• বিদ্রোহীদের নতুন ঠিকানা NCPI, ডামাডোল অব্যাহত তৃণমূলে, নীরব কালীঘাট
    এই সময় | ১৫ জুন ২০২৬
  • এই সময়, নয়াদিল্লি: দল বদল? নাম বদল? ধাঁধার থেকেও জটিল হয়ে গেল রবিবারের রাজধানী।

    দুপুরেও জল্পনা চলেছে, কারা ‘আসল তৃণমূল’? তরজা চলেছে সংসদে বিদ্রোহী সাংসদদের আলাদা ‘ব্লক’ নিয়ে। দু’সপ্তাহব্যাপী সেই জল্পনার মোড়ই রাতে ঘুরে গেল একেবারে ১৮০ ডিগ্রি! সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে জয়ী লোকসভার ২০ ‘বিদ্রোহী’ সাংসদ আচমকা ঘোষণা করলেন, তাঁরা ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়ায় (এনসিপিআই) মিশে যাচ্ছেন! লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে একটি চিঠির মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত লিখিত ভাবে জানিয়েও দিয়েছেন তাঁরা। ঘটনা হলো, জাতীয় তো বটেই, রাজ্য রাজনীতির মঞ্চেও কার্যত অখ্যাত এই এনসিপিআই–এর জন্ম ২০২২ সালে, পশ্চিমবঙ্গেরই হাওড়ায়। সংসদীয় রাজনীতিতে তাদের যোগদানের ইতিহাস বলতে ২০২৩ ও ২০২৪–এ ত্রিপুরায় কয়েকটি আসন থেকে বিধানসভা ও লোকসভা ভোটে লড়াই। দলটির কোনও বিধায়ক বা সাংসদ নেই।

    যদিও চার বছর বয়সী আঞ্চলিক দল এনসিপিআই–তে ‘মিশে যাওয়ার’ সিদ্ধান্তের পরেই বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদরা জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা পূর্বঘোষিত নীতি অনুযায়ী কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন এনডিএ শিবিরকে সমর্থন করবেন৷ লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে বিদ্রোহী সাংসদদের ‘মুখ’ হিসেবে উঠে আসা কাকলি ঘোষদস্তিদার বলেন, ‘আমরা ২০ জন সাংসদ স্পিকারের সঙ্গে দেখা করেছি। তৃণমূলের মোট সাংসদদের মধ্যে আমরা দুই তৃতীয়াংশের প্রতিনিধি। আমরা ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টির সঙ্গে মিশে যাচ্ছি। আমরা দেশের কাজে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ–র সঙ্গে সহযোগিতা করব।’

    রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটা বড় অংশের দাবি, অদূর ভবিষ্যতে সম্ভাব্য আইনি জটিলতা এড়ানোর জন্যই তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা রবিবার এই ‘মাস্টারস্ট্রোক’ দিয়েছেন— যেখানে দলত্যাগবিরোধী আইন অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পথ না থাকে। মাস দু’য়েক আগে রাঘব চাড্ডা–সহ আম আদমি পার্টির সাত জন রাজ্যসভা সাংসদ বিজেপিতে যেভাবে মিশে গিয়েছিলেন, ঠিক সেই পদ্ধতি মেনেই এ দিন এনসিপিআই-এর সঙ্গে ‘মার্জার’ করেছে তৃণমূলের লোকসভার বিদ্রোহী সাংসদ ব্লক৷ কিন্তু সেটা কি আইনি ভাবে সম্ভব? তার প্রাথমিক ব্যাখ্যা দিয়ে সদ্য বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেওয়া তৃণমূল সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় রবিবার রাতে বলেন, ‘দীর্ঘ সংসদীয় রাজনীতির অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি দুই তৃতীয়াংশ সদস্য একসঙ্গে দল থেকে বেরিয়ে এলে তাঁদের বিরুদ্ধে দলত্যাগ আইন বর্তায় না৷ সেটা লোকসভা অথবা বিধানসভা যেখানেই হোক না কেন৷ আমার বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত দলের যাবতীয় স্বীকৃতি এই দিকেই থাকবে৷’

