আজকাল ওয়েবডেস্ক: মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসে চলমান বিদ্রোহ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। সংবাদমাধ্যমে যখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের বৈঠকের ছবি প্রকাশ্যে আসে, তখন তৃণমূল সাংসদ কীর্তি আজাদ বিদ্রোহীদের 'বিশ্বাসঘাতক' আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেন যে, এই পুরো ঘটনার নেপথ্যে রয়েছেন ঝাড়খণ্ডের বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে। কীর্তির অভিযোগ, তৃণমূল সাংসদদের দলবদল করানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করছিলেন দুবে।
কিন্তু, এই সব আলোচনার মাঝে এমন একটি নাম উঠে এসেছে যা উপেক্ষা করা কঠিন। অন্ধ্রপ্রদেশের ৬১ বছর বয়সী বিজেপি সাংসদ সিএম রমেশ দাবি করেছেন যে, তৃণমূল সাংসদদের দলবদল করানোর ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। শুধু তাই নয়, সিএম রমেশ এও দাবি করেছেন যে, যেকোনও দলের সাংসদকেই মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দলবদল করানোর ক্ষমতা রয়েছে তাঁর।
তেলুগু-ভাষী সাংসদের দাবি, 'আমিই তৃণমূল ভেঙেছি'হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিএম রমেশ দাবি করেছেন যে- তৃণমূল কংগ্রেসের অধিকাংশ সাংসদকে তিনিই ফোন করেছিলেন। পেশায় ব্যবসায়ী সিএম রমেশ আরও জানিয়েছেন যে, এই পুরো অভিযানের দায়িত্বে ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব এবং পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। উল্লেখ্য, সিএম রমেশ ব্যক্তিগত কথাবার্তার ক্ষেত্রেও হিন্দি বা ইংরেজির চেয়ে তেলুগু ভাষায় কথা বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
সিএম রমেশ বলেছেন, "মানুষকে রাজি করানো বা প্রভাবিত করা আমার দক্ষতা। আমার মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় প্রয়োজন, তাতেই আমি যেকোনও ব্যক্তিকে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার জন্য রাজি করাতে পারি।" তিনি আরও বলেন, "তৃণমূল কংগ্রেসের অধিকাংশ সাংসদের সঙ্গেই আমার দীর্ঘদিনের পরিচয়। সংসদের ক্যান্টিনে তাঁদের সঙ্গে আমার নিয়মিত দেখা হয়। গত কয়েক বছরে তাঁদের সঙ্গে আমার এক বিশেষ সখ্যতা গড়ে উঠেছে। সেই সম্পর্কটি নিঃসন্দেহে মেকি নয়।"
রমেশ দাবি করেন, ২০২০ সালে যখন তাঁর ছেলের বিয়ে হয়, তখন তিনি দলের অবস্থানের বিরুদ্ধে ভিন্নমত পোষণকারী সাংসদদের দুবাই ও হায়দ্রাবাদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই বিয়েবাড়ির অনুষ্ঠানে শতাব্দী রায়ও উপস্থিত ছিলেন। বোলপুরের সাংসদ শতাব্দী রায় সেই সময় মমতা ব্যানার্জির অত্যন্ত অনুগত হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে বিদ্রোহী শিবিরে নাম লিখিয়েছেন।
‘চুক্তিতে অর্থের কোনও উল্লেখ ছিল না’বিজেপি সাংসদ সিএম রমেশ আরও জানিয়েছেন যে, তৃণমূলের সাংসদদের দল ভাঙানোর জন্য কোনও আর্থিক লেনদেন করা হয়নি। লোকসভার ১৯ জন এবং রাজ্যসভার ৩ জন তৃণমূল সাংসদের বিদ্রোহের বিষয়ে তিনি বলেন, তাঁদের কোনও টাকা দেওয়া হয়নি। তাঁদের কেবল দু'টি বিষয়ের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল:
কী সেই নিশ্চয়তা? প্রথমত, তৃণমূল সাংসদদের সংসদীয় এলাকার দেখভাল করা হবে। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার তাঁদের এলাকায় সর্বাধিক উন্নয়নমূলক কাজ করবে, যাতে ভোটাররা অসন্তুষ্ট না হন। এছাড়া, তৃণমূল থেকে নিজেদের আলাদা করার বিষয়ে একটি কাগজে স্বাক্ষর করতে হবে।
রমেশ ফের জোর দিয়ে বলেন যে, এই চুক্তিতে অর্থ বা কোনও পদের বিষয়ে কোনও উল্লেখ ছিল না। তিনি বলেন, বিদ্রোহী সাংসদদের নিয়ে তৃণমূলের অনুগতরা যেসব দাবি করছেন, তা সত্য নয়।
মহুয়া মৈত্র বিজেপি সাংসদের দাবিকে ‘আত্মম্ভরিতা’ বলেছেনতৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র অন্ধ্রপ্রদেশের বিজেপি সাংসদ সিএম রমেশের দাবিগুলোকে নিছক আস্ফালন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। মৈত্র বলেন, “রমেশ আমার বন্ধু এবং আমি তাঁকে খুব পছন্দ করি। তবে আমি বলব যে, তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক থাকতে পছন্দ করেন। আমাদের মতো কিছু মানুষ রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক কারণ তাঁরা সরাসরি মানুষের মাঝে বা তৃণমূল কাজ করেন। আবার কেউ কেউ প্রাসঙ্গিক কারণ তাঁদের ভাল নেটওয়ার্ক রয়েছে। রমেশ তাঁদেরই একজন।”
মহুয়া মৈত্র আরও বলেন, “সিএম রমেশ নিজের দল বিজেপির কাছে নিজের উপযোগিতা প্রমাণ করতে পছন্দ করেন।” তৃণমূল সাংসদ বিজেপি সাংসদের দাবিগুলোর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে একটি গল্পের আশ্রয় নেন। তিনি বলেন, “কল্পনা করুন একটি কেক তৈরি হচ্ছে। যেইমাত্র আমি সেটা জানতে পারি, তখনই মনে হয় - অন্তত একটা কিসমিস তো যোগ করা দরকার। একইভাবে, বর্তমানে বাংলার রাজনীতিতে একটি ‘কেক’ তৈরি হচ্ছে। রমেশ নিজে কেকটি তৈরি করছেন না বা তাঁর কাছে প্রয়োজনীয় উপকরণও নেই, কিন্তু হঠাৎ তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন - ‘আমার কাছে এক-দু'টি কিসমিস আছে যা আমি এই প্রক্রিয়ায় যোগ করতে চাই।’ আর এভাবেই তিনি এমন সব দাবি করে বসেছেন।”
সিএম রমেশ ২০১৯ সালে টিডিপি-তে ভাঙন ধরিয়েছিলেন২০১৯ সালেও রমেশ টিডিপির ক্ষেত্রে ঠিক এমন একটি দলত্যাগের ঘটনা ঘটিয়েছিলেন। মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতা হারানোর বিষয়টি যেমন টিডিপির সেই দলত্যাগের কারণ ছিল, তেমনই ২০১৯ সালে রমেশের তৎকালীন প্রধান চন্দ্রবাবু নাইডু জগন রেড্ডির কাছে ক্ষমতা হারিয়েছিলেন। সেই সময়, ঠিক আজকের মতোই- এক মাসের মধ্যে টিডিপির ছয়'জন সাংসদের মধ্যে চারজন দল ছেড়ে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দিয়েছিলেন।
রমেশ আরও বলেন যে, তৃণমূলের অন্য কয়েকজন সাংসদের মতোই কাকলি ঘোষ বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আগেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে ছিলেন। দলের অন্দরমহলের অনেকের কাছেই বিষয়টি অদ্ভুত ঠেকেছিল যে, দলত্যাগ-বিরোধী আইন প্রয়োগ করা বা সদনের অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোর পরিবর্তে দলের প্রধান চন্দ্রবাবু নাইডু নীরব থেকেছিলেন। অবশ্য, পরবর্তী নির্বাচন আসার আগেই তিনি বিজেপির জোটসঙ্গী হয়ে যাবেন।
সংবিধান ক্লাবের নির্বাচনেও সিএম রমেশকে সক্রিয় দেখা গিয়েছিলসম্প্রতি সিএম রমেশ সংবিধান ক্লাবের নির্বাচনেও উপস্থিত ছিলেন, যেখানে রাজীব প্রতাপ রুডি ও সঞ্জীব বালিয়ানের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল। শোনা যায়, সঞ্জীব বালিয়ানের প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সমর্থন ছিল। সেখানেই ঝাড়খণ্ডের বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবের সঙ্গে তাঁর প্রথম করমর্দন হয়। কীর্তি আজাদ আবারও অভিযোগ করছেন যে, টিএমসি সাংসদদের দলত্যাগের ঘটনায় দুবের ভূমিকা ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃণমূলের এক রাজ্যসভা সাংসদ বলেন, "আমরা জানি যে সেই সময় সিএম রমেশ দলের তিনজন সাংসদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন।" তিনি আরও বলেন, মমতার ঘনিষ্ঠ সায়নী ঘোষের মতো সাংসদদের সই করার জন্য তিনিই (সিএম রমেশ) যে রাজি করিয়েছিলেন, তা নিশ্চিত। তাঁদের অনেকেই রাজি হওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার ওপর জোর দিয়েছিলেন। ৮ জুন শতাব্দী রায়ের বাড়িতে আয়োজিত এক নৈশভোজে এই সাক্ষাৎটি হয়েছিল, ঠিক যে দিন দিল্লিতে 'ইন্ডিয়া' জোটের শরিক দলগুলোর বৈঠক চলছিল।