অনির্বাণ ঘোষ
কোলে দুধের শিশু নিয়ে সরকারি হাসপাতালে আর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কয়েক সপ্তাহ অন্তরই দৌড়েই যাচ্ছেন মায়েরা। লক্ষ্য, রোটা ভাইরাস টিকাকরণ। কিন্তু টিকা বাড়ন্ত। ফলে হতাশ হয়েই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে মায়েদের। কবে টিকা আসবে, তারও নিশ্চয়তা নেই।
সরকারি টিকাকরণ কর্মসূচিতে এই রোটা ভাইরাস ভ্যাকসিনের জোগান নিয়ে এহেন অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে স্বাস্থ্য মহলে। পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি একাধিক রাজ্যেও এই টিকার ঘাটতি রয়েছে। তার জেরে নির্ধারিত সময়ে অসংখ্য শিশুকে টিকা দেওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শিশুদের মধ্যে ভাইরাল ডায়রিয়াজনিত গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি ফের বাড়তে পারে।
পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের ডায়ারিয়ার মাত্র ২০% ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়ার প্রকোপ দেখা যায়। বাকি প্রায় ৮০% ক্ষেত্রেই ডায়ারিয়ার নেপথ্যে থাকে ভাইরাসের হামলা। আর ভাইরাল ডায়ারিয়ার মধ্যে প্রায় ৪০% ক্ষেত্রে দেখা যায় রোটা ভাইরাসের সংক্রমণ। এই সংক্রমণের ফলে বারবার পাতলা পায়খানা, বমি এবং দ্রুত শরীরে জলের ঘাটতি দেখা দেয়। গুরুতর ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি পর্যন্ত করতে হয়। চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুদের ডায়রিয়াজনিত মৃত্যুর পিছনে দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম বড় কারণ এই ভাইরাস। বস্তুত, ডায়ারিয়া নিয়ে শিশুদের হাসপাতালে ভর্তির নেপথ্যে প্রায় ৪৫% ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সংক্রমণটা রোটা ভাইরাসের।
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রতি বছর রোটা ভাইরাস সংক্রমণের জেরে প্রায় ১০ লক্ষ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। একসময়ে বছরে প্রায় ৮০ হাজার শিশু এই সংক্রমণের কারণে প্রাণ হারাতো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-র তথ্য আরও উদ্বেগজনক। তাদের হিসাব বলছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় এক লক্ষের কাছাকাছি শিশুমৃত্যুর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িয়ে ছিল রোটা ভাইরাস। কিন্তু এখন সেই ছবিটা বদলে গিয়েছে মূলত রোটা ভাইরাস টিকাকরণের কারণেই।
২০১৬ থেকে সরকারি ইউনিভার্সাল ইম্যুনাইজেশন প্রোগ্রামের আওতায় ধাপে ধাপে রোটা ভাইরাস টিকা চালু করে কেন্দ্র। বর্তমানে জাতীয় টিকাকরণ সূচি অনুযায়ী শিশুদের জীবনের প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই এই টিকার একাধিক ডোজ় দেওয়া হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাকরণ কর্মসূচি চালুর পর রোটা ভাইরাসজনিত হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। কিন্তু অভিযোগ, বর্তমানে এই টিকার আকালের পরিস্থিতিতে এমন অনেক শিশু এ রাজ্যে রয়েছে, যাদের বয়স চার-পাঁচ মাস হয়ে গেলেও রোটা ভাইরাস টিকার একটি ডোজ়ও পড়েনি।
স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিবারকল্যাণ শাখার এক অফিসার বলেন, ‘রোটা ভাইরাস ভ্যাকসিন নিয়ে এই রকম টানাটানির পরিস্থিতি চলছে অন্তত মাস ছয়েক ধরে। ওই টিকা প্রস্তুতকারী সংস্থাদের উৎপাদন কোনও কারণে ধাক্কা খাওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারও আমাদের রোটা ভাইরাস টিকা সরবরাহ করে উঠতে পারছে না। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার চিঠি লেখা হচ্ছে কেন্দ্রকে।’