    ল্বীকৃতি যে দিকেই থাক, আপাতত দিল্লির ‘মার্জার’ ছাপ ফেলতে চলেছে বাংলার মাটিতেও। অদূর ভবিষ্যতে বাংলার সর্বত্র পার্টি অফিস খুলবে এনসিপিআই, রবিবার দিল্লিতে জানিয়ে দিয়েছেন সদ্য এনসিপিআই-তে যোগদানকারী বিদ্রোহী, বাঁকুড়ার তৃণমূল সাংসদ অরূপ চক্রবর্তী৷ এ দিকে, লোকসভার বিদ্রোহীরা এই ‘মার্জার’–পথে হাঁটার পরেই রবিবার রাতে কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জরুরি বৈঠক করেছেন বলে তৃণমূল সূত্রের খবর। সেই বৈঠকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও’ব্রায়েন, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়রা ছিলেন। লোকসভার বিদ্রোহীদের অন্য দলে িমশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে কীর্তি আজাদ এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘সংবিধানের নির্দিষ্ট ধারা এবং সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী এঁদের সাংসদ পদ খারিজ হওয়ার কথা। আমরা লোকসভার স্পিকারকে যে চিঠি দিয়েছি, সেখানে সব বিশদে বলা হয়েছে। সুদীপদা, আমি বিহার থেকে এলেও পিছন থেকে ছুরি মারি না।’ কালীঘাটের বৈঠক সেরে বেরিয়ে তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষও বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছাতার তলা থেকে ব্যাঙের ছাতার তলায় গেলেন কী করে? অনেকে এমন ছোটখাটো দল তৈরি করে রাখেন। সেখানে কৌশলগত আশ্রয় নিলেন ওঁরা।’

    রবিবার সকালে অবশ্য এমন ‘কৌশলগত আশ্রয়’–এর কোনও আঁচ ছিল না কালীঘাটের কাছে। দুপুরে দিল্লি যাওয়ার আগে সাংসদ কাকলি ঘোষদস্তিদার জানিয়েছিলেন, তাঁরা একসঙ্গে ২০ থেকে ২২ জনও থাকতে পারেন। যদিও রবিবার বিকেলে দিল্লি পৌঁছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিজেপি থেকে বাংলার দায়িত্বপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে যখন বিদ্রোহী সাংসদরা বৈঠকে বসেন, তখন সেখানে উপস্থিতি ছিল ১৮ জনের। ফ্লাইট লেট — এই কারণে বৈঠকে ছিলেন না দুই তৃণমূল সাংসদ খলিলুর রহমান এবং আবু তাহের খান৷ পরে তাঁরা দিল্লিতে পৌঁছন এবং বিদ্রোহী ব্লকের ২০ জন সাংসদ একজোট হয়ে লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে এনসিপিআই-তে মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সম্বলিত চিঠি তাঁর হাতে তুলে দেন৷

    ঘটনাচক্রে এর কিছুক্ষণ আগেই লোকসভার স্পিকারের বাসভবনের অফিসে গিয়ে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি জমা দেন মমতাপন্থী তৃণমূলের দুই সাংসদ কীর্তি আজাদ এবং সাগরিকা ঘোষ৷ এই চিঠিতে সাফ জানানো হয়, লোকসভার স্পিকার কোনওভাবেই একটি দলের মধ্যে চলতে থাকা বিবাদের কারণে দলেরই অন্য একটি গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দিতে পারেন না৷ এই মর্মে আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয় চিঠিতে৷ সাগরিকা তখন বলেছিলেন, ‘লোকসভায় তৃণমূলের মধ্যে পৃথক একটি ব্লক গঠন করা সংবিধান–বিরোধী এবং বেআইনি। আইনে এই ব্লক কখনও স্বীকৃতি পেতে পারে না।’ সেই সময়েও কীর্তি আজাদ, সাগরিকা–সহ মমতাপন্থী শিবির বুঝতেই পারেনি যে তাদের জন্য বড় চমক অপেক্ষা করছে৷

