চেন্নাইয়ের ২৫ বছরের গৃহবধূ, নাগিরেড্ডি শ্রীরামচন্দ্র। ঘণ্টায় ২৫০ টাকা রোজগার করেন তিনি। এর জন্য তাঁকে অবশ্য বাড়ির বাইরে বের হতে হয় না। অতিরিক্ত কোনও কাজও করতে হয় না। কখনও তিনি বাড়ির লোকের জন্য আম কাটেন, কখনও রান্নাঘরে রান্না করেন। মানে আর পাঁচজন গৃহবধূ যে সমস্ত গৃহস্থালির কাজ করে থাকেন আর কি। তবে বাকিদের থেকে তাঁর একটাই পার্থক্য, এই সব কাজ করার সময়ে তাঁর মাথায় বা কপালে বাঁধা থাকে একটি স্মার্টফোন বা অ্যাকশন ক্যামেরা। তাতে অবশ্য কোনও অসুবিধা বোধ করেন না নাগিরেড্ডি। সংবাদ সংস্থা AFP-কে তিনি বলেছেন, ‘শুধু ঘরের কাজ করার জন্য কে দেবে ঘণ্টায় ২৫০ টাকা?’
তিনি একা নন। বেঙ্গালুরুর সিলিকন ভ্যালির ফুটপাতে বসে মালা গাঁথেন ৫৫ বছরের পুন্নি। গত ১০ বছর ধরে একই জায়গায় একই কাজ করে চলেছেন। তবে সম্প্রতি নাগিরেড্ডির পথে হেঁটে তিনিও তাঁর রোজগার বাড়িয়ে নিয়েছেন।
পুন্নিকেও বাড়তি কিছু করতে হয় না। আগের মতো এখনও তিনি মালা-ফুল বিক্রি করেন, শুধু সব সময়ে কপালে বাঁধা তাকে স্মার্টফোন, অন করা থাকে ক্যামেরা। এক দু’জন নয়, ভারতে বহু গৃহবধূ, কারখানার শ্রমিক এখন এই ভাবে মোটা অঙ্কের অর্থ উপার্জন করছেন।
আপনিও চাইলেই এই ভাবে ঘণ্টায় ২৫০ টাকা বা তার বেশিও রোজগার করতে পারেন। তবে করবেন কি? প্রশ্নটা আসছে, কারণ আপাতদৃষ্টিতে একে সহজ আয়ের সুযোগ বলে মনে হলেও, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে এর আড়ালে রয়েছে এক ভয়ঙ্কর অন্ধকার। সেই বিষয়ে ঢোকার আগে জেনে নেওয়া যাক, কে তাদের টাকা দিচ্ছে? কেন দিচ্ছে?
সংবাদ সংস্থা AFP-র এক সাম্প্রতিক রিপোর্টে উঠে এসেছে এক অদ্ভুত সমান্তরাল পৃথিবীর গল্প। ‘অবজেক্টওয়েজ’ (Objectways)-এর মতো AI ডেটা সরবরাহকারী সংস্থাগুলি ভারতজুড়ে অসংগঠিত ভাবে হাজার হাজার কর্মী নিয়োগ করছে।
এই কর্মীরা স্মার্ট গ্লাস, হেড-মাউন্টেড ক্যামেরা, মোশন সেন্সর বা নিদেন পক্ষে হাতে থাকা স্মার্টফোনের ক্যামেরাই মাথায় লাগিয়ে লাগাতার নিজেদের হাতের কাজকর্ম রেকর্ড করছেন। একে বলা হয় ‘ইগো-সেন্ট্রিক ডেটা’ অর্থাৎ, ফার্স্ট পার্সন বা উত্তম পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে সংগৃহীত তথ্য।
সহজ কথায় বলতে গেলে, কৃত্রিম মেধা বা AI-কে এই সকল কাজ শেখানোর জন্যই এই সকল তথ্য লাগে। ChatGPT বা Gemini-র মতো AI চ্যাটবটগুলি ইন্টারনেট থেকে লেখা বা ছবি পড়েই অনেক কিছু শিখে নিতে পারে। কিন্তু AI চালিত কোনও রোবটকে যদি মানুষের মতো হাত-পা নাড়িয়ে, ছুরি দিয়ে নিখুঁত ভাবে আম কাটা বা জামাকাপড় ভাঁজ করার মতো বাস্তব পৃথিবীর কাজকর্ম করতে হয়, তবে সে সব শেখার জন্য দরকার মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে নেওয়া আসল ভিডিয়ো।
‘অবজেক্টওয়েজ’-এর মতো সংস্থাগুলি ভারতীয় শ্রমিকদের মাথায় ক্যামেরা বসিয়ে ঠিক এই বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিডিয়ো বা ‘ইগো-সেন্ট্রিক ডেটা’ সংগ্রহ করছে। যাতে, আমেরিকার বড় বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলির তৈরি হিউম্যানয়েড (মানুষের মতো) রোবটরা মানুষের পেশির সুক্ষ্ম নড়াচড়া ও কাজের ধরন নিখুঁত ভাবে নকল করতে শেখে। লক্ষ্য, ভবিষ্যতে বাস্তব পরিবেশের এই জটিল কাজগুলি মানুষের বদলে এই AI-চালিত হিউম্যানয়েড রোবটদের দিয়েই করানো।
