ক্রাইম থ্রিলারের প্রতি টান, ‘ব্রাউন’-এর জন্ম, বাংলা ছবিতে পরিচালনার প্রস্তুতি এবং চিত্রনাট্য লেখার দর্শন— নানা বিষয় নিয়ে খোলামেলা আড্ডায় চিত্রনাট্যকার ও লেখক ময়ূখ ঘোষ।
অন্য সময় প্রাইম: ক্রাইম থ্রিলার ঘরানার প্রতি বারবার ফিরে আসেন কেন?
ময়ূখ: ‘ক্রাইম’ শব্দটা শুনলেই আমাদের মনে হয়, এটা আমাদের জীবন থেকে অনেক দূরের কোনও বিষয়। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। অপরাধ সংক্রান্ত নথি, চার্জশিট বা মামলার বিবরণ পড়লে বোঝা যায়, অপরাধ করার কারণ প্রায় প্রত্যেক মানুষের জীবনেই কোনও না কোনও ভাবে উপস্থিত। সবাই অপরাধী হয়ে ওঠেন না, এটাই পার্থক্য। আমার কাছে ক্রাইম থ্রিলার শুধু অপরাধের গল্প নয়। এটা সমাজতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক এবং মানব আচরণের গভীর অনুসন্ধানের একটি মাধ্যম। ‘ব্রাউন’-এ যেমন কলকাতার বিভিন্ন সম্প্রদায় এবং শহরটিকে ঘিরে এক ধরনের নৃতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ রয়েছে। আবার ‘হোস্টেজেস’ ছিল মানব আচরণের অনুসন্ধান। দর্শক যখন একটি ক্রাইম থ্রিলার দেখেন, তখন তিনি একইসঙ্গে তদন্তকারী এবং সম্ভাব্য অপরাধীর জায়গায় নিজেকে কল্পনা করেন। সেই দ্বৈত অবস্থান থেকেই তৈরি হয় রোমাঞ্চ।
অন্য সময় প্রাইম: বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের অভিজ্ঞতা বা পরিকল্পনা নিয়ে কী বলবেন?
ময়ূখ: আমার পড়াশোনা পুনের সিম্বায়োসিসে। তারপর স্বাভাবিক ভাবেই কাজের জগতে প্রবেশ করি মুম্বইয়ে। আমার পেশাগত যোগাযোগ, বন্ধু-বান্ধব এবং কাজের ক্ষেত্র সেখানেই তৈরি হয়েছে। তবে বাংলায় কাজ করার ইচ্ছা কখনও ছিল না, এমন নয়। একটা সময়ে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কিছু সংগঠনে সদস্যপদ পাওয়া খুব কঠিন ছিল। সেই প্রক্রিয়াও পরিষ্কার ছিল না। ফলে কাজ করতে চাইলেও কিছু বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে এখন একটি নতুন সুযোগ এসেছে। আমি আমার প্রথম বাংলা ছবি ‘মোকোভা’ পরিচালনা করতে চলেছি। এই ছবিটিই হবে আমার পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ।
অন্য সময় প্রাইম: লেখক হিসেবে আপনার যাত্রা কী ভাবে শুরু?
ময়ূখ: সত্যি বলতে, আমি কখনও লেখক হওয়ার পরিকল্পনা করিনি। আমার আগ্রহ ছিল পরিচালনা এবং সম্পাদনায়। পড়াশোনার সময়ে একটি ইন্টার্নশিপের সুযোগ পাই ‘পাতাল লোক’-এর রাইটার্স রুমে। সেখানে সুদীপ শর্মার তত্ত্বাবধানে কাজ করতে গিয়ে লেখালিখির প্রতি আগ্রহ জন্মায়। এরপর ‘হোস্টেজেস’-এর সুযোগ আসে। তখন ভারতে রাইটার্স রুম সংস্কৃতি ধীরে-ধীরে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। সিনিয়র ও জুনিয়র লেখকদের একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। সেই পরিবেশে কাজ করেই দ্রুত নিজেকে গড়ে তুলতে পেরেছি। এখন আবার পরিচালনার মূল স্বপ্নের দিকে ফিরে যেতে চাই, কারণ লেখালিখি, সম্পাদনা এবং পরিচালনা— তিনটি ক্ষেত্রেই কাজের অভিজ্ঞতা হয়েছে।
অন্য সময় প্রাইম: বর্তমানে কী-কী প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন?
ময়ূখ: এই মুহূর্তে ‘সামার অফ সেভেন্টি সিক্স’ নামে একটি সিরিজ়ের কাজ করছি। এর স্রষ্টা সুধীর মিশ্র। সিরিজ়টি এ বছরই মুক্তি পাওয়ার কথা। পাশাপাশি ‘মোকোভা’-র কাজও এগোচ্ছে। ছবিটি ডেভেলপমেন্ট পর্যায়ে রয়েছে। একজন বলিউড অভিনেত্রীর সঙ্গে তাঁর বাংলা ছবিতে প্রত্যাবর্তন নিয়ে কথাবার্তাও চলছে।
অন্য সময় প্রাইম: কোন নির্মাতা বা লেখক আপনাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন?
ময়ূখ: একজনের নাম বলা কঠিন। সাম্প্রতিক সময়ে চিনা নির্মাতা জিয়া ঝাংকের কাজ আমাকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছে। লেখকদের মধ্যে ক্যালি খৌরির কাজ আমার খুব প্রিয়। তাঁর ‘থেলমা অ্যান্ড লুই’ আমার মতে অন্যতম সেরা চিত্রনাট্য। আর বাঙালি নির্মাতাদের মধ্যে তপন সিনহা আমার কাছে অনুপ্রেরণা। ওঁর প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও বিষয় নির্বাচনের বৈচিত্র এখনও অতুলনীয়।
অন্য সময় প্রাইম: নতুন প্রজন্মের চিত্রনাট্যকারদের জন্য পরামর্শ কী?
ময়ূখ: প্রথমেই বুঝতে হবে, সাহিত্য আর স্ক্রিনরাইটিং এক নয়। চিত্রনাট্য কারিগরি নথি, যা একটি টিমকে কাজের নির্দেশনা দেয়। তাই স্ক্রিনরাইটিং শেখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিটিং শেখা। ছবি ও শব্দ কখন একসঙ্গে, কখন আলাদা ভাবে কাজ করে এবং কী ভাবে নতুন অর্থ তৈরি করে— সেটা সম্পাদনার মাধ্যমেই ভালো বোঝা যায়। এই ভাষাটা একবার রপ্ত করতে পারলে চিত্রনাট্য লেখা অনেক সহজ হয়ে যায়।