• সরকার বদলাতেই উধাও ১৫ বছরের ‘তেরঙ্গা ব্যাজ’ কালচার, পালাবদলের পরে ‘ক্লিন’ তৃণমূল নেতাদের গাড়ির ড্যাশবোর্ড
    এই সময় | ১২ জুন ২০২৬
  • চার চাকা গাড়ির ড্যাশবোর্ডে সারি সারি ‘তেরঙ্গা ব্যাজ’। সঙ্গে জোড়া ফুল ছাপ। আর গাড়িতে সেই ব্যাজ থাকলেই ‘সাত খুন মাফ’। সেই গাড়ি দেখলে ‘টাচ’ করার সাহস দেখাত না পুলিশ, অভিযোগ এমনটাই। চলতি বছরের ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের আগে পর্যন্ত এটাই ছিল চেনা চিত্র। কলকাতার পাশাপাশি রাজ্যের অধিকাংশ জেলায় ‘তেরঙ্গা ব্যাজ’ গাড়ির ড্যাশবোর্ডে রেখে তৃণমূলের ছোট-বড়-মাঝারি মাপের নেতারা বুক ফুলিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন—শহর, শহরতলি, জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এ হেন অভিযোগ অহরহ এলেও কার্যক্ষেত্রে কোনও ‘পরিবর্তন’ দেখা যায়নি। রাজ্যে পালাবদল হতেই গাড়ি থেকে রাতারাতি সেই ‘তেরঙ্গা ব্যাজ’ উধাও।

    বামফ্রন্টকে হারিয়ে ২০১১ সালে তৃণমূল প্রথমবার রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছিল। ক্ষমতায় আসার পরে গাড়ির ড্যাশবোর্ডে ‘তেরঙ্গা ব্যাজ’ রাখার চল শুরু হয়। সময় যত গড়িয়েছে গাড়িতে ব্যাজ রাখার চল পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। গত ১৫ বছর ধরে রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল তৃণমূল। এই সময়কালে রাজ্য সড়ক কিংবা জাতীয় সড়ক, যে কোনও রাস্তায় গাড়ির ড্যাশবোর্ডে এই ‘তেরঙ্গা ব্যাজ’ থাকলেই বাধা না হয়ে অনায়াসে চলাচল করা যেত। পুলিশের ঝক্কি পোহাতে হতো না।

    তৃণমূলের ব্যারাকপুর মহকুমার ভাটপাড়া শহরের সভাপতি দেবজ্যোতি ঘোষ বলেন, ‘তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পরে গাড়িতে তেরঙ্গা ব্যাজ রাখার চল শুরু হয়েছিল। তবে, পুলিশ কেন ব্যবস্থা নিত না, তা জানি না। তবে দলের পক্ষ থেকে কোনওদিনই পুলিশ বা প্রশাসনের কাছে কোনও নির্দেশ দেওয়া ছিল না। সবটাই ছিল অলিখিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘তেরঙ্গা ব্যাজ গাড়িতে থাকলে পুলিশ সেই গাড়ি আটকানোর সাহস দেখাত না। শুধু দলের নেতারা নন, সাধারণ মানুষও এই সুযোগ নিতেন। দোকান থেকে ব্যাজ কিনে গাড়ির ভিতরে রাখতেন। বিজেপির আমলেও গেরুয়া কাপড় রাখার ট্রেন্ড শুরু হয়েছে।’ অন্য দিকে, বাঁকুড়া জেলা পরিষদের পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ অর্চিতা বিদ জানান, ‘বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যাজ পরিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হতো, গাড়ির ড্যাশ বোর্ডে তা রেখে দিতাম। পুলিশ তাদের কাজ করত, আমরা পুলিশের কাছে কোনও সুবিধা নিইনি।’

    বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাজ্য জুড়ে দুর্নীতির অভিযোগ এনে তৃণমূল নেতাদের গ্রেপ্তার করা শুরু হয়েছে। তৃণমূলে নেতাদের দেখলেই ‘চোর চোর’ স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। ছোড়া হচ্ছে ডিম। কয়েকদিন আগেই তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে ‘চোর চোর’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে। ৯ মে কৃষ্ণনগরের বাড়িতে ঢুকে প্রাক্তন মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাসকে ডিম ছুড়ে মারা হয়েছে। এই আবহে গাড়িতে আর তেরঙ্গা ব্যাজ লাগানো গাড়ি আর চোখে পড়ছে না। মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের বাসিন্দা স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, ‘গত ১৫ বছরে বহু গাড়িতে ‘তেরঙ্গা ব্যাজ’ রাখা বহু গাড়ি আমাদের নজরে পড়েছে। তবে, এখন রাজ্যে সরকার বদল হতেই আর কোনও গাড়িতে ‘তেরঙ্গা ব্যাজ’ চোখে পড়ছে না।’

    বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য সুনীল রুদ্র মণ্ডল জানান, ‘পুলিশ প্রশাসন ও নিজেদের প্রভাব দেখানোর জন্য এটা তৃণমূলের কালচার ছিল। ড্যাশবোর্ডে ব্যাজ রেখে নিজেদের ক্ষমতার জাহির করত। সমাজের বুকে ক্ষমতা জাহির করার কোনও উদ্দেশ্য আমাদের কোনও ভাবেই নেই। ড্যাশ বোর্ডে ব্যাজ রেখে ক্ষমতা জাহির করার সংস্কৃতি বিজেপির মধ্যে নেই।’ বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য অরূপ দাসের কথায়, ‘তৃণমূল জমানায় তেরঙ্গা ব্যাজ কালচার ছিল। পুলিশের ভয়ে কিছু বলার সাহস ছিল না। যাঁরা ব্যাজ গাড়িতে লাগিয়ে ঘুরতেন, তাঁরা সবথেকে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত। ইতিমধ্যেই তা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে। এখন তো গাড়িতে ব্যাজ লাগানো দূরের কথা, তৃণমূল নেতারা বাড়ি থেকে বের হওয়ার সাহস পর্যন্ত দেখাচ্ছেন না। আর গাড়িতে ব্যাজ রাখার এই কলঙ্কিত সংস্কৃতি বিজেপি কখন গ্রহণ করবে না।’

    একাধিক জেলা পুলিশের কর্তারা মানছেন, এ ভাবে একটা মানসিক চাপ তৈরির চেষ্টা যে চলে তা অস্বীকার করা যায় না। শুধু রাজনৈতিক নেতারা নন, অনেক সমাজকর্মী, মানবাধিকার কর্মীর মধ্যেও এই প্রবণতা দেখা গিয়েছে। এক কর্তা বলেন, ‘পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বা ডিএসপি র‍্যাঙ্কের অফিসারদের মধ্যে এই বিষয়গুলি খুব বেশি প্রভাব না ফেললেও রাস্তায় ডিউটিতে থাকা অনেক SI বা ASI-দের একটা অংশ খানিক চাপে তো পড়তেন।’ তবে জোর গলাতেই তাঁদের দাবি, নিরাপত্তা ও আইন শৃঙ্খলা ঠিকঠাক রাখতে এসব ‘চমকানোর’ ঊর্ধ্বে উঠেই সকলে কাজ করেন। তবে অনেকেরই দাবি, এই প্রবণতা তৃণমূল আমলের আগেও চলেছে।

  • Link to this news (এই সময়)