৫ বছর ধরে ‘জমি সিন্ডিকেট’ বিএলএলআরও অফিসেই জমির রেকর্ড ও চরিত্র বদল সুজয়ের
বর্তমান | ১৪ জুন ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: সুজয় হাজরার জমি সিন্ডিকেট চলছে ২০২১ থেকে! শালবনী থানায় শেখ ইমরানের অভিযোগ এবং তার তদন্তে নেমে এই তথ্যই হাতে এসেছে পুলিশের। তারা জানিয়েছে, বহু ব্যক্তি জমি কিনতে গিয়ে প্রতারিত হয়েছেন। কিন্তু প্রাণভয়ে মুখ খোলেননি। পালাবদলের পর জমি কেনার জন্য অগ্রিম দিয়ে প্রতারিত হতেই অবশ্য ৫ জুন শালবনী থানায় অভিযোগ করেন শেখ ইমরান। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ছোটো আকারের জলের কারখানা খোলার জন্য জমি খুঁজছিলেন তিনি। জানতে পারেন ওই এলাকার বাসিন্দা সুব্রত বেরা ও দেবাশিস দে নামে দুই ব্যক্তি জাতীয় সড়কের ধারে জমি কেনাবেচার কাজ করেন। ওই দু’জনের সঙ্গে যোগযোগ করলে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় সুজয় হাজরার অফিসে। অভিযোগকারীর দাবি, একটি চুক্তিপত্র দেখিয়ে সুজয়বাবু বলেন, এই জমি তাঁর দখলে রয়েছে। কোনো চুক্তিপত্র ছাড়াই তিনি ইমরানের থেকে ১০ লক্ষ টাকা অগ্রিম হিসাবে নেন বলে অভিযোগ। তারপরও তিনি জমি পাননি। বিভিন্ন অজুহাতে শেখ ইমরানকে ঘোরানো হতে থাকে। শেষে টাকা ফেরত চাইলে সুজয়বাবু তাঁকে হুমকি দেন বলে অভিযোগ। ততক্ষণে জমি সার্চিং করে ইমরান জেনেছেন, এই জমি সরকারি। জাল দলিল তৈরি করে লক্ষ লক্ষ টাকায় বিক্রি করছেন সুজয়বাবুরা। তখনই শালবনী থানায় প্রতারণার অভিযোগ দায়ের হয়। সেখানে সুজয় হাজরা সহ ছ’জনের নাম আছে। জালিয়াতি, প্রতারণা, জাল নথি তৈরি, সরকারি জমি দখল সহ একাধিক ধারায় কেস রুজু করেছে শালবনী থানা।
তদন্তে নেমে বিএলএলআরও অফিসে যোগাযোগ করে পুলিশ। জমির যে দাগ নম্বরের কথা ইমরান উল্লেখ করেছিলেন, সেটাই ছিল লক্ষ্য। বিএলএলআরও অফিসও নথি দিয়ে জানায়, এই জমি সরকারের। অথচ এর রেকর্ড বদল করা হয়েছে। কার নামে তাহলে এই জমি? তদন্ত করে জানা যায়, ওই নামে কোনো ব্যক্তির অস্তিত্বই নেই। তখনই নতুন মোড় নেয় তদন্ত। ৬০ নম্বর জাতীয় সড়ক লাগোয়া সব জমির নথি যাচাই শুরু হয়। তাতে মাথায় হাত পড়ে প্রশাসনের। একের পর এক দাগ নম্বর ধরে জমির রেকর্ড বদলে ভুয়ো মালিকানায় নথিভুক্ত করা হয়েছে। সরকার যাঁদের থেজকে জমি কেনে, তাঁদের নামও বাদ দেওয়া হয়েছে রেকর্ড থেকে। অর্থাৎ জমির ‘হিস্ট্রি’ নেই। তদন্তকারী অফিসাররা নিশ্চিত হয়ে যান, গোটা জালিয়াতি কাণ্ডটাই ঘটেছে বিএলএলআরও অফিস থেকে। যিনি বিএলএলআরও থাকাকালীন এই ‘কেলেঙ্কারি’, তাঁকে সাসপেন্ড করে ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তর। ওই অফিসারকে জেরা করে জমি দুর্নীতির সিন্ডিকেট এবং সুজয় হাজরার ব্যাপারে নিশ্চিত হয় পুলিশ। জানা যায়, তিনিই বিএলএলআরও দপ্তরে বসে জমির পুরানো রেকর্ড সরিয়ে নতুন রেকর্ড তৈরি করেছেন। যে ব্যক্তির নামে মিউটেশন ছিল, তাঁর রেকর্ডও বদলে দেওয়া হয়েছে। সরকারি নথি গায়েব করে জমির নতুন পরচা তৈরি হয়েছে। জালিয়াতিতে ব্যবহার হয়েছে সরকারি দপ্তরের সিল, স্ট্যাম্প। অভিযোগ, এরপর ওই পরচা দেখিয়ে জাল দলিল তৈরি করেছেন সুজয়। সেখানেও সরকারি বিভিন্ন স্ট্যাম্প, পদাধিকারীদের সই নকল করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, কয়েকশো বিঘা সরকারি জমির জাল দলিল তৈরি করে লক্ষ লক্ষ টাকায় বিক্রি করেছেন সুজয় হাজরা। এবং গোটা ঘটনা জানতেন তৃণমূল ঘনিষ্ঠ জেলা পুলিশের একাধিক পুলিশ আধিকারিক ও অফিসার।