• রাজনীতিকে ছাপিয়ে… সব পরিচয়ের সেরা তুমি ‘ফুটবল’
    প্রতিদিন | ১৪ জুন ২০২৬
  • অংশুমান কর: খেলা হচ্ছে সেই সাত সমুদ্র তেরো নদীর পাড়ে। অথচ, সামনের একটি মাস পশ্চিমবঙ্গকে দেখে মনে হবে– আমেরিকা আর মেক্সিকো উঠে চলে এসেছে আমাদের রাজ্যে। রাজ্যের প্রায় প্রতিটি কোণে, রাস্তায়, গলিতে, কখনও-বা হস্টেল, আর গৃহস্থ বাড়িতেও উড়বে নানা দেশের পতাকা। পৃথিবী যেন এই একটি মাসে ঢুকে পড়বে ছোট্ট আমাদের রাজ্যে। পতাকার সমাহার দেখে কখনও মনে হবে আমরা বাস করছি ব্রাজিলে, তো কখনও আর্জেন্টিনায়, কখনও-বা ফ্রান্সে, তো কখনও পর্তুগালে। রাতের-পর-রাত জাগবে লক্ষ লক্ষ অঁাখি, কিন্তু ক্লান্ত হবে না। এই একটি মাস কান্না-হাসির দোলায় দুলে দুলে উঠবে বাঙালি হৃদয়। আশ্চর্যের যে, নিছক ‘ব্যক্তিপুজো’-ই আমরা দেখব না এই এক মাস। যেভাবে আমরা সারা বছর ভাগ হয়ে থাকি ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান-মহামেডানে, সেভাবেই এই ক’টি দিন আমরা ভাগ হয়ে যাব ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-পর্তুগালে। বিশ্বকাপ ফুটবল (FIFA World Cup 2026) নিয়ে আমাদের উন্মাদনা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে বোঝা যাবে একটি তথ্য দিলেই। আগের বিশ্বকাপে নির্দিষ্ট কয়েকটি দল বিশ্বকাপ জিতলে বাংলা প্রকাশনার জগতে তাদের সমর্থক প্রকাশকরা– ঘোষণা করেছিলেন– বইয়ের উপর বিপুল ছাড়!

    মনে পড়ে যাচ্ছে– ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপের কথা। সে ছিল জিদানের বিশ্বকাপ। চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ফ্রান্স। আমরা দুই ভাই তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। থাকতাম হস্টেলে। রাত জেগে কমন রুমে খেলা দেখা হত। আমরা দু’জন আর্জেন্টিনার অন্ধ সমর্থক। সঙ্গী আরও তিন-চারজন। হস্টেলের বাকি প্রত্যেকেই ব্রাজিলের সমর্থক। প্রথমে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে গেল আর্জেন্টিনা। সে কী কান্না আমাদের ক’জনের! আর তারপর ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে দুরমুশ হল ব্রাজিল। সেদিন দেখি সারা হস্টেলই কঁাদছে। যে-প্রতিযোগিতায় দূরতম ভবিষ্যতেও আমাদের দেশের অংশগ্রহণ করার সম্ভাবনাই নেই, সেই প্রতিযোগিতাটি নিয়ে এমন মাতামাতির কারণ কী? কেন একটি ভিনদেশের জয়ে আমরা উল্লাসে মাতি, পরাজয়ে কেঁদে ভাসাই? অবাক করা এটিই যে, বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে এই মাতামাতি কিন্তু ভারতের অন্যান্য রাজ্যে তেমন দেখা যায় না। অবাক মনে হলেও সত্য, এই একই ধরনের উন্মাদনা দেখা যায় কিন্তু বাংলাদেশে। কেন এমনটি হয়?

    একটা কথা তো ঠিক। অলিম্পিককে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ বলা হলেও বিশ্বকাপ ফুটবলই সম্ভবত এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দযজ্ঞ, এখনকার ভাষায় সবচেয়ে বড় ‘ইভেন্ট’, তাই এই ইভেন্টে যে বিশ্বের সব প্রান্তের মানুষকেই আকর্ষণ করবে, সে তো স্বাভাবিক। খেলাটির নিয়মকানুনও বেশ সোজা। বোঝা একেবারেই কঠিন নয় অন্য কিছু খেলার মতো। বিশ্বজুড়েই তাই বিশ্বকাপ ফুটবলের জনপ্রিয়তা প্রবল। কিন্তু বাঙালিদের মতো এরকম মহুলগন্ধী উন্মাদনা আর কোনও জাতি দেখায় কি? এর একটি কারণ তো এটা অবশ্যই যে, মোহনবাগানের শিল্ডজয়ের মধ্য দিয়ে আমরা এই খেলাটিকেও ব্যবহার করতে শুরু করেছিলাম আমাদের অস্মিতা আর প্রতিরোধের ‘প্রতীক’ হিসাবে। বন্দুকের ক্ষমতা আর মস্তিষ্কের কারিকুরিতে যারা হয়ে উঠেছিল আমাদের ‘প্রভু’, চামড়ার বলে লাথি মেরে, আমরা কেবল তাদের ভূপতিতই করিনি, অহংকেও নামিয়ে এনেছিলাম মাটিতে। সেই তখন থেকেই তো ফুটবল একেবারে ঢুকে গিয়েছে আমাদের অন্দরমহলে। আর তাকে স্থানচ্যূত করা যায়নি।

