আবহাওয়া দপ্তরের ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাসেই এখন বুক কাঁপে শহরের। আয়লা-আমফানের সাক্ষী থাকা শহরে এখন দৈনিক কালবৈশাখীও বাড়ায় হৃদকম্পন। কারণ সামান্য ঝোড়ো হাওয়া দিলেই শহরের রাস্তা ঢেকে যায় সবুজের ‘শব’-এ। কলকাতা ও কলকাতা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এখন ঝড় হলেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ গাছ ভেঙে পড়া।
কলকাতায় গত কয়েক সপ্তাহে ঝড়-বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে গাছ ভেঙে পড়ার ঘটনা। পুরসভা সূত্রে খবর, ২৯ মে কালবৈশাখীতে শহরে ৬৫টিরও বেশি গাছ উপড়ে পড়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ৫০টি গাছ। যার মধ্যে অনেকগুলি রবীন্দ্র সরোবরে অবস্থিত। এর পরে জুনের প্রথম সপ্তাহেও ঝোড়ো হাওয়ায় অন্তত ১০টি বড় গাছ এবং কয়েক ডজন ডাল ভেঙে পড়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতা— সল্টলেক, নিউ টাউন, এসপ্ল্যানেড, লেক মার্কেট, শ্যামবাজার, বেহালা, কসবা, যাদবপুর— সর্বত্র একই ছবি দেখা গিয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, মাত্র ৩০-৬০ কিলোমিটার বেগের ঝোড়ো হাওয়াতেই শহরে এত গাছ ভেঙে পড়ছে কেন? তা হলে বৃক্ষরোপণের ভাবনা, ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি শহর জুড়ে গাছের গোড়া বাঁধিয়ে দেওয়ার যে রীতি প্রচলিত ছিল, তার মধ্যেই কি লুকিয়ে রয়েছে বড় কোনও ত্রুটি? নাকি সৌন্দর্যায়নের পরিকল্পনার খামতি ডেকে আনছে গাছের অকাল মৃত্যু? উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের একাংশ বলছেন, সৌন্দর্যায়নের নামে সর্ম্পূণ অবৈজ্ঞানিক ভাবে গাছের গোড়ার চার দিকে কংক্রিট বা পেভার ব্লক বসিয়ে দেওয়াই সবথেকে বড় সমস্যা তৈরি করেছে। এতে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে। গাছ শিকড় ছড়াতে না পারলেও লম্বায় বড় হয়েছে। যার ফলে সামান্য ঝড় হলেই নিজের শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে না পেরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। কখনও গোড়ার মাটি আলগা হয়ে ভেঙে পড়ছে। তবে শুধু সৌন্দর্যায়নই নয়, শহরে সবুজের প্রাণহানির পিছনে রয়েছে আরও অনেক কারণ।
বিষয়টি সম্পর্কে তথ্যতল্লাশ করতে এই সময় অনলাইন যোগাযোগ করেছিল পরিবেশকর্মী তথা দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের প্রাক্তন চিফ ল অফিসার বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তাঁর মতে, ‘শহরে বৃক্ষরোপণের এখনও পর্যন্ত কোনও গাইডলাইন নেই। ফলে অপরিকল্পিত ভাবে বৃক্ষরোপণের জেরেও বেড়েছে গাছ উপড়ে পড়ার ঘটনা।’ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, গাছ লাগানোর সময়ে মাথায় রাখা উচিত কোথায়, কী গাছ লাগাচ্ছি। যেখানে নারকেল গাছ লাগালে ভালো হতো, সেখানে হয়তো শিরীষ গাছ লাগানো হচ্ছে। ফলে ঝড় উঠলে সহজেই ভেঙে পড়ছে সেই গাছ। রাস্তার উপরে গাছ পড়ে জ্যাম-জট এই ঝড়-জলের দিনে শহরবাসীর নিত্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই নতুন সরকারের কাছে শহরের ফুসফুসকে বাঁচাতে সবুজায়নের সুচারু পরিকল্পনা তৈরিরও আর্জি জানিয়েছেন তিনি।
