• ক্রীড়াক্ষেত্রে উত্থান মহিলাদের, তবুও পরিকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ ঝুলন-পৌলমীর
    এই সময় | ১৩ জুন ২০২৬
  • ক্রিকেট, ফুটবল অথবা অন্য কোনও স্পোর্টস। আপনি যেই খেলাই বেছে নিন না কেন সেখানে একটা ছবি কমন। তা হলো পুরুষদের থেকে মহিলাদের কম অংশগ্রহণ। বর্তমানে এই ব্যবধানটা কমলেও সমান হয়নি। সমস্ত খেলায় বাড়ছে মহিলাদের অংশগ্রহণ। আর এর নেপথ্যে রয়েছে ফেডারেশনের সদিচ্ছা এবং সাফল্য। এই বিষয় নিয়ে সম্প্রতি BBC ও কালেক্টিভ নিউজ়রুম একটি সার্ভে করে। যেখানে তুলে ধরা হয় ক্রীড়াক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিয়ে। ক্রিকেটে অংশগ্রহণকে ফোকাস করে সার্ভে করা হলেও এখান থেকে পুরো চিত্রটা পরিষ্কার হয়। আর এই বিষয় নিয়ে কথা বলতেই কলকাতা প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কিংবদন্তি ক্রিকেটার ঝুলন গোস্বামী, টেবিল টেনিসে ন্যাশনাল গেমসে পদকজয়ী পৌলমী ঘটক এবং লেখিকা দেবারতি মুখোপাধ্যায়।

    BBC-র ‘Attitude towards women's sports, sportswomen and women in India’ শীর্ষক সার্ভেটি প্রকাশ পায় গত মার্চ মাসে। সেটা নিয়ে আলোচনা সম্প্রতি হলো কলকাতায়। সেখানে যেমন ঝুলন গোস্বামী তুলে ধরলেন মহিলা ক্রিকেটের উত্থান, তেমনই পৌলমী ঘটক তুলে ধরলেন টেবল টেনিসের সাফল্যের কাহিনি।

    ভারতে মহিলা ক্রিকেটের উত্থান

    ভারতে গত কয়েক বছরে মহিলা ক্রিকেটের উন্নতি হয়েছে। এটা নিয়ে সরাসরি BCCI-কে কৃতিত্ব দেন ঝুলন। বলেন, ‘২০০৫-০৬ সালে যখন উইমেন্স ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া এবং বিসিসিআই মার্জ হয় সেখান থেকে গ্রোথটা শুরু হয়। আর এক্ষেত্রে সব ক্রেডিটটাই BCCI-এর প্রাপ্য।’ তিনি জানান, নতুন ক্রিকেটার তুলে আনতে গেলে সবার আগে দরকার ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করা। তাঁর কথায়, ‘কোনও মা-বাবা তাঁর মেয়েকে ক্রিকেট তখনই খেলাবেন যখন ভবিষ্যতের ব্যাপারে ছবিটা তাঁদের কাছের পরিষ্কার হবে। আর এটা করাতেই ক্রিকেটের উত্থান। ভালো মাঠে খেলা, ভালো মাঠে প্র্যাকটিস করা, ভালো আম্পায়াররা আসা। আর ট্রাভেলিং একটা অনেক বড়ো ইস্যু ছিল উইমেন্স ক্রিকেটে। সেখানে ছোট ছোট বাচ্চা বাচ্চা মেয়েরা তখন ফ্লাইটে ট্রাভেলিং করতে শুরু করল, ভালো হোটেলে থাকা, গেটিং ডেইলি অ্যালাউন্সেস, ম্যাচ ফিজ, যেগুলো কোনোদিনই আমরা উইমেন্স ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার সময় আমরা ভাবতে পারতাম না।’

    এই উত্থানের জন্য তিনি বেছে নেন ২০১৭ সালটাকে। ঝুলনের কথায়, ‘এই বছরটাই আইস ব্রেকার ছিল। সেই বিশ্বকাপের ফাইনালের যাওয়ার পর মহিলা ক্রিকেট নিয়ে ছবিটাই পুরো বদলে যায়। এর পর ২০২২-২৩ সালে উইমেন্স প্রিমিয়ার লিগ আসায় আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি মহিলা ক্রিকেটকে।’

    মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়লেও পরিকাঠামোর অভাব

    টেবিল টেনিসে আন্তর্জাতিক পদকজয়ী পৌলমী ঘটক কেরিয়ারের জন্য ধন্যবাদ দেন তাঁর মা-বাবাকে। বলেন, ‘আমার শুরুর জন্য আমি আমার পেরেন্টসকে ধন্যবাদ দিতে চাই।’ বর্তমানে ক্রিকেট বাইরে বাকি খেলায় মহিলাদের জন্য যেই পরিবেশ সেটা অনেকটা ভালো বলে বর্ণনা করেন তিনি। বলেন, ‘নিরাপত্তার ছবিটা অনেক ভালো। তবে তিনি পরিকাঠামো নিয়ে খুশি নন। বলেন, বাংলা এখনও এমন কিছু জায়গায় ঘরোয়া টুর্নামেন্ট হচ্ছে, সেখানে হয়তো ওয়াশরুম, রেস্টরুম ঠিকঠাক নেই। সেটা শুধু মেয়েদের জন্য নয়, সবার জন্যই বড় সমস্যা। আমি যদি এক ইঞ্চিও একটু পজিটিভ চেঞ্জ আনতে পারি, তাহলে জানব কিছু একটা করলাম।’

    তবে এই সমস্যাগুলোর পাশাপাশি তিনি দেশবাসীর মানসিকতায় বদলের প্রশংসা করেন। বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের দেশে যত অলিম্পিক মেডেলিস্ট আছে তার মধ্যে মহিলাদের পদকের সংখ্যা খুব বেশি। তাঁর পরামর্শ ছোটবেলা থেকে যদি মেয়েদের খেলায় আগ্রহ থাকে তা হলে সেটাকে সমর্থন করা উচিত মা-বাবাদের।’

    শুধু খেলায় নয়, সমস্যা সব ক্ষেত্রেই

    পৌলমী ঘটকের কথার রেশ ধরে লেখিকা দেবারতি মুখোপাধ্যায় জানান, তাঁর বাড়ির কাছে একটি ক্রিকেট কোচিং ক্যাম্প রয়েছে। সেখানে ছাত্রীর সংখ্যা বাড়লেও নেই যথাযথ শৌচাগার। পাশে সরকারি একটি শৌচাগার ব্যবহার করতে হয় ছাত্রীদের। তাঁর দাবি, এই ধরনের ছবি রাজ্যে আরও রয়েছে। এগুলো ঠিক করা গেলে ক্রীড়াক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণ হয়তো আরও বাড়বে। তবে তিনি শুধু খেলা নয়, সবক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেন। বলেন, ‘এটা কিন্তু শুধুমাত্র খেলার ক্ষেত্রে নয়, আমাদের সমাজের একদম প্রাথমিক স্তর থেকে যত বদল হয়েছে, আমরা একটা সমাজে ধরে নেওয়া হয়েছে যে ছেলেরা মানেই তারা লড়াই করবে, হাঁকাহাঁকি করবে, খেলাধুলা করবে, বাইরে বেরবে, মেয়েরা বাড়িতে থাকবে, রান্না করবে, ঘরদোর গোছাবে ইত্যাদি। শুধু খেলা নয়, সেটা ডাক্তারদের ক্ষেত্রেও এই জিনিসটা মানা হতো। যখন কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় ডাক্তার হচ্ছেন, তখন আমাদের এখানে নিউজপেপারে লেখা হচ্ছে যেই মহিলা ডাক্তার হয়ে রাতের রোগী দেখতে যান, সে বারবণিতা ছাড়া আর কী! ডাক্তারি হোক, স্বাধীনতা সংগ্রামী হোক, খেলা হোক, প্রত্যেকটা বিষয় ছেলেটা যতটা সহজে পেয়েছে মেয়েদের তার থেকে অন্তত দশগুণ বেশি কষ্ট করে অর্জন করতে হয়েছে।’
  • Link to this news (এই সময়)