    খেয়াল করলে দেখা যাবে, বাঙালিদের মধ্যে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার সমর্থকই সবচেয়ে বেশি। এই দুই সমর্থক গোষ্ঠী লড়াই করে ঠিক অনেকটা ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের সমর্থকদের মতোই। কেন? কারণ এই দু’টি দেশও ভূ-রাজনীতির মাপকাঠিতে দুর্বল দেশই। ব্রাজিলের অধিকাংশ মানুষ তো আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের মতোই গরিবও বটে। ফুটবল মাঠে সেই দেশটার লড়াই তাই কোথাও হয়ে যায় আমাদের লড়াইও। তলিয়ে ভাবলে আরও-একটি কথা বলতেই হয়। অনেকে বলে, বাংলায় আসলে নবজাগরণ ঘটেনি, উনিশ আর বিশ শতকের প্রথমার্ধে জেগে উঠেছিল আসলে শিক্ষিত বাঙালিদের একটি অংশ। এ যদি মেনেও নিই তবু স্বীকার করতে হয়, সেই জাগরণেরও বিপুল প্রভাব পড়েছিল বাঙালির মনোজগতে। হঠাৎ করেই যেন বাঙালি বুঝতে পেরেছিল যে শত বাধা, টিকটিকি, হাঁচি, টিকি, দাড়ি নিয়েই বাঙালি শুধু বেঁচে নেই– সে বেঁচে আছে এক বিপুল পৃথিবীর অংশ রূপে। বুঝতে পেরেছিল যে, বসুধাকে খণ্ড, ক্ষুদ্র করে দেখা রাখা আসলে এক ভ্রম। বাঙালি দীক্ষিত হয়েছিল বিশ্বজনীন মনোভাবে। সে ‘তৃতীয় নয়ন’ খুলে দেখেছিল যে, কলকাতার মতো একটি শহরও আসলে আদ্যন্ত ‘কসমোপলিটান’। কোথাও একটি যেন এই বিশ্বজনীনতার মন্ত্রে দীক্ষাও কিন্তু বাঙালিকে গঙ্গার থেকে মিসিসিপি হয়ে ভলগাকেও আপন করে নিতে শিখিয়েছে। বাঙালি তাই মেসি কঁাদলে কঁাদে, রবার্তো কার্লোসের বঁাকানো ফ্রি কিকের সঙ্গে মালতীলতার মতো দুলে ওঠে।

    তবে সবচেয়ে বড় যে-ঘটনাটি ঘটে বিশ্বকাপ ফুটবল চলার সময় সেটি হল এই যে, বাঙালি হঠাৎ করে বুঝতে পারে তার ‘পরিচয়’ মাত্র একটি সত্তা-নির্ভর নয়। বুঝতে পারে যাকে সে ‘শত্রু’ মনে করছিল মাত্র কিছু দিন আগেও, সে আসলে একদিক থেকে তার বন্ধুও। এবারে যেন এই সত্যটি আরও বেশি স্পষ্ট করে আমাদের চোখে ধরা পড়ছে বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক পরে পরেই বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসায়। কিছু দিন আগেও বিজেপির যে-সমর্থক ভোটের আবহে সিপিএমের যে-সমর্থককে মনে করছিল ‘পরম শত্রু’, আক্রমণ করছিল, সেই এখন সেই শত্রুর সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলছে– ‘ভামোস আর্জেন্টিনা’। কিছু দিন আগেও সমাজমাধ্যম উত্তাল হয়েছিল যাদের আকচাআকচিতে, সেই তারাই এখন একসঙ্গে গাইছে– ‘মিলে সুর মেরা তুমাহারা’। বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতি চার বছর অন্তর বাঙালিকে বুঝিয়ে দেয় যে, আমাদের পরিচিতি আসলে ‘একটি’ নয়, একাধিক। যে তৃণমূল সমর্থক একজন বিজেপির সমর্থককে ‘শত্রু’ মনে করে, বিশ্বকাপ এলে সেই সমর্থক বুঝতে পারি– আরে, আমারই মতো তো ওই মানুষটিও আর্জেন্টিনার সমর্থক, আমরা তো আসলে ‘বন্ধু’-ই! এই কথাটিই তো ‘পরিচিতি সত্তা’-র রাজনীতির তাত্ত্বিক পরিসরে বেশ কিছু দিন ধরে জোরের সঙ্গে বলে আসছেন অমর্ত্য সেন। বলছেন, আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা আমাদের একাধিক পরিচিতির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষিতে একটি নির্দিষ্ট পরিচিতিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে বাধ্য হই। তাই আমরা মারি, আর মরি। এমনটিই তো চায় রাজনৈতিক দলগুলি, বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক দলেরা। তারা তো আমাদের সারাক্ষণ বিভক্ত করে রাখতে চায় দলীয় রাজনীতির পরিসরে। ভুলিয়ে রাখতে চায় আমাদের একাধিক পরিচিতির স্বাতন্ত্র্য। বিশ্বকাপ ফুটবলও এই রাজনৈতিক প্রকল্পটির কেন্দ্রে ছুড়ে দেয় মিসাইল।

    যেটি দুঃখের, বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেলেই আমরাও ভুলে যাই আমাদের একাধিক পরিচিতির সহজ সত্যটি। যে-দলই এবার বিশ্বকাপ জিতুক না কেন, আমাদের ‘প্রকৃত জয়’ হবে তখনই– যদি আমরা মনে রাখতে পারি যে, সহজেই আমরা পাশের কারও হাত ধরতে পারি, সহজেই পাশের মানুষটিকে নিজের বন্ধু করে নিতে পারি– যদি এই পৃথিবীটাকে একটু ভিন্ন চোখে দেখি।

    (মতামত নিজস্ব)
    লেখক অধ্যাপক, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়
  • Link to this news (প্রতিদিন)