• বাংলায় বিনিয়োগ টানাই প্রধান লক্ষ্য, দায়িত্ব নিয়েই টাটাদের ফেরানোর ইঙ্গিত শিল্পমন্ত্রীর
    eTV Bharat | ১০ জুন ২০২৬
  • কলকাতা, 10 জুন: রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর শিল্পক্ষেত্রে বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেন নতুন বিজেপি সরকারের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী তাপস রায়। বুধবার দায়িত্বভার গ্রহণ করেই তিনি স্পষ্ট করে দেন, তাঁর প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হবে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বিনিয়োগকারীদের পুনরায় পশ্চিমবঙ্গমুখী করা। সেই তালিকায় অন্যতম অগ্রগণ্য নাম টাটা গোষ্ঠী।

    মন্ত্রীর এই আশ্বাসের পর নতুন করে আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন সিঙ্গুরের বাসিন্দারা। যদিও সিঙ্গুরেই টাটারা নতুন করে কারখানা গড়বে কি না, সে বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত কোনও নিশ্চয়তা দেননি তিনি। তবে রাজ্যকে প্রকৃত অর্থেই শিল্পবান্ধব করে গড়ে তুলতে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করতে রাজি নয় নতুন প্রশাসন। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনই দফতরের শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করে এবং সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে পূর্বতন সরকারের তথাকথিত শিল্পোন্নয়নের তীব্র সমালোচনা করেন নতুন মন্ত্রী।

    দফতরের রাশ হাতে নিয়েই আমলা ও পদস্থ আধিকারিকদের অত্যন্ত কড়া বার্তা দিয়েছেন তাপস রায়। আগামী দিনে কাজের গতি বাড়াতে এবং বাস্তব পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে অবিলম্বে তিনটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ রিপোর্ট জমার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। প্রথমত, বিগত বছরগুলিতে যে সমস্ত বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী বা উদ্যোক্তা রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁদের একটি তালিকা প্রস্তুত করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁরা ঠিক কী কারণে বাংলা ত্যাগ করলেন, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ কারণও খতিয়ে দেখা হবে।

    সরকারি সূত্রের খবর, প্রায় 6 হাজার 688 জন ব্যবসায়ী এই রাজ্য থেকে পাট গুটিয়েছেন, যাদের ফিরিয়ে আনাই এখন নতুন মন্ত্রীর প্রধান চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, বিগত জমানায় ঘটা করে আয়োজিত ‘বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন’ বা বিজিবিএস-এর মাধ্যমে যে সমস্ত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বা ‘মৌ’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেগুলির বর্তমান অবস্থা কী, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চুক্তিগুলি কেবল কাগজের দলিলেই সীমাবদ্ধ রয়েছে নাকি বাস্তবে কোনও কাজ হয়েছে, তা টেবিল করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তৃতীয় নির্দেশটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে টাটা গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজ্য সরকারের শিল্প দফতরের বর্তমান সম্পর্কের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে মন্ত্রী নিজে টাটা আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলতে যাবেন বলেও জানিয়েছেন।

    সিঙ্গুর এবং টাটা গোষ্ঠীর প্রত্যাবর্তন নিয়ে এক বড়সড় ইঙ্গিত দিয়ে শিল্পমন্ত্রী জানান, সিঙ্গুরে টাটারা যদি পুনরায় কারখানা তৈরি করতে আগ্রহী হয়, তবে তাদের স্বাগত জানানো হবে। তবে বিষয়টি কেবল গাড়ি কারখানাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই প্রসঙ্গে তাপস রায় বলেন, “সিঙ্গুরে টাটারা যদি কারখানা করতে চায়, তবে তারা করতেই পারে। কিন্তু শুধু তো গাড়ি কারখানা নয়, টাটাদের আরও অনেক ধরনের ব্যবসা ও বিষয় আছে। আমরা সর্বোতভাবে চেষ্টা করব তারা যাতে এখানে সেই সমস্ত ক্ষেত্রে বড় বিনিয়োগ করে।”

    অন্যদিকে, বিগত তৃণমূল সরকারের আমলে আয়োজিত বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনকে স্রেফ লোকদেখানো এবং ভাঁওতা বলে তোপ দেগেছেন নতুন শিল্পমন্ত্রী। ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন, “গত পনেরো বছরে রাজ্যে শিল্পও হল না, আর কৃষিও হল না! উনি স্পেনে গিয়ে সামনে হাঁটলেন, পিছনে হাঁটলেন। বিজিবিএস বা পিসিবিএস নামে কিসব করেছেন! কয়েকবার বিজিবিএস করা আসলে স্রেফ লোক দেখানো ছিল, মানুষকে ভাঁওতা দেওয়ার বিষয় ছিল। আমরা অবশ্যই শিল্পের জন্য সম্মেলন করব, তবে সেটা কীভাবে এবং কতখানি কাজের হবে, তা পরে ঠিক হবে।”

    রাজ্যে শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ বরাবরই একটি বড় জটিলতা হিসেবে দেখা গিয়েছে। সেই জট কাটাতেও দ্রুত পদক্ষেপ করার আশ্বাস দিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি জানান, নতুন সরকারের প্রথম 100 দিনের মেয়াদের মধ্যেই একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং আধুনিক ‘জমি অধিগ্রহণ নীতি’ বা ল্যান্ড পলিসি তৈরি করা হবে, যা শিল্পপতিদের জমি পাওয়ার প্রক্রিয়াকে অনেকটাই সহজতর করবে।

    এরই মাঝে আগামী 13 তারিখ রাজ্যে আসছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। হাওড়ার সাঁকরাইল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে আমুল গোষ্ঠীর প্রায় 650 কোটি টাকার একটি মেগা ডেয়ারী প্রকল্পের আধুনিক কারখানা উদ্বোধন করবেন তিনি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের দেওয়া ‘শিল্পের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনার’ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে এটিই হতে চলেছে প্রথম বড় মাইলফলক।

    এই মেগা প্রকল্পের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানিয়ে তাপস রায় বলেন, “আমূলের মতো একটা বড় ইন্ডাস্ট্রি এই রাজ্যে আসাটাই অন্য বড় বড় শিল্পপতিদের কাছে একটা মস্ত বড় ইতিবাচক ইঙ্গিত।” সব মিলিয়ে, প্রথম দিনই নতুন শিল্পমন্ত্রীর এই তৎপরতা রাজ্যের ঝিমিয়ে পড়া শিল্পক্ষেত্রে এক নতুন দিশা দেখাতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
  • Link to this news (eTV Bharat)