‘বিয়ে করা মানেই ঘরে একজন পরিচারিকা নিয়োগ করা নয়’। সমাজ ও পরিবারে মহিলাদের অবদান নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য সুপ্রিম কোর্টের। বৃহস্পতিবার বিচারপতি সঞ্জয় করোল ও বিচারপতি এন কোটিশ্বর সিংয়ের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছে, যাঁরা ঘর সামলান, তাঁদের শুধু ‘হোমমেকার’ বা গৃহবধূ বললে তাঁদের অবদানকে খাটো করা হয়। ঘরের চার দেয়ালের বাইরেও সমাজ গঠনে তাঁদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই তাঁদের আসলে ‘নেশন বিল্ডার’ বা দেশ গড়ার কারিগর বলা উচিত।
পথ দুর্ঘটনায় মৃত এক গৃহবধূর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার এক মামলার রায় দান করতে গিয়েই এ দিন শীর্ষ আদালত এই ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ করেছে। মোটর ভেহিকল অ্যাক্টের অধীনে ওই গৃহবধূর দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুতে যে ক্ষতিপূরণ ধার্য করেছিল নিম্ন আদালত, তা অপর্যাপ্ত মনে করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তাঁর পরিবারবর্গ। এ দিন এই মামলার রায়দানের সময়ে হোমমেকার বা গৃহবধূদের পথদুর্ঘটনায় মৃত্যু বা আঘাতের প্রেক্ষিতে ক্ষতিপূরণ দাবির নতুন নীতি স্থাপন করেছে শীর্ষ আদালত।
এর আগে আগে এই ধরনের মামলায় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে হোমমেকার বা গৃহবধূদের নোশনাল ইনকাম বা কাল্পনিক আয়, অদক্ষ বা আধা-দক্ষ শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি অনুযায়ী হিসেব করা হতো। যা সাধারণত খুবই কম, মাসে ৮,০০০–১৫,০০০ টাকার আশেপাশে বা তারও কম।
এ দিন বিচারপতি সঞ্জয় করোলের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট করেছে, গৃহবধূদের অবৈতনিক ঘরোয়া শ্রম প্রথাগত অর্থনীতিতে অদৃশ্য থাকলেও তা আদতে দেশের উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখে। কাজেই পথদুর্ঘটনায় কোনও গৃহবধূর মৃত্যু হলে বা তিনি আহত হলে, ক্ষতিপূরণের হিসেব কষার জন্য এই পুরোনো পদ্ধতি অপর্যাপ্ত। এতে একজন হোমমেকারের অবদানের অবমূল্যায়ন করা হয়।
নতুন নির্দেশিকায় সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, পথ দুর্ঘটনায় কোনও গৃহবধূর মৃত্যু হলে শুধুমাত্র এক অদক্ষ শ্রমিক চলে গেল, এ ভাবে দেখলে হবে না। দেখতে হবে loss of domestic care অর্থাৎ, সংসারের অভিভাবককে হারানোর সমান ক্ষতি হিসেবে।
আদালত বলেছে, ‘তাঁদের হোমমেকার না বলে নেশন বিল্ডার বলা উচিত। গৃহবধূরা শুধু রান্না-বান্না বা ঘর পরিষ্কার করেন না, তাঁরা পরিবারকে গড়ে তোলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলেন এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রাখেন।’
কাজেই মোটর ভেহিকল অ্যাক্টের আওতায় পথ দুর্ঘটনায় কোনও গৃহবধূর মৃত্যু হলে তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রতি মাসে ন্যূনতম ৩০,০০০ টাকার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত। পাশাপাশি, দেশের সমস্ত হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিদের এই ধরনের মামলাগুলি দ্রুত নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই মামলার প্রসঙ্গে বৈবাহিক জীবন নিয়েও তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে আদালত। শীর্ষ আদালত বলেছে, বিয়ের পরে ঘরের সমস্ত কাজ একা স্ত্রীর উপরে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। ঘরকন্নার কাজ কোনও দম্পতির যৌথ দায়িত্ব। বিয়ের পরে কোনও মহিলার ব্যক্তিগত ও পেশাগত আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়ে যায় না। তিনি যদি সংসারের পাশাপাশি নিজের কর্মজীবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান, তবে তাকে কোনও ভাবেই স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির প্রতি ‘নিষ্ঠুরতা’ বলা যাবে না।
আইন ও সমাজ বিশেষজ্ঞদেরা একাংশ বলছেন, দেশের কোটি কোটি মহিলার শ্রম এতদিন অদৃশ্য ছিল, তাকে মূল্যহীন করে রাখা হয়েছিল। সুপ্রিম রায়ে তাঁদের সেই শ্রম ন্যায়বিচার পেল। যুগ যুগ ধরে প্রথাগত GDP-র খাতায় যে ঘরোয়া কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়নি, আদালত এক ধাক্কায় তার একটি পরিমাপযোগ্য রূপরেখা তৈরি করে দিল। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ, স্ত্রীকে ‘পরিচারিকা’ ভাবার পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার গালে দস্তুর মতো এক আইনি চড় বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।