    এর কিছুক্ষণের মধ্যেই সামনে আসে তৃণমূলের বিদ্রোহী ব্লকের অবস্থান— যেখানে দলত্যাগবিরোধী আইনকে এড়িয়ে এনসিপিআই-তে সংযুক্তিকরণের কথা জানানো হয়েছে৷ বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদের এই নতুন দলে মিশে যাওয়া নিয়ে প্রবীণ আইনজীবী তথা রাজ্যসভার সাংসদ কপিল সিবাল এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘ভারতের গণতন্ত্র ‘থিয়েটার অফ এবসার্ডে’ পরিণত হয়েছে। বিদ্রোহী তৃণমূলের সাংসদরা অন্য দলে মিশে যেতে পারেন না। তৃণমূল যদি চায় তবেই এটা হতে পারে। এঁদের সাংসদ পদ খারিজ করা হোক।’

    লোকসভার প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল পিডিটি আচার্যেরও ব্যাখ্যা, ‘মার্জার’ করার আইনি অধিকার থাকে একটি দলের৷ সংশ্লিষ্ট দলের সাংসদ অথবা বিধায়করা মার্জারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন না৷ দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও নয়৷ এই ক্ষেত্রে দলের তরফে এই সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন পার্টির চেয়ারপার্সন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ এখন দেখতে হবে তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী শিবিরের সাংসদরা স্পিকারের হাতে তুলে দেওয়া তাঁদের চিঠিতে ‘মার্জার’ শব্দটি আদৌ ব্যবহার করেছেন কি না৷ যদি তাঁরা মার্জার শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন, তা হলে তাকে আইনি রাস্তায় চ্যালেঞ্জ জানানো সম্ভব৷’

    উল্লেখ্য, শমীক ভট্টাচার্য–সহ বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্বের একটা বড় অংশ জানিয়ে দিয়েছিলেন, বিজেপির তৃণমূলিকরণ তাঁরা চান না। অর্থাৎ, তৃণমূল থেকে ঢালাও বিধায়ক, সাংসদ বা নেতাদের নেওয়া হবে না বিজেপিতে। সে দিক থেকে বিজেপি তাদের দরজা খুলল না, অথচ লোকসভার বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদরা এনডিএ-তে সামিল হয়ে গেলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের বক্তব্য, যেহেতু লোকসভা ভোট এখনও তিন বছর দূরে, তার আগে বিদ্রোহী সাংসদরা আপাতত এই প্ল্যাটফর্মে থাকলেন। সূত্রের দাবি, তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের কয়েকজন এ দিন ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে বৈঠক চলাকালীন জানতে চান, তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে না তো! বিজেপি নেতৃত্ব তাঁদের আশ্বস্ত করেন, যা করা হচ্ছে, তার সবটাই আইনি পথে। বিদ্রোহী সাংসদদের কাউকে সমস্যায় পড়তে হবে না। সূত্রের খবর, তাঁদের সেই সময়ে ফোনে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে কথাও বলানো হয়।

    উল্লেখ্য, রাজধানীর পরিস্থিতি যখন এতটা নাটকীয়, তখন রাজ্যেও বিধানসভার ‘আসল তৃণমূল’ বিধায়কদের ব্লক সাফ জানিয়েছে, তারা ঘাসফুল প্রতীক ব্যবহারের অধিকার পেতে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হবে। তা হলে কি ভবিষ্যতে, কিছুটা সময় পরে আবার একটা এনসিপিআই– আসল তৃণমূল ‘মার্জার’ দেখা যাবে?

    ধাঁধার থেকেও জটিল অঙ্ক।

  • Link to this news (এই সময়)