ভিনির ‘ম্যাজিক মোমেন্টে’ও অধরা জয়, ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু ব্রাজিলের
প্রতিদিন | ১৪ জুন ২০২৬
ব্রাজিল:১ (ভিনিসিয়াস)
মরক্কো: ১ (ইসমইল সাইবারি)
গ্যালারিতে হলুদ জার্সির ঢেউ, ঢাক-ঢোল, সাম্বার ছন্দ সবই ছিল।শুধু ব্রাজিলের পরিচিত ফুটবলটাই ছিল না। এই কি সেই মাঠের ভিতর সাম্বা ছন্দ ? মরক্কোর বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচ ড্র করে ব্রাজিল কোনওমতে বেঁচে গেল বলা যায়। কিন্তু প্রথম ম্যাচের পরই সমর্থকদের মধ্যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে, আন্সেলোত্তির এই দল নিয়ে আদৌ কি হেক্সা জয় সম্ভব?
বিশ্বকাপে ব্রাজিল নামলেই প্রত্যাশার পারদটা এক মুহুর্তে অনেকটা চড়ে যায়। আসলে পাঁচ পাঁচ বারের চ্যাম্পিয়ন। বিশ্বজুড়ে যাদের ফুটবল ব্র্যান্ডের হাজারো অনুরাগী। ব্রাজিল মানেই সাম্বা ঝড়, ব্রাজিল মানেই গতি-শিল্পের মেলবন্ধনে অনবদ্য ছন্দময় ফুটবল। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে কোথাও যেন সেই চেনা ব্রাজিলকে দেখা গেল না। অন্তত প্রথমার্ধে লুকাস পাকেতা, মারকুইনহসরা যে ফুটবল খেললেন তাতে আর যাই হোক, সাম্বা ভক্তরা খুশি হতে পারবেন না। দ্বিতীয়ার্ধে পরিস্থিতি খানিকটা বদলাল বটে, কিন্তু সেটাও বিশেষ উৎসাহিত বা উচ্ছ্বসিত হওয়ার মতো নয়। বরং বলা ভালো, প্রথমার্ধের ৩২ মিনিটে ভিনিসিয়স জুনিয়র ব্যক্তিগত ক্যারিশমায় ‘ম্যাজিক’ গোলটা না করে গেলে ড্র-টাও জুটত না কার্লো অ্যান্সেলোত্তির ছেলেদের ভাগ্যে। অন্তত এটা বলা যায়, এদিন মেটলাইফ স্টেডিয়ামে প্রথম ম্যাচটা আর যাই হোক, ব্রাজিলসুলভ ছিল না। বরং মরক্কোই দেখাল কেন তারা গত কয়েক বছরে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল হয়ে উঠেছে।
আন্সেলোত্তির কোচিংয়ে ব্রাজিলের খেলায় যে সাম্বা ঝলক থাকবে না, জানাই ছিল। ব্রাজিলের চিরাচরিত খেলার স্টাইল ভেঙে ইউরোপীয় স্টাইল ঢোকাতে চেয়েছেন আন্সেলোত্তি। কিন্তু তা বলে এরকম ফুটবল? টানা পাঁচটা পাসও খেলতে পারলেন না রাফিনিয়ারা ! এটাই কি সাম্বা ছন্দ ছেড়ে ট্রফি জেতার প্রয়োজনীয় ফুটবল? ম্যাচের শুরু থেকেই ব্রাজিলের উপর চেপে বসে মরক্কো। তাদের হাই প্রেসিং ফুটবল, দ্রুত পাস ব্রাজিলের মাঝমাঠকে প্রায় নাস্তানুবাদ করে দেয়। ম্যাচের ২১ মিনিটে মরক্কোর মাঝমাঠ ভেঙে আক্রমণ শানাতে গিয়ে বিপত্তি বাঁধিয়ে ফেলল ব্রাজিল। কাউন্টার অ্যাটাকে মাঝমাঠ থেকে ব্রাহিম দিয়াজ স্রেফ একটা পাসেই ব্রাজিলের গোটা রক্ষণভাগকে কার্যত বোকা বানিয়ে গোলের মুখ খুলে দিলেন স্ট্রাইকার ইসমাইল সাইবাড়ির জন্য। আগুয়ান অ্যালিসনের মাথার উপর দিয়ে নিখুঁত ফিনিশে প্রথম গোল করে দলকে এগিয়ে দিলেন মরক্কোর ওই ফরোয়ার্ড।