এই কারণেই ঘণ্টায় ২৫০ টাকার বিনিময়ে প্রতিদিনের কাজকর্ম করার লাগাতার ভিডিয়ো রেকর্ড করানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এই ডেটা সংগ্রহকারী সংস্থাগুলি রীতিমতো স্টুডিও গড়ে সেখানে বিভিন্ন কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করছে।
‘অবজেক্টওয়েজ’-এর এই রকমই এক স্টুডিয়োয় একটি খাটের বিভিন্ন প্রান্তে বসে দিনে প্রায় ৯০ বার একই তোয়ালে ভাঁজ করার ৪ মিনিটের ভিডিয়ো রেকর্ড করেন ২১ বছরের ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েট রানী এন। পাশের ঘরে অন্য কেউ হয়তো একই ভাবে পেনসিল কাটার বা জলের বোতল সাজানোর ভিডিয়ো রেকর্ড করেন।
AFP-কে রানী জানিয়েছেন, তাঁদের কাজটা ‘অসহ্য’ নয়, তবে সারাক্ষণ মাথায় ক্যামেরা পরে থাকাটা একটু ‘অস্বস্তিকর’। বৈচিত্র্য আনার জন্য কয়েক হাজার ঘণ্টা শুটিংয়ের পরে স্টুডিয়োয় তৈরি কৃত্রিম ফ্ল্যাটের দেওয়ালের ওয়ালপেপার বদলে দেওয়া হয়।
হিউম্যানয়েড রোবটরা এই সমস্ত সূক্ষ্ম হাতের কাজ শিখে গেলে তাদের যাঁরা প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, তাঁদেরই চাকরি যাবে। অর্থাৎ, কালিদাসের মতো তাঁরা নিজেদের ডালই কেটে চলেছেন। অবজেক্টওয়েজ় সংস্থার CEO রবি শঙ্কর অবশ্য বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন।
আমেরিকার বাসিন্দা তামিলনাড়ুর এই ভূমিপুত্রের মতে, ‘কিছু কাজ রোবটদের হাতে চলে যাওয়াই ভালো, যাতে মানুষ আরও উন্নততর কাজ করার সুযোগ পায়।’ কিন্তু ভারতের বাস্তব পরিস্থিতি কি আদৌ এতটা সরল?
‘ইন্ডিয়া-এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬’-এর আগে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে এই বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল সরকারি থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ‘নীতি আয়োগ’ (NITI Aayog)। রিপোর্টে নীতি আয়োগ বলেছিল, AI-এর বিকাশে কাজ হারানোর যাবতীয় আলোচনাটা আবর্তিত হয় মূলত ‘হোয়াইট কলার’ বা প্রাতিষ্ঠানিক চাকুরিজীবীদের কেন্দ্র করেই।
কিন্তু ভারতের অর্থনীতির আসল মেরুদণ্ড হলো চর্মকার, গৃহকর্মী, দিনমজুরের মতো দেশের ৪৯ কোটি অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক। AI তাঁদের কাজ কী ভাবে গ্রাস করবে বা, তাঁদের কী সেবা দেবে, তা নিয়ে কোনও আলোচনাই নেই।
আমেরিকান বিনিয়োগ ব্যাঙ্ক, মর্গ্যান স্ট্যানলির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে প্রায় ১০০ কোটিরও বেশি হিউম্যানয়েড রোবট বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে কাজ করবে। আজকের এই সহজ উপার্জনের রাস্তার শেষে তাই গভীর অন্ধকার অপেক্ষা করছে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
নিবন্ধের শুরুতে যে বেঙ্গালুরুর ফুল বিক্রেতা পুন্নির কথা রয়েছে, তাঁর আশঙ্কা, ‘আমাদের পরের প্রজন্ম, যাদের হয়তো আমার মতো কাজই করে খেতে হতো— তারা খুব সমস্যায় পড়বে।’ অর্থাৎ, কালিদাসের সেই ডাল কাটার ট্র্যাজেডি যেন ক্রমশ একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ডিস্টোপিয়ান বাস্তব হয়ে উঠছে।