ছিঃ ছিঃ এত্তা জঞ্জাল! চলার পথে রুমালে নাক-মুখ ঢেকে এমনটাই বলে আসছেন হাওড়া পুর এলাকার বাসিন্দারা। দুর্গন্ধে নাকাল হওয়ার সমস্যা তো রয়েছেই, জমে থাকা আবর্জনা থেকে দূষণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে বিভিন্ন ওয়ার্ডে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই দিন কাটছে হাওড়া পুরসভা এলাকার বাসিন্দাদের। সঙ্গে দোসর নিকাশি সমস্যাও। সাফাই কোন পথে? কবে জঞ্জালমুক্ত হবে পথঘাট, দূষণমুক্ত বাতাসে শ্বাস নেবে হাওরবাসী? দীর্ঘদিন পুরভোট না হওয়ায় রাজ্যে পালাবদলের পরে কলকাতার ‘যমজ শহর’-এর সংকট দূর করতে মাঠে নেমেছেন নবনির্বাচিত বিধায়করা।
সমস্যা নতুন নয়। সমস্যার শিকড় রয়েছে আরও গভীরে। হাওড়ায় অন্যান্য পুর এলাকার মতোই বাড়ি বাড়ি থেকে জঞ্জাল সংগ্রহ করা হয়। সেই জঞ্জাল জমতে থাকে ভ্যাটে। সেই ভ্যাট থেকে জঞ্জাল যায় ভাগাড়ে। স্থানীয়দের একাংশের মতে, ভ্যাট থেকে জঞ্জাল নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় খামতি রয়েছে। প্রতিটি ধাপে সময়মতো কাজ না হতে হতেই জটিলতা আরও বেড়েছে।
ফলত, ভ্যাটে স্তূপাকার হয়ে জমেছে আবর্জনা। সেই জঞ্জাল ভ্যাট থেকে উপচে পড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে রাস্তায়। সেই জঞ্জাল মাড়িয়েই যাতায়াত করতে হচ্ছিল সাধারণ মানুষকে। এই সমস্যা আরও কয়েকগুণ বেড়েছে হাওড়ার বেলগাছিয়ায় ভাগাড় এলাকায় ধস নামার পরে। এর পর থেকে হাওড়া শহরের সমস্ত জঞ্জাল কলকাতার ধাপা এবং বৈদ্যবাটি পুরসভার ডাম্পিং গ্রাউন্ডে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গত সরকারের আমলে জঞ্জাল সরানোর কাজ সরাসরি KMDA-র হাতে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কথা হয়েছিল।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু হাওড়া পুর এলাকাতেই রোজ প্রায় ৯১০ মেট্রিক টন জঞ্জাল উৎপন্ন হয়। তবে হাওড়া পুরসভার অধীনে আলাদা জঞ্জাল সাফাই বিভাগ থাকলেও তার অবস্থা অনেকটা ঢাল নেই, তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দারের মতো। এর পাশাপাশি পুরভোট না হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের নিয়মিত তদারকির কাজ বিশ বাঁও জলে। ফলে যন্ত্রণা শুধুই বেড়েছে।
১) হাওড়া পুরসভায় জঞ্জল বহনের জন্য ট্রাক্টর রয়েছে কমবেশি ১৩টি। এছা়ডা ৩৩টি নিজস্ব ট্রাক রয়েছে।
২) হাওড়া পুর এলাকায় আবর্জনা জমা করার জন্য ডিপো রয়েছে ১৬১৬টি, যা প্রয়োজনের তুলনায় নেহাতই কম।
৩) হাওড়ার চ্যাটার্জিহাট, কদমতলা, পঞ্চাননতলা, সালকিয়া, শিবপুর থেকে টিকিয়াপাড়া এলাকায় এই সমস্যা সবথেকে বেশি।
৪) নিকাশি সমস্যা মেটাতে হাওড়া পুর এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা খাটালগুলিকে চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
হাওড়া পুরসভার ৫০, ৪৯, ৬, ৭ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় সমস্যা সবথেকে বেশি। জলনিকাশি সমস্যাও রয়েছে এই ওয়ার্ডগুলিতে।
এর পাশাপাশি পুরসভার ২, ৩, ৫, ৩৯, ৪০ ও ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডেও স্যানিটেশন ও ড্রেনেজ-এর সমস্যা রয়েছে।
