এই সময়: সাবধানের মার নেই! তাই বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আসা শিল্পপতি–ব্যবসায়ীদের ঠিকুজি কুষ্ঠিও এখন বাংলার বিজেপি সরকারের আতশকাচের নীচে!
শিল্প–বাণিজ্যের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গকে দেশের প্রথম তিনটি রাজ্যের মধ্যে নিয়ে আসাই বিজেপির লক্ষ্য। তবে সেই লক্ষ্যপূরণের ক্ষেত্রে খুবই সাবধানে পা ফেলতে চাইছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যে বিনিয়োগে উৎসাহ দেখানো ব্যবসায়ীদের প্রোফাইলও তিনি কষ্টিপাথরে যাচাই করে নিতে চাইছেন, যাতে পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগের টোপ ঝুলিয়ে কোনও অসাধু ব্যবসায়ী নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে না পারেন। রাজ্যে বিনিয়োগের প্রস্তাবগুলি ঝাড়াইবাছাই করার জন্য শিল্পসচিব বন্দনা যাদবের নেতৃত্বে একটি টিম বানিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই টিমের কাজ হলো, বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করা সংস্থাগুলির নামে কোনও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা। মুখ্যমন্ত্রীর সাফ কথা, ‘বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত চলছে কি না, সেটা তো আমাকে সবার আগে জানতে হবে।’ তাঁর খোঁচা, ‘ইতিমধ্যে আমার কাছে বহু বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে। আমি বিগত সরকারের মতো মিথ্যাচার আর ফটোসেশন করতে চাই না।’
২০১১–তে বাংলায় তৃণমূল সরকার তৈরি হওয়ার পর সারদা, রোজ়ভ্যালির মতো বহু বেআইনি লগ্নিসংস্থার রমরমা দেখা গিয়েছিল। এ ছাড়া পূর্বতন সরকারের জমানায় যে বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন (বিজিবিএস) হয়েছে, সেখানে যতই শিল্প আনার ঢক্কানিনাদ হোক না কেন, বাস্তবে বাংলায় শিল্পের কোনও অগ্রগতি হয়নি বলে বারবার অভিযোগ করে এসেছে তখন বিরোধী আসনে থাকা বিজেপি। ক্ষমতায় এসে তারা জানিয়ে দিয়েছে, লোকদেখানো সমাবেশ বা ফটোসেশন নয়, বাস্তবে বাংলায় শিল্পায়নে আগ্রহী নতুন সরকার। তৃণমূল জমানায় বিজিবিএসে খাতায়কলমে কত বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছিল এবং কত শিল্প এসেছে— তার খতিয়ান ইতিমধ্যেই চেয়েছেন রাজ্যের নতুন শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়। বিজিবিএস আয়োজনে পূর্বতন সরকার কত খরচ করেছে, তারও বিস্তারিত খোঁজ নিচ্ছে বর্তমান সরকার।
৪ মে বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদলের পরেই নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য একসুরে বুঝিয়ে দিয়েছেন, রাজ্যের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করতে হলে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। আর কর্মসংস্থানের জন্য বাংলায় কলকারখানা গড়ে তুলতে হবে। রাজ্য সরকার এবং রাজ্যের বর্তমান শাসকদল বিজেপি যে বিনিয়োগকারীদের সব রকম সহযোগিতা করবে, সে বার্তাও গেরুয়া শিবিরের তরফে গত একমাসে বিভিন্ন মঞ্চ থেকে দেওয়া হয়েছে। বিজেপির দাবি, ইতিমধ্যেই দেশ–বিদেশের উদ্যোগপতিরা কড়া নাড়তে শুরু করেছেন রাজ্য সরকারের দরজায়। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে যাতে শিল্পপতি বা ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে অসাধু কোনও ব্যক্তি মাথা গলাতে না পারেন, সেটাই নিশ্চিত করতে চাইছেন মুখ্যমন্ত্রী।
কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকারের ১২ বছর পূর্তি উপলক্ষে শুক্রবার নিউ টাউনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে সাংবাদিক বৈঠক করেন শুভেন্দু। সেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেন, কী ভাবে বিকশিত ভারতের দিকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন নরেন্দ্র মোদী। সেই কর্মযজ্ঞে বাংলা কী ভাবে কেন্দ্রকে সঙ্গত করছে, তারও বিস্তারিত বর্ণনা দেন মুখ্যমন্ত্রী। আগামী ২২ জুন বাজেটে শিল্প সংক্রান্ত কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ সবাই দেখতে পাবেন বলেও এ দিন দাবি করছেন তিনি। সেই সূত্র ধরেই টাটার মতো শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিকে বাংলায় নিয়ে আসার বার্তা এ দিন তাঁকে দিতে দেখা গিয়েছে। তবে একইসঙ্গে শুভেন্দু বুঝিয়ে দিয়েছেন, বেশি তাড়াহুড়ো করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। এ দিন তিনি বলেন, ‘এত তাড়াহুড়ো আপনারা করবেন না। শুধু মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ছবি তুলতে ব্যবসায়ীরা আসছেন, নাকি প্রকৃতই কিছু করতে চাইছেন, সেটা আমরা দেখে নিতে চাইছি।’ তাঁর সংযোজন, ‘যাঁরা বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আসছেন, তাঁরা অতীতে কোনও ব্যাঙ্ক অথবা জমি জালিয়াতি করেছেন কি না, সেটাও তো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত চলছে কি না, কথাবার্তা শুরুর আগে সেটা দেখা আমার প্রাথমিক কাজ।’
অতীতে বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল সরকার রাজ্যে শিল্প গড়ার জন্য বিভিন্ন সংস্থাকে জমি দিয়েছিল। কিন্তু সেই জমি অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ। এ রকম ‘শিল্পের’ পুনরাবৃত্তি চাইছেন না শুভেন্দু। এ দিন তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘অনেকে পশ্চিমবঙ্গে জমি নিয়ে রেখেছেন। অথচ ইউনিট তৈরি করেনি। আবার নতুন করে রাজ্য সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে ওই জমিগুলি রক্ষা করতে চাইছেন কি না, সেটাও তো আমাকে জানতে হবে।’ শুভেন্দুর সংযোজন, ‘তাঁরা নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে আমার কাছে আসছেন, নাকি তাঁদের ডেস্টিনেশন বেঙ্গল, সেটা নিশ্চিত হওয়ার পরে আমি জমি দেবো।’
বিজিবিএসের মাধ্যমে তৃণমূল জমানায় আর্থিক দুর্নীতি হয়েছে বলেও এ দিন অভিযোগ করেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, ‘আমার কাছে তালিকা আছে বিজিবিএস করতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থাকে ৬৩৫ কোটি টাকা দিয়ে গিয়েছেন। এরও তদন্ত হবে। মামলা করব। ছাড়ব না।’