বহরমপুর ও কলকাতা, 10 জুন: তৃণমূল কি কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যাবে? প্রায় তিনদশক পর কি কংগ্রেসের নেত্রী হিসেবে দেখা যাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে? তৃণমূল সুপ্রিমোর নয়াদিল্লি সফরের পরই রাজনীতির অন্দরে এই জল্পনা ছড়াতে শুরু করেছে৷ এই জল্পনা যদি সত্যি হয়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের নেতারা বিষয়টিকে কীভাবে গ্রহণ করবেন? বুধবার বিকেলের পর থেকে রাজ্য রাজনীতিতে এটাই এখন চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে৷
বহরমপুরের প্রাক্তন সাংসদ তথা প্রদেশ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় ইটিভি ভারত-এর তরফে৷ এই জল্পনার কথা শুনে তিনি বলেন, ‘‘তৃণমূলের কারও সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। কংগ্রেসকে খতম করতে চেয়েছিল তৃণমূল। কংগ্রেসকে বাঁচিয়ে রাখতেই আমি তার বিরোধিতা করেছিলাম। আন্দোলন সংগঠিত করেছিলাম।’’
প্রসঙ্গত, অধীর চৌধুরী রাজ্য রাজনীতিতে বরাবর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কট্টর বিরোধী হিসেবেই পরিচিত৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও পরবর্তীতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধেও তাঁকে তোপ দাগতে দেখা দিয়েছে৷ এদিন তৃণমূল ও কংগ্রেসের মিশে যাওয়ার জল্পনা নিয়ে কার্যত কটাক্ষই উঠে এসেছে অধীরের বক্তব্যে৷ তিনি বলেন, ‘‘এখন কে কার সঙ্গে দেখা করছে, কে কোথায় যোগ দিচ্ছে, আমি জানি না। তবে এটা সত্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হেরে গিয়েই আজ কংগ্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। না হারলে এই পরিস্থিতি তৈরি হত না।’’
এই নিয়ে মুখ খুলেছেন অধীর চৌধুরীর আরেক সতীর্থ আব্দুল মান্নানও৷ তিনি বলেন, ‘‘যাঁরা তৃণমূলকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন, তাঁরা বুঝবেন। তাঁরা তো অনেক বিজ্ঞ রাজনৈতিকবিদ আছেন, তাঁরা সবকিছু জানেন। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি তৃণমূলকে নিয়ে কোনও রাজনীতি চলতে পারে না। এরকম গিরগিটি কোথাও দেখিনি। ভূ-ভারতে কোথাও কেউ দেখেছেন বলে মনে হয় না। এত দুর্নীতিগ্রস্ত দল ভারতবর্ষের কোনও রাজনীতির মধ্যে নেই। তাদের নিয়ে কে চলবে, সেটা তাদের ব্যাপার। আমি এব্যাপারে নেই। আমি নিজেকে কংগ্রেসের একজন এমওভি (মোস্ট অর্ডিনারি ভলান্টিয়ার) বলে করি।’’
বামফ্রন্ট আমলে তৃণমূল এবং কংগ্রেসের মধ্যে জোট করতে সমন্বয়ের ভূমিকা পালন করেছিলেন আব্দুল মান্নান। এই বিষয়ে মান্নানের আরও দাবি, ‘‘আমি তো রাজনীতিতে সেইভাবে সক্রিয়ভাবে জড়িত নই। আর 2011 সালে সিপিএমের রাজত্বের পরিবর্তন চেয়েছিলাম। পার্সোনাল ইন্টারেস্টে নয়৷ আমাকে নমিনেশন না দিলেও আমি কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীর প্রচারে গিয়েছি। অনেক জায়গায় প্রচার করেছি। একটা নীতি এবং আদর্শের কথা ভিত্তি করে একটা উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা সেদিন বলছিলাম যে পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম তথা অবামফ্রন্ট একটা সরকার হবে। সেটা করতে পেরেছি৷ কিন্তু তাতে আমার ব্যক্তিগত কাজে লাগেনি৷ আজ আমি রাজনীতি থেকে অনেক দূরে, আজ আমি রাজনীতিতে কোনও পজিশনে নেই। আমার কথা নেই। অনুমানের উপর ভিত্তি করে কোনও মত নেই।’’
সিপিএম তথা বামফ্রন্টকে হারাতে কংগ্রেস ও তৃণমূল যেমন জোট করেছিল, তেমনই 2016 সালে ও 2021 সালে সিপিএম তথা বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস একছাতার তলায় এসেছিল তৃণমূলকে হারাতে৷ এবার কংগ্রেস ও তৃণমূল মিশে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়েছে, সেই নিয়ে কী বলছে সিপিএম? দলের নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, ‘‘কংগ্রেসে যদি তৃণমূল দল মিশে যায়, অনুমান ভিত্তিক কথা বলাটা খুব সমীচীন না। আমাদের কিছু যায় আসে না।’’