গাছ পড়ার কারণ হিসেব একই কথার প্রতিধ্বনি শোনা গেল ডঃ এপিজে আবদুল কালাম গভর্নমেন্ট কলেজের বটানির অ্যাসিস্টটেন্ট প্রফেসর নিলয় কুমার মিত্রের গলাতেও। সৌন্দর্যায়ন, অপরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ ছাড়াও পরিচর্যার ত্রুটিকেও গাছের এমন অকালে উপড়ে পড়ার বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি। অধ্যাপক নিলয় কুমার মিত্রের কথায়, ‘যখন-তখন যেমন খুশি ভাবে গাছ ছেঁটে ফেলাটাও গাছকে দুর্বল করে দেয়। বিদ্যুতের তারের উপরে গাছের ডাল যাতে না পড়ে, তার জন্য শহরে যে ভাবে গাছের ডাল ছাঁটা হচ্ছে, তাতেও গাছের ক্ষতি হয়।’ বিস্তারিত ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘গাছ নিজের দেহের ভারসাম্য অনুযায়ী, ডালপালা মেলে ধরে। অথচ যখন ডালপালা ছাঁটা হয়, তখন সেই ভারসাম্যের কথা মাথায় রাখা হয় না। যে দিক দিয়ে তার গিয়েছে, সে দিকটা হয়তো হুড়মুড়িয়ে ছেঁটে দেওয়া হলো। ফলে গাছের অন্যদিকে ভার বেড়ে গেল। সামান্য জোরে ঝড় উঠতেই তখন এই ভারসাম্য হারানো গাছগুলির উপড়ে পড়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।’ এ ছাড়া ঝড় উঠলে কংক্রিটের বহুতলের ফাঁক দিয়ে বয়ে যাওয়া হাওয়া আরও শক্তি পায়। ফলে জঙ্গলে একসঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা গাছ প্রবল ঝড়ে মাথা উঁচু করে টিকে থাকলেও, শহরের মাটিতে বেড়ে ওঠা সেই একই ধরনের গাছ হাওয়ার ঝাপটায় উপড়ে যাচ্ছে।
তবে উপায় কী? শহরে কংক্রিটের দখলদারির মাঝে সবুজায়ন অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বৃক্ষরোপণের আগে তার সঠিক পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পরিবেশকর্মী থেকে উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা। বছর কয়েক আগে কেন্দ্রীয় নগরোন্নয়ন মন্ত্রকের অনুমোদিত একটি সংস্থার রিপোর্টে ধরা পড়েছিল, কলকাতা ও তাঁর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে গাছগাছালির করুণ পরিসংখ্যানের আসল চিত্র। শহরের আড়েবহরে বৃদ্ধি, নগরায়নের চাহিদা পূরণে আকাশছোঁয়া বহুতল, আর উড়ালপুলের আড়ালে ছায়া হারিয়েছে কলকাতা। অর্থাৎ শহরে বিপজ্জনক ভাবে কমে গিয়েছে বড় গাছের সংখ্যা। উন্নয়ন হোক বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কোপ, শহরে সবুজের আচ্ছাদন কমে দাঁড়িয়েছে ১.৭৭ বর্গ কিলোমিটারে। তাই সবুজ রক্ষায় উদ্যোগী হলে আগে বুঝে নিতে হবে কংক্রিটের জঙ্গলে ঝড় ও বাকি প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে পারবে কারা। যেমন, অধ্যাপক নিলয় কুমার মিত্রের পরামর্শ, খুব ঘন জনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে রাস্তার পাশে বা ডিভাইডারে গাছের ঝড়ে উপড়ে পড়া রুখতে গুল্মজাতীয় গাছ লাগানো যেতে পারে। এ ছাড়া নিম, জাম, অর্জুন, অশোকা, সিলভার ওক, কদম্ব, টগরের মতো গাছও ভীষণ ভালো অ্যাভিনিউ ট্রি বলে সার্টিফিকেট দেন তিনি। তবে ছায়া পেতে জায়গা অনুযায়ী ফলের গাছও রোপণ করার পক্ষে মত দিচ্ছে পরিবেশবিদরা।
গত ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে শহরের বুক থেকে সবুজের চাদর সরে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শহরাঞ্চলে সবুজ ফেরাতে বিশেষ পরিকল্পনার কথাও শোনা যায় তাঁর মুখে। একই সঙ্গে আবাসন তৈরির সময়ে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় বাধ্যতামূলক ভাবে বৃক্ষরোপণের আইনও মনে করান তিনি। মুখ্যমন্ত্রী সে দিন তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, শুধু বৃক্ষরোপণ করলেই হবে না, তাঁকে যত্ন সহকারে মহীরুহ করে তোলার দায়িত্বও নিতে হবে। তাই শহরের বুকে বৃক্ষরোপণের সময়ে সাধারণ কিছু মৌলিক নিয়ম মনে করাচ্ছেন পরিবেশবিদ থেকে উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ও অধ্যাপকরা। তাতেই ঝড়-জলে সবুজের মড়ক ঠেকানো সম্ভব।