নিজস্ব প্রতিনিধি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: বুধবার সকাল সাড়ে ৯টা। সবে কর্মচঞ্চল হচ্ছে শহরের পথঘাট। আলিপুরে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদ ভবনে তখনও এসে পৌঁছাননি কর্মী-আধিকারিকরা। বিভিন্ন তলে সাফসুতরোয় ব্যস্ত ছিলেন সাফাইকর্মীরা। তাঁরাই প্রথম দেখেন, ভবনের তিনতলা থেকে কুণ্ডলী পাকানো কালো ধোঁয়া বেরচ্ছে। বিপদ বুঝতে পেরে তাঁরা দ্রুত নীচে নেমে আসতে গিয়ে টের পান, আগুন দ্রুত ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। প্রাণ বাঁচাতে তিন সাফাইকর্মী উঠে যান ছাদে। ততক্ষণে আগুনের লেলিহান শিখা ঠিকরে বেরচ্ছে বহুতল ভবনের জানালা দিয়ে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে আগুন। তিনতলার পর দোতলা, তারপর একে একে উপরের তলগুলি থেকে আগুন ও ধোঁয়া বেরতে দেখা যায়। দমকলের ২০টি ইঞ্জিন সেই থেকে আগুন নেভানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রাত পর্যন্ত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসায় ক্ষয়ক্ষতি নিয়েও নির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায়নি। তবে বিভিন্ন তলে যেভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আগুন জ্বলেছে, তাতে আর অবশিষ্ট কিছুই পড়ে নেই বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আগুনের গ্রাসে গিয়েছে জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষদের অফিস। এই অফিসগুলির মধ্যে একটি ছিল সদ্য গ্রেপ্তার হওয়া তৃণমূল নেতা তথা ফলতার স্বঘোষিত ‘পুষ্পা’ জাহাঙ্গির খানের। কারণ, তিনি ছিলেন জেলার পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ। সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছে বিভিন্ন তলে অবস্থিত রাজ্য সরকারের শিক্ষা, উদ্যানপালন, বন ও কারাদপ্তরের অফিসের যাবতীয় নথি, আসবাব, কম্পিউটার। একসময় আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভবনের নবম তলে। সেখানে রাখা ছিল বিধানসভা ভোটে ব্যবহৃত ইভিএম। আগুনের যা তীব্রতা ছিল, তাতে সেগুলিও আস্ত নেই বলে আশঙ্কা। আগুন লাগার কারণ কী, তা স্পষ্ট নয়। অসাধু কোনো উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত অন্তর্ঘাত নাকি স্রেফ দুর্ঘটনা, তা নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। কারণ, জাহাঙ্গির জেলে যাওয়ার পরই জেলা পরিষদের বিল্ডিংয়ে আগুন কেন? বা ভোটের আগে জাহাঙ্গিরের ঘরে কোনো গোপন নথি রাখা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ভবনের কর্মীদের মধ্যেই গুঞ্জন, কিছুদিন আগেও এখানে আগুন লেগেছিল। সে যাত্রায় বড়োসড়ো কিছু ঘটেনি। ভোটে তৃণমূলের হার, জাহাঙ্গিরের পতনের পর সেখানেই ফের অগ্নিকাণ্ড! অন্তর্ঘাত নয় তো? পুলিশ জানিয়েছে, অতিরিক্ত জেলাশাসকের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছে। আগুনের উৎসস্থল ঘিরে রাখা হয়েছে। শীঘ্রই ফরেনসিক দল এসে নমুনা সংগ্রহ করবে।
জেলা পরিষদ ও স্থানীয় সূত্রে খবর, এদিন সকালে তৃতীয় তলে অবস্থিত ন্যাশনাল ইনফরমেটিক্স সেন্টার (এনআইসি)-এর অফিসেই প্রথম আগুন দেখা যায়। তারপরই আগুন গ্রাস করে জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষদের অফিসগুলি। সেখান থেকে আগুন দ্বিতীয় তলে ছড়ায়। তারপর কিছুক্ষণের মধ্যেই চতুর্থ তলে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। ছাদে আটকে পড়া তিনজন কর্মীকে দমকলকর্মীরা অনেক কসরত করে নীচে নামিয়ে আনেন। তাঁদের মধ্যে একজন অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এরপর যত সময় গড়িয়েছে, আগুনের তীব্রতা বেড়েছে। দমকলের কর্তারা প্রাথমিকভাবে মনে করছেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অষ্টম ও নবম তল। এই অংশে মিড ডে মিল, সর্বশিক্ষা মিশন, উদ্যানপালন, কারা, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ দপ্তরের অফিস রয়েছে। পঞ্চম তলে ডিআই অফিসের একাংশ এবং চতুর্থ তলে বন বিভাগের অফিস পুড়ে গিয়েছে। জেলা খাদ্য বিভাগ এবং ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পের যে অফিস রয়েছে, তাও ভস্মীভূত হয়েছে বলেই আশঙ্কা। নিজস্ব চিত্র