পরিষদীয় দলের পরে তৃণমূলের সংসদীয় দলও কার্যত ভেঙেই গিয়েছে। লোকসভায় বেশ কয়েক জন সাংসদ মিলে আলাদা ব্লক তৈরির কথা বলেছেন। তা নিয়ে জোড়াফুল শিবিরের অন্দরে টানাপড়েনের মধ্যে এ বার মুখ খুললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের সৈনিক অনুব্রত মণ্ডল ওরফে কেষ্ট। জানিয়ে দিলেন, তৃণমূলে যে ‘বিদ্রোহ’ দেখা গিয়েছে, তার মধ্যে অন্যায় কিছু দেখছেন না তিনি। কেষ্টর কথায়, ‘অন্যায় তো করেনি কেউ। খারাপ কাজ তো করেনি কিছু৷ তাঁরা (বিদ্রোহীরা) বিজেপি করেননি। তাঁরা আলাদা একটা ফ্রন্ট তৈরি করেছেন।’ অতীতে কংগ্রেসকে চটানো উচিত হয়নি বলেও মন্তব্য করেছেন অনুব্রত।
অনুব্রতের এই মন্তব্যের পরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কি তিনিও নেত্রী মমতার থেকে দূরত্ব তৈরি করতে চাইছেন? কেষ্ট অবশ্য সে কথা খোলসা করেননি। শুধু বলেছেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য প্রচণ্ড খারাপ লাগছে। ভদ্রমহিলাকে দেখলে কষ্ট হচ্ছে। শুধু আমি কেন, যত জন বিধায়ক-সাংসদ বেরিয়ে গিয়েছেন, তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করলেও একই কথা বলবেন। তাঁরা বলবেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য আমরা আছি।’
দলের অন্দরে ডামাডোলের মধ্যে দিল্লি গিয়েছিলেন মমতা এবং দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ শিবিরের বৈঠকে থাকার পাশাপাশি, আলাদা করে কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন মমতা। আলাদা করে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন অভিষেকও। তখন থেকেই রাজ্য রাজনীতি তো বটেই, জাতীয় রাজনীতিতেও জল্পনা তৈরি হয়, কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যেতে পারে তৃণমূল। যদিও কংগ্রেস হাইকম্যান্ড বলেছে, এই দাবি সত্যি নয়। তা নিয়ে অনুব্রত বলেন, ‘সেটা আমি শুনিনি। তাই সেটা নিয়ে আমি কোনও মন্তব্য করব না। আমরা তো সবাই একসঙ্গে কংগ্রেসেই ছিলাম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো কংগ্রেসে ছিলেন। সিপিএমের সঙ্গে কংগ্রেস যদি জোট না বাঁধত, আজ কংগ্রেস কোন জায়গায় পৌঁছে যেত!’
এ বারের বিধানসভা ভোটে দলের খারাপ ফলের জন্য আইপ্যাক-কেই দায়ী করেছেন অনুব্রত। তাঁর অভিযোগ, ভোটকুশলী সংস্থা ‘টাকা খাওয়ার’ জন্য এসেছিল। আইপ্যাকের বিরুদ্ধে তথ্য পাচারেরও অভিযোগ তুলেছেন অনুব্রত। বলেছেন, ‘৯৮ সালে যখন দল তৈরি হলো, সেই সময়ে অটল বিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী। তখন আমরা সাতটা আসন পেলাম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী হলেন। দলে একটা সুন্দর ভাব এল। তখন আইপ্যাক ছিল না। কেউ ছিল না। কোনও জ্ঞানী-গুণী ছিল না। আমাদের মতো রাখালবাখাল, মুকুল রায়, গৌতম বসু, বালু, পঙ্কজদা, মদন মিত্র— এরাই ছিল। আমরাই ছিলাম তখন দলের প্রধান। আইপ্যাককে আমাদের দরকার হয়নি। ২০০৯ সালে তৃণমূলের প্রতীক নিয়েই শতাব্দী রায়কে জিতিয়েছিলাম। তখনও আইপ্যাক ছিল না। ২০১১ সালে যখন দল ক্ষমতায় আসে, তখনও আইপ্যাক ছিল না। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে সরকারে এসেছিলাম। কংগ্রেসকে চটানোটাও আমাদের ভুল হয়েছে। কিন্তু কে কার কথা শোনে!’
এ বারের ভোটে তিনি নিজেও নিষ্ক্রিয় ছিলেন বলে জানান অনুব্রত। তাঁর কথায়, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ দিকে কার পাল্লায় পড়লেন, আমি বুঝতে পারলাম না। এ বারে যেমন আমাকে ভোটের দায়িত্ব দেননি। কোর কমিটির মিটিংয়ে বলেছে, কোনও বিধায়ক ডাকলে আপনি যাবেন। তাই আগ বাড়িয়ে আমার ভোট করতে যাওয়ার দরকার কী আছে! তাই এ বারে আমি সেই রকম ভোট করিনি।’
শুধু ভোটের সময়ে নয়, জামিনে জেলমুক্তির পর থেকেই তিনি যে রাজনীতি থেকে দূরে, তা-ও জানিয়েছেন কেষ্ট। বলেছেন, ‘জেল থেকে আসার পরে তো রাজনীতি করা বন্ধ করে দিয়েছি। দিদিও জানে, সবাই জানে রাজনীতি করা বন্ধ করে দিয়েছি। তখন তো অন্য জনের হাতে ঘি খেয়েছে। আমার হাতে ঘি খায়নি তো। আমার কোনও ভূমিকাই ছিল না নির্বাচনে। ওই দিদি যতবার এসেছে গিয়েছি, অভিষেক যতবার এসেছে গিয়েছি।’
তিনি কি এখন তৃণমূলের সঙ্গে রয়েছেন? জবাবে কেষ্ট জানান, তিনি এখন তৃণমূলেই রয়েছেন। তবে ভবিষ্যতের কথা স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। শুধু বলেছেন, ‘সম্মান পেলে দল করব, সম্মান না-পেলে দল করব না।’