20 হাজার শ্রমিকের রুটিরুজিতে টান, বন্ধ চটকল খুলতে ময়দানে শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিং
eTV Bharat | ১২ জুন ২০২৬
কলকাতা, 11 জুন: দায়িত্বভার গ্রহণ করার পরেই রাজ্যের রুগ্ন ও বন্ধ চটকলগুলির ভবিষ্যৎ ফেরাতে কোমর বেঁধে ময়দানে নামলেন রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিং। রাজ্যের প্রায় 10টি বন্ধ চটকলের দরজা নতুন করে খুলে দেওয়া এবং তার জেরে কর্মহীন হয়ে পড়া 20 হাজারেরও বেশি শ্রমিকের মুখে অন্ন তুলে দেওয়াই এখন তাঁর প্রধান লক্ষ্য। বুধবারই শ্রম দফতরের দায়িত্বভার বুঝে নিয়েছেন তিনি। আর তার পরদিনই, বৃহস্পতিবার দফতরের পদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন মন্ত্রী। সেখানে রাজ্যের চটকলগুলির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন এবং আধিকারিকদের কাছ থেকে বর্তমান পরিস্থিতির খতিয়ান শোনেন।
জট কাটাতে আগামী 15 জুন চটকল মালিক, শ্রমিক সংগঠন-সহ সমস্ত পক্ষকে নিয়ে একটি জরুরি বৈঠক ডেকেছেন তিনি। মূলত সেই বৈঠকেই হাওড়া, হুগলি এবং উত্তর 24 পরগনা জেলায় ছড়িয়ে থাকা এই বন্ধ চটকলগুলি পুনরায় চালু করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ বা রূপরেখা তৈরি করা হবে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, অর্জুন সিং নিজে উত্তর 24 পরগনার চটকল বলয়েরই ভূমিপুত্র, ফলে এই শিল্পের অন্দরের সমস্যা এবং শ্রমিকদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ তিনি অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেছেন।
শ্রম দফতর সূত্রে খবর, বর্তমানে উত্তর 24 পরগনা, হুগলি এবং হাওড়া জেলার বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী চটকল বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। বন্ধ মিলগুলির তালিকায় রয়েছে উত্তর 24 পরগনার জগদ্দল জুট মিল, এম্পায়ার জুট মিল, প্রবর্তক জুট মিল এবং অ্যালায়েন্স জুট মিলের মতো নাম। একই অবস্থা হুগলি জেলার ইন্ডিয়া জুট মিল ও ওয়েলিংটন জুট মিলের। হাওড়া জেলার মহাদেব জুট মিল এবং খোদ হাওড়া জুট মিলেও বর্তমানে ঝুলছে তালা। এই দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে কীভাবে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়েই এখন দপ্তরের অন্দরে জোর তৎপরতা শুরু হয়েছে।
কিন্তু হঠাৎ কেন এই সংকট তৈরি হল ?
শ্রম দফতরের এক পদস্থ আধিকারিক এই পরিস্থিতির জন্য পরোক্ষে মালিকপক্ষের একাংশ ও ব্যবস্থাপনার ক্রুটিকে দায়ী করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, 2024 সালে রাজ্য সরকার, চটকল মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক সংগঠনগুলির মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যার মূল লক্ষ্যই ছিল চটশিল্পে স্থায়িত্ব আনা, উৎপাদন বজায় রাখা এবং শ্রমিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেই চুক্তির বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর শর্তই আজ পর্যন্ত খাতায়-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গিয়েছে, বাস্তবে তার কোনও প্রয়োগই হয়নি বলে অভিযোগ।
পাশাপাশি, কাঁচা পাটের বাজারে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে এক কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। সম্প্রতি জুট কমিশনারের দফতরের তরফে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় চালানো ম্যারাথন অভিযানে বিপুল পরিমাণ কাঁচা পাট অবৈধভাবে মজুত করে রাখার প্রমাণ মিলেছে। অর্থাৎ, কালোবাজারি এবং ফাটকাবাজির জেরেই বাজারে কাঁচা পাটের এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন মিলগুলি চড়া দামের কারণে কাঁচামাল পাচ্ছে না, অন্যদিকে বাজারে ন্যায্য মূল্য না পেয়ে পাট চাষিরাও হতাশ হয়ে বিকল্প চাষের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছেন, যা সামগ্রিকভাবে এই শিল্পের ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের পথ ঠিক কী ?
শ্রম দফতরের ওই আধিকারিকের মতে, এই মুহূর্তে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “রাজ্যের চটশিল্পের এই সংকট কাটাতে জুট কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া বা জেসিআই-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেসিআই যদি সরাসরি চাষিদের থেকে বড় আকারে ও সরাসরি কাঁচা পাট সংগ্রহ করে, তবে চাষিরা যেমন ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবেন, তেমনই বাজারে পাটের কালোবাজারি ও বেআইনি মজুতদারিও সম্পূর্ণ বন্ধ হবে। এর ফলে মিলগুলিও বছরভর নিরবচ্ছিন্নভাবে কাঁচামাল পাবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “জেসিআই যদি সক্রিয় ভূমিকা পালন না করে, তবে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান অসম্ভব। কেন্দ্রে নতুন বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর, এবার রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে চটকল মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলিকে সঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রীয় বস্ত্র ও বাণিজ্য মন্ত্রকের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু করা হবে, যাতে দ্রুত কাঁচা পাটের জোগান স্বাভাবিক করা যায়।” এখন দেখার, আগামী 15 জুনের মেগা বৈঠকের পর রাজ্যের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা হাজার হাজার শ্রমিকের ভাগ্য ফেরাতে নতুন শ্রমমন্ত্রী কতটা ম্যাজিক দেখাতে পারেন।