• আমেদাবাদের এয়ার ক্র্যাশের এক বছর পার, আজও ওঁদের তাড়া করে বেড়ায় প্লেনের শব্দ
    এই সময় | ১২ জুন ২০২৬
  • এই সময়: একটা কিছু যেন আটকে থাকে বুকের ভিতরে। মাথার উপর দিয়ে প্লেন উড়ে গেলে, তার শব্দে মুচড়ে ওঠে ‘কলিজা’।

    ২৬০টি মৃতদেহের মধ্যে ২৫ বছরের ফাইজ়ানকে ভালো করে শনাক্তও করতে পারেননি রফিক আরব। কফিনবন্দি দেহটা দাফন করে নতমুখে ফিরেছিলেন বাড়িতে বাবা। এক ব্রিটিশ ইউনিভার্সিটি–তে ইসলামিক স্টাডিজ়ের ছাত্র ফাইজ়ান ছুটিতে দিউ–য়ে বাড়িতে এসেছিলেন। ২০২৫–এর ১২ জুন ফিরছিলেন লন্ডন। আমেদাবাদ থেকে টেক–অফ করেই ভেঙে পড়েছিল এয়ার ইন্ডিয়ার ড্রিমলাইনার। এই এক বছরে আর বিমানবন্দরমুখো হননি রফিক। মনস্থির করেছেন, বাকি জীবনটাও ফ্লাইটে উঠবেন না।

    পিটিআইয়ের সাংবাদিককে বলেছেন, ‘ফ্লাইটে বসে ছেলে লিখেছিল, পাপা, আই হ্যাভ বোর্ডেড দ্য ফ্লাইট অ্যান্ড আই অ্যাম গোয়িং। এখন প্লেনের শব্দ শুনলে ভয় লাগে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া দেহগুলো।’ শোকে পাথর হয়ে গিয়েছেন ফয়জ়ানের মা। দুই ছোট ভাইয়ের মুখ থেকে যেন হাসি উড়ে গিয়েছে।

    অজয় পারমার তো ফ্লাইটেই ছিলেন না। তা সত্ত্বেও তাঁর ২৮ বছরের জীবন থেকে যাবতীয় সুখ–শান্তি কেড়ে নিয়েছে সেই ক্র্যাশ। ড্রিমলাইনার ভেঙে পড়েছিল মেঘানিনগরে মেডিক্যাল কলেজের হস্টেলে। তার পাশ দিয়ে মোটরবাইকে বাড়ি ফিরছিলেন অজয়। মাত্র এক মাস আগে বিয়ে হয়েছে। আচমকাই বিমান ভেঙে চারপাশে আগুন ছড়িয়ে পুড়িয়ে দেয় গার্ডেনার অজয় ও তাঁর মোটরবাইককে। ঝলসে যায় অজয়ের দুই হাত আর দুই পা। দু’মাস পরে হাসপাতাল ছাড়ার সময়ে চিকিৎসক বলেছিলেন, রোদ্দুরে কাজ করা যাবে না। কাজ চলে যায় অজয়ের। নেমে আসে আর্থিক অনটন। বদলে যায় অজয়ের চেহারা। ‘কদর্য’ অজয়কে, তাঁর আর্থিক অবস্থার মধ্যে ফেলে যান নববিবাহিতা।

    তালিকাটা দীর্ঘ। সে দিন বিমানে ক্রু আর যাত্রী মিলিয়ে ছিলেন ২৪২ জন। বেঁচে যান শুধু বিশ্বাস কুমার রমেশ। ভারতীয়, এখন ব্রিটিশ নাগরিক রমেশ নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন লোক–লৌকিকতা থেকে। তাঁর কয়েকটা সিট পরে থাকা ভাইয়ের দেহ শনাক্ত করেছিলেন রমেশ। সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট চলছে তাঁর। বিমানটি হস্টেলে ভেঙে পড়ার পরে তার অভিঘাতে মারা যান আরও ১৯ জন। মৃতের আত্মীয় এবং আহতদের ক্ষতিপূরণ দিয়েছে সরকার এবং এয়ার ইন্ডিয়া। কিন্তু, পাকাপাকি ভাবে যে বিপর্যয় নেমে এসেছে তাঁদের এবং পরিবারের জীবনে, টাকার কোনও অঙ্কেই তা পূরণ হওয়ার নয়।

    সুরাতের যুবতী মুক্তি ভানসাদিয়া বলছেন, ‘বাবা–মা ছিল আমার সবকিছু।’ জীবনে প্রথম প্লেনে চড়েছিলেন মুক্তির বাবা–মা অর্জুন (৬৫) ও দিব্যা (৬০)। লন্ডনে বড় মেয়ের কাছে যাচ্ছিলেন। মুক্তির কথায়, ‘আমাদের মতো মিডল ক্লাসের পক্ষে ফ্লাইটে চড়াটা একটা বড় ব্যাপার। বাচ্চাদের মতো এক্সাইটেড ছিল বাবা–মা। আমি আবার বলেছিলাম, ফ্লাইটে টারবুল্যান্স হলে ভয় পাবে না।’

    মুক্তি বলছেন, ‘প্রথমে অন্য ফ্লাইটে বুক করেছিলাম। পরে আমেদাবাদ–লন্ডন ফ্লাইটের টিকিট করি। যাতে বাবা–মা ডিরেক্ট ফ্লাইটে যেতে পারে। ফ্লাইটে গুজরাতিতে কথা বলা লোকজন যাতে পায়। এয়ারপোর্টে পা ছোঁয়ার সময়ে বাবা পিঠ চাপড়ে দিয়েছিল।’ সেই টাচটা আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন অবিবাহিতা মুক্তি। ঘটনার পরে চাকরি ছেড়েছেন। কাউন্সেলিং করিয়েছেন দিনের পর দিন। বলছেন, ‘মাঝে মাঝেই বুকের মধ্যে দলা পাকিয়ে ওঠে কান্না।’

  • Link to this news (এই সময়)