নতুন দলে মা, মমতার দেওয়া উপহার ফেরাচ্ছেন কাকলি-পুত্র
আজ তক | ১৫ জুন ২০২৬
বিয়ের সময়ে তাঁর স্ত্রীকে সোনার নেকলেস দিয়েছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যেপাধ্যায়। আর তাঁকে দুর্গাপুজোয় উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন পায়জামা-পাঞ্জাবি। এবার সেই সমস্ত উপহার ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের পুত্র বৈদ্যনাথ ঘোষ দস্তিদার। আজই তিনি সেই উপহার ফেরত দিচ্ছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় বৈদ্যনাথ স্পষ্ট জানিয়েছেন, উপহার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য এটাই হল সবথেকে সঠিক সময়।
এই গোটা ঘটনার সূত্রপাত অবশ্য দলীয় অন্দরের কিছু বিস্ফোরক দাবি এবং কুৎসা ছড়ানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে। ডক্টর বৈদ্যনাথ ঘোষ দস্তিদার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে তিনি নাকি বারাসত বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ভোটের লড়ার জন্য তৃণমূলের কাছে বিধায়ক পদের টিকিট চেয়েছিলেন বলে যে দাবি করা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং অসত্য কারণ তিনি কোনও দিনই বারাসতের টিকিট চাননি।
এর পাশাপাশি সোনালী গুহর করা এক অত্যন্ত বিতর্কিত ও ব্যক্তিগত আক্রমণের তীব্র বিরোধিতা করেছেন বৈদ্যনাথবাবু। সোনালী গুহ নাকি দাবি করেছিলেন যে বৈদ্যনাথবাবু, তাঁর ভাই এবং তাঁদের মা কাকলি ঘোষ দস্তিদার নিয়মিত মদ্যপান করেন যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এই চিকিৎসক। এই ধরণের মিথ্যা রটনার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বৈদ্যনাথবাবু তাঁর আইনি নোটিশে সাফ জানিয়েছেন যে আগামী দিনে অভিযুক্তদের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে এবং নিজেদের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিতে হবে। যদি তাঁরা এই নোটিশের পর উপযুক্ত পদক্ষেপ বা ক্ষমা না চান তবে তিনি আইনের পথে হেঁটে মানহানির মামলা সহ সমস্ত রকমের কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
এই উপহার ফেরতের আবহেই তৃণমূলের অন্দরে এক চরম রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই দলের অন্দরে একটি সমান্তরাল অক্ষরেখা তৈরির চেষ্টা করছিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। বিধানসভার পর এবার দেশের সংসদীয় লোকসভাতেও চরম ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলীয় সূত্রে খবর, দলের মোট ২৮ জন সাংসদের মধ্যে প্রায় ২০ জন সাংসদই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে অস্বীকার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁরা লোকসভায় সম্পূর্ণ আলাদা একটি ব্লক গঠন করতে চলেছেন। আর এই গোটা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছেন খোদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার, তিনিই এখন এই শিবিরের প্রধান মুখ।
এই চরম রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেই এবার সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করতে চলেছেন কাকলির ছেলে তথা পেশায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ বৈদ্যনাথ ঘোষ দস্তিদার। বারাসত বিধানসভা কেন্দ্রের টিকিট চাওয়া এবং তাঁর পরিবারকে নিয়ে অত্যন্ত ব্যক্তিগত স্তরের কুৎসা করার অভিযোগে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌগত রায়, মহুয়া মৈত্র এবং নেত্রী সোনালী গুহকে একটি আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন। আইনজীবী পূজা শুক্লর মাধ্যমে পাঠানো এই নোটিশে বৈদ্যনাথবাবু তাঁদের কাছ থেকে প্রকাশ্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং বিতর্কিত বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
সম্প্রতি একটি সাংবাদিক বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনও নাম না করে ইঙ্গিত করেছিলেন যে, এক প্রবীণ সাংসদের পরিবারের সদস্য বারাসতের বিধানসভা টিকিট চেয়েছিলেন এবং তা না পেয়েই দলে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এই দাবির প্রেক্ষিতে আইনি নোটিশে বৈদ্যনাথবাবু স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তিনি কখনওই বারাসত বা অন্য কোনও কেন্দ্র থেকে ভোটে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেননি। ফলে টিকিট না পেয়ে তাঁর মা ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
এর পাশাপাশি, তৃণমূল নেত্রী সোনালী গুহর তোলা একটি চরম ব্যক্তিগত অভিযোগও তীব্রভাবে খণ্ডন করেছেন কাকলি-পুত্র। সোনালী গুহ দাবি করেছিলেন যে, বৈদ্যনাথ, তাঁর ভাই এবং মা কাকলি ঘোষ দস্তিদার নিয়মিত মদ্যপান করেন। এই বক্তব্যকে চূড়ান্ত মানহানিকর এবং কুৎসিত আখ্যা দিয়েছেন বৈদ্যনাথবাবু। ভোটের ঠিক মুখে দাঁড়িয়ে খোদ সাংসদ-পুত্রের এই আইনি পদক্ষেপ ঘাসফুল শিবিরের অস্বস্তি এবং সংকট আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সম্প্রতি সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে এক ‘বিদ্রোহী’ মনোভাব জেগে উঠতেই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় খোঁচা দিয়ে দাবি করেছিলেন যে, সুদীপ নাকি কিছুদিন আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে একটি গাড়ি চেয়েছিলেন। উপহার ফেরত, টিকিট বিতর্ক এবং গাড়ি চাওয়ার মতো একের পর এক ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে যে, তৃণমূলের অন্দরে কি বরাবরই এই ধরণের পাইয়ে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল।