মমতার সব বই অপ্রয়োজনীয়, 'এপাং ওপাং ঝপাং'এর বদলে গুরুত্ব মনীষীদের রচনায়: গ্রন্থাগারমন্ত্রী
eTV Bharat | ১১ জুন ২০২৬
সল্টলেক, 11 জুন: রাজ্যের জনশিক্ষা প্রসার ও গ্রন্থাগার দফতরের নতুন মন্ত্রী হিসেবে বৃহস্পতিবার দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন গৌরিশঙ্কর ঘোষ। এদিন লাইব্রেরি ব্যবস্থা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন তিনি ৷ বিকাশ ভবনে দায়িত্ব গ্রহণের পর মুর্শিদাবাদের বিধায়ক স্পষ্ট ভাষায় জানান, রাজ্যের গ্রন্থাগারগুলিতে আর 'এপাং ওপাং ঝপাং' ধরনের অপ্রয়োজনীয় বই রাখা হবে না।
তাঁর কথায়, লাইব্রেরি এমন একটি জায়গা যেখানে পাঠকদের জ্ঞানচর্চা, গবেষণা এবং মননশীলতার বিকাশ ঘটানোর মতো বই থাকা উচিত। সেই কারণে বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানান মন্ত্রী।
পাশাপাশি এদিন সরাসরি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা বইয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, "আগের সরকারের আমলে অনেক এমন বই গ্রন্থাগারগুলিতে স্থান পেয়েছিল, যেগুলির প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আগের সরকার এখন একনায়কতন্ত্র মানসিকতা চালিয়েছে। তার নিজস্ব আইন প্রযোজ্য ছিল। সেই জন্যই এই সমস্ত অপ্রয়োজনীয় বই লাইব্রেরিতে জায়গা পেয়েছিল।" তাঁর দাবি, সাধারণ মানুষের জ্ঞানবৃদ্ধি বা শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা নেই এমন বই সরকারি গ্রন্থাগারে রাখার কোনও যৌক্তিকতা নেই। তাই ভবিষ্যতে গ্রন্থাগারগুলির সংগ্রহে জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রচিন্তা, আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক বইকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
মনীষীদের রচনা প্রধান্য পাবে
নতুন গ্রন্থাগারমন্ত্রী আরও বলেন, "বাংলার মনীষীদের চিন্তাধারা এবং অবদান সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে আরও বেশি করে পরিচিত করতে হবে। সেই কারণে রাজ্যের গ্রন্থাগারগুলিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, কাজী নজরুল ইসলাম এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচনা ও তাঁদের উপর লেখা গবেষণাধর্মী বইয়ের সংখ্যা বাড়ানো হবে।" তাঁর অভিযোগ, অতীতে বাংলার বহু মনীষীর অবদানকে ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। সেই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃত ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের উপর লেখা বই
একই সঙ্গে তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন। মন্ত্রীর দাবি, পশ্চিমবঙ্গ তৈরির ক্ষেত্রে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘদিন ধরে সেই ইতিহাসকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাই তাঁর জীবন, দর্শন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে লেখা বইও রাজ্যের বিভিন্ন গ্রন্থাগারে রাখা হবে বলে জানান তিনি। একই জিনিস করা হবে রাজ্যের স্কুলগুলি লাইব্রেরিতেও।
গ্রন্থাগার ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে জোর
শুধু বই নির্বাচন নয়, গ্রন্থাগার ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ নিয়েও এদিন একাধিক পরিকল্পনার কথা জানান নতুন মন্ত্রী। তিনি বলেন, "সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজ্যের গ্রন্থাগারগুলিকে ডিজিটাল পরিকাঠামোর আওতায় আনতে হবে। সেই লক্ষ্যে ধাপে ধাপে ই-লাইব্রেরি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।" যাতে বাড়িতে বসেই পাঠকরা বিভিন্ন বই, জার্নাল এবং গবেষণামূলক তথ্যের নাগাল পেতে পারেন, সেই দিকেও নজর দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
লাইব্রেরিয়ান নিয়োগ
এদিন রাজ্যের স্কুলগুলিতে লাইব্রেরিয়ানের অভাবের বিষয়টিকেও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন গৌরিশঙ্কর ঘোষ। তিনি বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ না হওয়ার কারণে বহু স্কুলে একজন লাইব্রেরিয়ানকে একসঙ্গে দুটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। লাইব্রেরিয়ানকে সপ্তাহের কয়েকদিন এক স্কুলে এবং বাকি দিন অন্য স্কুলে কাজ করতে হওয়ায় ছাত্রছাত্রীদের নিয়মিত গ্রন্থাগার পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এর ফলে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা এবং লাইব্রেরিকেন্দ্রিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রেও বাধা সৃষ্টি হয়েছে।"
মন্ত্রী জানান, একজন লাইব্রেরিয়ানের উপর দুটি স্কুলের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া কোনওভাবেই কাম্য নয়। বর্তমানে বিপুল সংখ্যক পদ শূন্য পড়ে রয়েছে এবং সেই কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শূন্যপদ দ্রুত পূরণের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি। তাঁর কথায়, "স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হলে লাইব্রেরি সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি। আর সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজনীয় নিয়োগ, আধুনিকীকরণ এবং মানসম্মত বই সংগ্রহের ওপর জোর দেবে নতুন সরকার।"