গুরুগ্রামের আবাসন থেকে বীরভূমের এক আদিবাসী তরুণীকে উদ্ধার করল পুলিশ। শুক্রবার সেক্টর ৯১-এর ডিএলএফ গার্ডেন সিটির ঘটনা। আবাসনেরই একটি ফ্ল্যাটে ভাদু মান্ডি নামে ওই তরুণীকে আটকে রেখে জোর করে পরিচারিকার কাজ করানো হতো বলে অভিযোগ। চলত শারীরিক নির্যাতনও। কয়েক মাস আগে কোনও রকমে ফোনে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। তার পরেই উদ্ধার অভিযান শুরু করে বীরভূম এবং গুরুগ্রাম থানার পুলিশ।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, পরিচারিকার কাজের জন্য ২০২৪ সালে দালাল মারফত দিল্লি গিয়েছিলেন ভাদু। সেই সময়ে তাঁকে ৪০ হাজার টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়েছিল। তাঁরাই গুরুগ্রামের আবাসনের ওই ফ্ল্যাটে ভাদুর কাজের বন্দোবস্ত করে দেন। ভাদুর বোন লক্ষ্মী টুডুর অভিযোগ, ‘দিদিকে প্রতিদিন ১৬ ঘণ্টারও বেশি কাজ করতে হতো। প্রায়ই মারধরও করত মালিক।’ ভাদুর ফোনও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ তাঁর। শুধু তাই নয়, ভাদুকে বাড়ির বাইরে বেরোনো বা পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হতো না বলেও দাবি করেছেন তাঁর বোন লক্ষ্মী।
ভাদু যে আবাসনে কাজ করতেন সেখানে স্মার্ট লকিংয়ের ব্যবস্থা ছিল। তালা দেওয়া হতো ডিজিটাল প্রযুক্তিতে। ফলে ভাদুর পক্ষে বাইরে বেরোনো সম্ভব ছিল না। পরিবারের দাবি, ‘বাড়ির মালিকরা বাইরে বেরোলে ভাদুকে তালাবন্দি করে রেখে যেতেন। কার্যত তাঁর চলাফেরার স্বাধীনতা বলেও কিছু ছিল না।’ এ ভাবেই কেটেছে দু’বছর। তবে এসব কিছুই জানতেন না ভাদুর পরিবারের সদস্যরা। পুরো ঘটনা প্রকাশ্যে আসে নাটকীয় ভাবে। মেরামতির কাজে এক সার্ভিস টেকনিশিয়ান ওই ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন। তাঁর কাছ থেকে ফোন চেয়ে বাড়িতে যোগাযোগ করেন ভাদু। খুলে বলেন সব কথা।
ফোনে দিদির দুর্দশার কথা শুনেই থানায় ছোটেন লক্ষ্মী। গত ৪ জুন ইলামবাজার থানায় বন্ডেড লেবার সিস্টেম (অ্যাবলিশন) অ্যাক্ট, ১৯৭৬ এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় মামলা দায়ের হয়। পরিবারের পাশে দাঁড়ায় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘নারী ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র’ (NOSKK)। তারা ঘটনার নথিপত্র তৈরি করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং গুরুগ্রাম প্রশাসনের কাঠে পাঠিয়ে দেয়। বিষয়টি জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ এবং শ্রম দপ্তরের নজরেও আনে তারা। তদন্তের পরে ঘটনাটিকে বন্ডেড লেবারের মামলা হিসেবে চিহ্নিত করে শ্রম দপ্তর। এর পরেই গুরুগ্রামের জেলাশাসককে অবিলম্বে পদক্ষেপ করার সুপারিশ করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের একটি দলও দিল্লিতে পৌঁছয়। তার পরে গুরুগ্রাম পুলিশ এবং জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যৌথ অভিযানে ভাদুকে উদ্ধার করেন আধিকারিকরা। তবে সেই সময়ে ফ্ল্যাটে বাড়ির মালিকরা কেউ ছিলেন না। তাঁদের অবিলম্বে হাজিরার নির্দেশ দিয়ে নোটিস পাঠানো হয়েছে। উদ্ধারের সময়ে বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করেন ভাদু। তাঁর দাবি, মারধরের জেরে তিনি ডান হাত তুলতে পারেন না। ডান কানের শ্রবণশক্তিও হারিয়েছেন। উদ্ধার অভিযানের দিন সকালেও তাঁকে মারধর করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। ইতিমধ্যেই ভাদুর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে গোটা ঘটনার তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।