিস্ট্রিবিউটরশিপ, wholesaler ট্রেডগুলিকে বন্ধ করে দিয়েছে, সেদিন থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে শুরু করে। অর্থাৎ, আর্থিক গ্যাঁড়াকলে পড়ে হেনস্থার শিকার হতে হয় রাজ্যের মদ ব্যবসায়ীদের।

    এই বিষয় সিটু অনুমোদিত আইএফবি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন লিমিটেড-এর শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি শমীক লাহিড়ী জানিয়েছেন যে, আইএফবি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ-এর নুরপুরের প্ল্যান্টে ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গুন্ডা বাহিনী দিয়ে তোলা তুলতেন। তিনি বলেন, "শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে কর্তৃপক্ষকে চাপ দেওয়া হয় যে, কর্তৃপক্ষ যদি টাকা দিতে থাকে তাহলে ব্যবসা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে না। তাই আইএফবি টাকা দিতে অস্বীকার করায় তৃণমূল কংগ্রেসের গুণ্ডাবাহিনীর প্ল্যান্টে ভাঙচুর চালায়। এরপর আমি জেলাশাসক, এসপি এবং শিল্পমন্ত্রীকে এই নিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু কোনও কাজের কাজ হয়নি ৷ কারণ, তৎকালীন সরকারের মাথায় ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বোতলপিছু পিসি-ভাইপোকে টাকা পাঠাতে হতো।"

    তিনি আরও দাবি করেন যে, ফলতাতে সেজ ও গ্রোথ সেন্টারে যেখানে এক সময় বহু মানুষ কাজ করতেন, সেটা এখন কমতে কমতে তলানিতে এসে ঠেকেছে। সবাই এই তোলাবাজির জন্য পালিয়েছে। আরও একটি বিষয় তিনি জানান যে 2024 সালের নির্বাচনী বন্ডে আইএফবি তৃণমূলকে টাকা দিয়েছিল। যেই টাকার কিছু অংশ তৃণমূলের পার্টি ফান্ডে গেলেও খুব আশ্চর্যজনকভাবে বিহারের একটি রাজনৈতিক দলের ফান্ডে বাকি টাকা গিয়েছিল।
  • Link to this news (eTV Bharat)