দলের আদি নেতাদের ক্ষোভের মুখে অভিষেক, কেন পদক্ষেপ করছেন না নেত্রী মমতা?
প্রতিদিন | ১৩ জুন ২০২৬
ভোটে হারার পর বিধায়ক দল থেকে সংসদীয় দল-অথবা কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর, একজনও নেই যারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর ক্ষুব্ধ। বরং সমস্ত রাগ, অভিমান, বিদ্রোহ একজনকেই কেন্দ্র করে তিনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। যে যার মতো করে উগরে দিচ্ছেন ক্ষোভ। অপমান, ক্যামাক স্ট্রিটের ফতোয়া, আইপ্যাকের যথেচ্ছার নিয়ে ফাঁস হচ্ছে নানা স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ। পরিস্থিতি এমনই হয়েছে, মমতার দীর্ঘদিনের সৈনিক যাঁরা তাঁরাও মুখ খুলেছেন অভিষেকের বিরুদ্ধে। কিন্তু তারপরেও কেন এখনও অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের মতো অভিষেককে আগলে রেখেছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী! কেন তাঁকে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক থেকে সরিয়ে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করলেন না তিনি। দল চুরমার হয়ে যাচ্ছে, তবু তিনি অভিষেক স্নেহে বিভোর!
বিষয়টি নিয়ে তৃণমূল শিবিরে যেমন ক্ষোভের আগুন, তেমনই রাজনৈতিক মহলও অবাক হয়ে দেখছে মমতা অভিষেক প্রশ্নে চুপ। বিদ্রোহটা শুরুতে ছিল এমন সব নেতাদের যাদের অধিকাংশই তৃণমূলে এসেছেন অনেক পরে। অর্থাৎ ক্ষমতার হাত ধরে। তাঁদের পক্ষে মমতার লড়াইয়ের অসহনীয় দিনগুলি অভিঘাত বোঝার কথা নয়। ফলে অনেকেই ক্ষমতা হারাতেই শাসকের দিকে ঢলে পড়ছেন। কিন্তু কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এমন একজন ব্যক্তি, যিনি তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্নের আগে থেকে মমতার সঙ্গী। এই দুর্দিনে তিনি মমতার হয়ে ব্যাট করছেন, শাসককে তুলোধনা করছেন। লড়ছেন ভোটপরবর্তী হামলায় আক্রান্ত কর্মীদের হয়ে। সেই কল্যাণবাবু যখন ক্ষোভ উগড়ে দেন, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না অভিষেক আসলে দলের মধ্যে কীভাবে ‘আনপপুলার’ হয়ে গিয়েছেন। কল্যাণ এও বলেছেন, তিনি সৎ জীবনযাপন করলেও ‘চোর চোর’ শুনতে হচ্ছে। শুধু কল্যাণ নয়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, অনুব্রত মণ্ডল, সুখেন্দু শেখর রায়ের মতো আদি তৃণমূল নেতাদের অনেকেই অভিষেকের উপর রুষ্ট। তাঁকে দলনেত্রীর আগলে রাখা নিয়ে হতাশ! অভিমানী কল্যাণবাবু শুক্রবার বাড়ি থেকে বের হননি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাঁকে ফোন করেননি। কল্যাণ সাফ বলেছিলেন, হয় অভিষেক, নয় তিনি। রক্তের সম্পর্ক, নয়তো একান্ত সৈনিক-কোনটা বেছে নেবেন মমতা। নিজের সেই দাবিতে কল্যাণ এদিনও অনড়। স্বাভাবিকভাবেই মমতার উপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। এই অবস্থায় কীভাবে সমাধান সূত্র বেরবে তা নিয়ে আগ্রহ তুঙ্গে। যদিও অভিষেক এদিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেছেন, “কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অধিকার আছে আমাকে দুটো কটু কথা বলার। উনি আমাকে ছোট থেকে মানুষ করেছেন, বড় হতে দেখেছেন। আমিও ওঁকে সম্মান করি। এখনও সম্মান করে যাব।” এর জবাবে কল্যাণবাবুকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “অভিষেক আমার সন্তানের মতো। ও যদি ভুল বুঝতে পারে, তাহলে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরব। দিদির সঙ্গে আছি। সামনে অনেক বড় লড়াই। অভিষেককে সেটা বুঝতে হবে।”
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি অভিষেক ছাড়া আগামী দিনে দলের ব্যাটন কাউকে দিতে চান না? আগামী দিনে তৃণমূলের নেতৃত্বের প্রধান মুখ হয়ে উঠবেন অভিষেক, তেমনই ভাবছেন দলনেত্রী? রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মত, একসময় তৃণমূল কংগ্রেসে নেতৃত্বের জন্য একাধিক মুখ উঠে আসছিল। তৃণমূল যুব ও যুবা কংগ্রেস তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীকাল যুব ও যুবা এক করে দেন নেত্রী। তৃণমূলের যুবর নেতা করা হয় অভিষেককে। তাই নিয়েও দলের অন্দরেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। রাজ্যে পালাবদলের পর তৃণমূল কংগ্রেসে একের পর এক নেতা দলত্যাগ করছেন। সেখানে কারা শেষপর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসে থাকবেন? সেই নিয়েও জোর চর্চা চলছে। সেই হিসেবেও কি মমতা অভিষেকের উপর ভরসা করছেন! সেজন্য কি অভিষেককে নিয়ে বিদ্রোহের মধ্যেও ‘চুপ’ নেত্রী?