ব্রাহিম দিয়াজের পাস যদি ম্যাচের প্রথম ম্যাজিক মোমেন্ট হয়, তাহলে দ্বিতীয়টা এল ১১ মিনিট পরে। এবার অন্য প্রান্তে। মাঠের বাঁ দিক থেকে বক্সের ভিতরে ঢুকে ডিফেন্ডারদের ঘোল খাওয়ানোটা বরাবরই বড় পছন্দের ভিনিসিয়স জুনিয়রের। ওই অনবদ্য দক্ষতাই তো তাঁকে বিশ্বের সেরাদের তালিকায় বসিয়েছে। আরও একবার সেই কাজটা করলেন তিনি। বাঁ প্রান্ত দিয়ে জনা দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে আরও দু’জনকে বোকা বানিয়ে কঠিন অ্যাঙ্গেল থেকে যে গোলটা করলেন, সেটা সত্যি মনে রাখার মতো।
গোলটি শুধু ব্রাজিলকে ম্যাচে ফেরায়নি, গ্যালারিকেও জাগিয়ে তুলেছিল। কিন্তু তাতে মুখ রক্ষা ছাড়া খুব একটা কাজের কাজ হল না। প্রথমার্ধ শেষ হল ওই ১-১ গোলেই। বলতেই হয়, ভিনির ওই ম্যাজিক মোমেন্ট বাদ দিলে প্রথমার্ধে ভালো খেলেছে মরক্কো। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে ছবিটা কিছুটা বদলায়। দলে বেশ কিছু বদল করেন অ্যান্সেলোত্তি। যার সুফল ব্রাজিল পায়। ম্যাচের রাশ পরের ৪৫ মিনিট ছিল কার্লোর ছেলেদের হাতে। আক্রমণও তৈরি হয়েছিল গোটা কয়েক। কিন্তু এই ব্রাজিল দলের ফাইনাল থার্ডে নেইমারের মতো সৃষ্টিশীল ফুটবলারের যে কতটা প্রয়োজন সেটা এদিন হাড়ে হাড়ে টের পেলেন ইটালিয়ান কোচ। আসলে শেষের দিকে আক্রমণগুলো দানা বাঁধছিল বটে, কিন্তু ফাইনাল পাসটা ঠিকমতো হচ্ছিল না। শেষের দিকে ভিনিসিয়াসের মাইনাস থেকে গোল করা উচিত ছিল রাফিনিয়ার। কিন্তু এই ব্রাজিলে কোনও কিছুই ঠিকঠাক হওয়ার নয়। ফলে বক্সের উপর ফাঁকায় বল পেয়েও মরক্কো গোলকিপারের হাতে মারলেন রাফিনিয়া। বরং ম্যাচের শেষের দিকে মরক্কোর পালটা আক্রমণ থেকে অ্যালিসন অনবদ্য সেভটা না করলে ফল অন্যরকম হতে পারত।
ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করা অবশ্য বিপর্যয় বলা যাবে না। কিন্তু এই ম্যাচ থেকে ব্রাজিল অন্তত এটা বুঝে গেল, শুধু নাম আর ঐতিহ্য ভাঙিয়ে প্রতিপক্ষকে হারানো যাবে না। ভিনিসিয়াসের উজ্জ্বলতা আশার আলো, কিন্তু দলগত পারফরম্যান্সে এখনও অনেক উন্নতির জায়গা রয়েছে। অন্যদিকে মরক্কো আবারও প্রমাণ করল, তারা আর কোনও ‘ডার্ক হর্স’ নয়, তারা এখন বিশ্ব ফুটবলের প্রতিষ্ঠিত শক্তি।