হাওড়ার ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বাবলু মাইতির বক্তব্য, ‘মূল সমস্যা হলো ভ্যাট থেকে সময়মতো জঞ্জাল না সরানো। অনেক ক্ষেত্রে অফিস টাইমে জঞ্জাল সরানো হয়, যার জন্য যাতায়াতেরও সমস্যা হয়। ফাঁকা সময়ে নিয়মমাফিক জঞ্জাল পরিষ্কার করলেই সমস্যা অনেকটা মিটে যায়।’ পাশের ওয়ার্ডের বাসিন্দা কমলকান্তি দাস, ওই এলাকার দীর্ঘদিনের বাসিন্দা। শেষ কয়েক বছরে এই সমস্যা আকাশ ছুঁয়েছে বলে দাবি তাঁর। কমলকান্তি বলেন, ‘জঞ্জাল নিয়মিত না নিয়ে গেলে রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। সেই আবর্জনা আবার ড্রেনে গিয়ে পড়ে। ফলে জলনিকাশি বন্ধ হয়ে যায়।’
পুরভোট হতে এখনও মাস পাঁচ-ছয়েকের অপেক্ষা। ততদিনে জঞ্জাল ও নিকাশি সমস্যা নিয়ে নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় বাসিন্দাদের। সেই কারণে পালাবদলের পরেই তড়িঘড়ি এই সমস্যা সমাধানে নেমেছেন নবনির্বাচিত বিধায়করা। গত সোমবার, ৮ জুন হাওড়া পুরভবনে নিকাশি ও সাফাই ব্যবস্থা নিয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। সেখানেই আপৎকালীন পরিস্থিতিতে এই সমস্যা দূরীকরণের জন্য বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
১) বর্তমানে বাড়ি বাড়ি থেকে সংগৃহীত বর্জ্য ট্রাইসাইকেল ও খোলা ভ্যানে বহন করা হয়। সেই ব্যবস্থার পরিবর্তে ধাপে ধাপে বদ্ধ বক্সযুক্ত সংগ্রহ ব্যবস্থা চালু করা হবে।
২) বিভিন্ন এলাকায় টিপার ভ্যান রাখা হবে, যেখানে হাউস-টু-হাউস সংগ্রহ করা ময়লা জমা হবে। পরে সেই বর্জ্য সরাসরি ডাম্পিং গ্রাউন্ডে নিয়ে যাওয়া হবে।
৩) আগামী দিনে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ‘মুভেবল কম্প্যাক্টর’ বসানো হবে। এলাকার সমস্ত বর্জ্য সেখানে ফেলার পরে যন্ত্রের মাধ্যমে তা সংকুচিত করা হবে। এর ফলে কম জায়গায় বেশি বর্জ্য রাখা সম্ভব হবে এবং দুর্গন্ধ ও দূষণও কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। কম্প্যাক্টর ভর্তি হয়ে গেলে সেটিকে সরাসরি ডাম্পিং গ্রাউন্ডে পাঠানো হবে।
৪) শহরের নালা-নর্দমা পরিষ্কার, রাস্তার ধারে খোলা ভ্যাট ব্যবস্থা তুলে দেওয়া এবং শুকনো-ভেজা বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
উত্তর হাওড়ার বিধায়ক ও রাজ্যের মন্ত্রী উমেশ রাই জানিয়েছেন, শহরের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে এবং রাস্তায় ময়লা জমে থাকার সমস্যা দূর করতে এ বার মুভেবল কম্প্যাক্টর কেনার পরিকল্পনা নিয়েছে পুর প্রশাসন। জঞ্জাল সংকটের আরও একটি বড় সমস্যা হলো, কঞ্জারভেন্সি ডিপার্টমেন্ট-এ কর্মীর অভাব। সেই কারণে সময়মতো বাড়ি বাড়ি গিয়ে জঞ্জাল সংগ্রহ বা ভ্যাট থেকে জঞ্জাল ডাম্পিং গ্রাউন্ডে পাঠানোর কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। বিধায়ক জানিয়েছেন, খুব দ্রুত এই বিভাগে কর্মী সংখ্যা বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
নতুন সরকারের কাজে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন প্রাক্তন বিধায়ক গৌতম চৌধুরীও। পুরসভায় অর্থ সংকটের কারণেই পালাবদলের আগে এই সমস্যা দূরীকরণে সম্যক কাজ করা যায়নি বলে দাবি তাঁর। গৌতমের কথায়, ‘রাস্তাঘাট, ড্রেনের কাজ আমরা শুরু করেছিলাম। তবে ফান্ডের জন্য অনেক জায়গায় আটকে যায়। এই সরকার ভ্যাটমুক্ত সরকার করার বার্তা দিয়েছে। আমরা সেই কাজে সবরকম সাহায্য করব।’
রিপোর্টিং: বৈদ্যনাথ ঝা