এর পর তাঁর সংযোজন, ‘‘কিন্তু এটা ঠিক যে মানুষের কাছে ঘৃণিত হয়ে যাচ্ছে, দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। মানুষের কাছে খারিজ হয়ে গিয়েছে। তো সে কোথায় যাবে, তাকে কে নেবে, কেনই বা নেবে। নেওয়ার তো কথা না, কিন্তু যার দুর্নীতি নিয়েই যার সারা রাজনীতির জীবন। সে কখনও বিশ্বাসযোগ্য হবে না, হতে পারে না। তাকে সঙ্গে নিয়ে কংগ্রেসের যদি সুবিধা হয় কংগ্রেস নেবে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘কিন্তু মানুষের কাছে আরও বেশি ব্রাত্য হবে। শুনে রাখুন, মানুষের কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে যাবে যেভাবে বিজেপি চলছে, তার বিরুদ্ধে বিরোধী। একমাত্র বামপন্থীরা। এছাড়া কোনও স্পেস নেই। যদি কংগ্রেস এবং তৃণমূল এক জায়গায় থাকে, ওটা কোনও বিরোধী স্পেসই না। একমাত্র বিরোধী স্পেস বাম, এটা নির্দিষ্টভাবে মানুষ আবারও বুঝতে পারবে।’’
শুধু তাই নয়, কংগ্রেস এবং তৃণমূল মিশে গেলে তৃণমূলের বিপুল সম্পত্তির কী হবে, সে বিষয়ে সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, ‘‘মমতা কংগ্রেসে মিশে যাবেন কি না, কংগ্রেস তাঁকে নেবে কি না, এসব অনেক প্রশ্ন আছে, আমি তার মধ্যে যাচ্ছি না। যদি মিশে যায় মমতার ফান্ড, আমাদের কি আগ্রহ আছে? মমতার ফান্ড স্বনামে যা আছে, বেনামে আছে, ভাইপোর কাছে কী আছে? দেশ-বিদেশে কী আছে? ফলে ভাগাভাগি লড়াইতে উনি থাকবেন। ওই ফান্ডের থেকে মানুষ বুঝতে পারছে না। একেবারে দুর্নীতির আঁতুরঘরের মতো করে মমতার ফান্ড যে হাত দেবে না, সেই ভালো। হাত দেওয়াটা বিপজ্জনক।’’
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, কংগ্রেসের নেত্রী হিসেবেই উত্থান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের৷ 1998 সালে তিনি কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল তৈরি করেন৷ 2011 সালে বাম জমানার অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন৷ সেই সময় কংগ্রেসই ছিল তৃণমূলের জোটসঙ্গী৷ পরবর্তীতে পুর-পঞ্চায়েত থেকে বিধানসভা-লোকসভা, সব ভোটেই একাই লড়েছে তৃণমূল৷ জাতীয়স্তরে একমঞ্চে কংগ্রেস ও তৃণমূলকে দেখা গেলেও রাজ্যে নির্বাচনী সমঝোতা কখনও হয়নি৷
2026 সালের বিধানসভা ভোটেও এককভাবে লড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস৷ ফলাফলে বিজেপির কাছে তাদের পর্যুদস্ত হতে হয়েছে৷ তার পরই তৃণমূলে মুষল পর্ব শুরু হয়েছে৷ প্রথমে বিধায়করা বিদ্রোহ শুরু করেন৷ 58 জন বিধায়ক নিজেদের নেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বেছে নেন৷ তার জেরে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে যান তিনি৷ এর পর সাংসদদের মধ্যেও বিদ্রোহ শুরু হয়৷ এখনও পর্যন্ত যা খবর, লোকসভায় তৃণমূলের দুই তৃতীয়াংশ সাংসদ এনডিএ-কে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন৷ বিদ্রোহীদের সঙ্গে দিল্লিতে বৈঠক করেছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী৷ রাজ্যসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন দুই তৃণমূল সাংসদ (সুখেন্দুশেখর রায় ও সুস্মিতা দেব)৷
এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে গিয়ে বৈঠক করেছেন ইন্ডিয়া ব্লকের সঙ্গে৷ তার পর মমতা সোনিয়া গান্ধির সঙ্গে দেখা করেন৷ বুধবার রাহুল গান্ধি ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৈঠক হয়েছে৷ সূত্রের খবর, মমতাকে কংগ্রেসে ফেরার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে গান্ধি পরিবারের তরফে৷ এখন দেখার সেই প্রস্তাবে আদৌ বাস্তবায়িত হয় কি না!