এই সময়: ‘আসল নকল’ নিয়ে ধন্দের মধ্যেই বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যে ঘোষণা করে দিয়েছেন যে, তাঁরাই ‘আসল’ তৃণমূল কংগ্রেস। এই আবহে আবার বিরোধী সচেতক আখরুজ্জমান রবিবার জানালেন, যেহেতু তাঁরা ‘অরিজিনাল’ তৃণমূল, তাই ‘ঘাসফুলের উপরে জোড়াফুল’ প্রতীকের অধিকার চেয়ে নির্বাচন কমিশনে যাবে এই বিদ্রোহী শিবির। অন্যদিকে, লোকসভার বিদ্রোহী সাংসদরা ত্রিপুরার ‘দ্য ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েনস’ পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (এনসিপিআই) সঙ্গে মিশে যাওয়ার পরিকল্পনা শুরু করেছেন। ফলে তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়ক এবং বিদ্রোহী লোকসভা সাংসদদের টিম পৃথক পথে এগোতে পারে বলে দেখা দিয়েছে জল্পনা।
ঋতব্রত–আখরুজ্জমানের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবিরে এখনও জোড়াফুলের ৬৪ জন বিধায়ক রয়েছেন। এমএলএ–রা বাদে বিভিন্ন ডিস্ট্রিক্টে ছড়িয়ে থাকা সভাপতি, চেয়ারম্যান, শাখা সংগঠনের নেতৃত্বও বিদ্রোহীদের দিকে আসছেন বলে আখরুজ্জমান রবিবার জানান। তিনি বলেন, ‘তৃণমূলের যত জেলা নেতৃত্ব, শাখা সংগঠনের নেতৃত্ব আছেন, সবাই মুক্তির স্বাদ নিতে আমাদের ব্লকে যোগ দিচ্ছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য আমরা বেশি দিন অপেক্ষা করব না। আমরাই আসল তৃণমূল। আমরা প্রতীকের দাবি নিয়ে দ্রুত নির্বাচন কমিশনের কাছে যাব।’
যদিও বিদ্রোহী বিধায়ক দলের অন্দরের খবর, বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা হবে। এই শিবিরের প্রথম সারির এক নেতা রবিবার বলেন, ‘এ ব্যাপারে ৬৪ জন বিধায়কের টিম শেষ পর্যন্ত কী করবে, তা নিয়ে আরও আলোচনা হবে। বিদ্রোহী সাংসদরা এনসিপিআই–এ গেলেও বিদ্রোহী বিধায়করা ‘আসল তৃণমূল’ তৈরি করতে পারেন। এ নিয়ে আজই গভীর রাতে বৈঠকে বসে রণকৌশল ঠিক করার কথা। সবই আইন বাঁচিয়ে করা হচ্ছে।’
চেষ্টা করেও অবশ্য এ নিয়ে তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফোন করা হলেও জবাব মেলেনি তাঁর।
এ দিকে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে যে তাঁরা মানতে রাজি নন, এ দিন তা–ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন আখরুজ্জমান। মমতার উদ্দেশে বিরোধী সচেতক বলেন, ‘অভিষেককে দলে রাখলে আপনার সঙ্গে আমরা দল করতে পারব না। তৃণমূল প্রতিষ্ঠার সময়ে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের ৯০ শতাংশ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। আমরাই মূল তৃণমূল কংগ্রেস— (নির্বাচন কমিশনে) এই দাবি করব। আমাদের সঙ্গে সংখ্যা রয়েছে।’
মমতাকে যে তাঁরা ‘পরামর্শদাতা’ হিসেবে দেখতে চান, সে কথা আগেই জানিয়েছেন ঋতব্রত–আখরুজ্জমানরা। এবং কালীঘাটের অনুগামী তৃণমূল নেতারা এই প্রস্তাব উড়িয়েও দিয়েছেন। ১৯৯৮–এ তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেছিলেন মমতা, তিনিই দলের সর্বোচ্চ নেত্রী বলে এই নেতাদের বক্তব্য। শনিবার মমতার উপস্থিতিতে কালীঘাটে তৃণমূলের জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকে সায়নী ঘোষের জায়গায় অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়কে যুব তৃণমূলের সভাপতি এবং দুই পোড়খাওয়া নেতা সৌগত রায় ও জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে জাতীয় কর্মসমিতির সদস্য করা হয়েছে।
আবার সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্রোহী সাংসদদের দিকে চলে যাওয়ার পরে তৃণমূলের উত্তর কলকাতা সাংগঠনিক জেলার সভাপতি হয়েছেন কুণাল ঘোষ। এ প্রসঙ্গে সুদীপ রবিবার বলেন, ‘জন্মলগ্ন থেকে দলটির (তৃণমূল) সুখে–দুঃখে জড়িত ছিলাম৷ সুতরাং একটা যোগ তো থাকেই৷ তবে কিছু করার নেই৷ ৩৪ জন সাংসদকে নিয়ে সংসদীয় দলের নেতা ছিলাম৷ একটি ভিডিয়ো কনফারেন্সের মাধ্যমে আমাকে সরিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সংসদীয় দলের নেতা করা হয়েছিল৷ তার আগে ১৫ বছর নেতা থেকেছি, ১৫ বছর হুইপ ছিলাম৷ লোকসভা-বিধানসভা মিলিয়ে দশ বার ভোটে জিতেছি, বিধানসভায় পাঁচ বার জিতেছেন আমার স্ত্রী৷ এমন পরিবারের সদস্যকে জেলা সভাপতি পদে রাখা হলো কি না, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তার সময় আমার আর নেই৷’
বিদ্রোহী বিধায়ক শিবিরও তৃণমূলের জাতীয় কর্মসমিতি–সহ বর্তমানে যে সাংগঠনিক কাঠামো অক্ষত রয়েছে, তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাইছে না। দিন কয়েক আগে কালীঘাটে জাতীয় কর্মসমিতির এমনই এক বৈঠকে মালা রায়কে মহিলা তৃণমূলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কলকাতা দক্ষিণের এই প্রবীণ সাংসদও বিদ্রোহী এমপি–দের দিকে চলে গিয়েছেন। যুব তৃণমূলের সভানেত্রী পদে বহাল রাখা হয়েছিল সায়নীকে, তিনিও শিবির বদলেছেন। এই প্রেক্ষাপটে কালীঘাটের নিয়ন্ত্রণাধীন তৃণমূল মূল পার্টি নয় বলে বিদ্রোহী শিবিরের মত। এই দলে থাকা আর এক উল্লেখযোগ্য মুখ সন্দীপন সাহা একটি সংবাদসংস্থাকে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘দুই–তৃতীয়াংশের বেশি বিধায়ক এক জায়গায় রয়েছেন। লোকসভাতেও শুনছি দুই–তৃতীয়াংশ সাংসদ আছেন এক জায়গায়। ফলে ওদের (কালীঘাট–অনুগামী) মূল পার্টি বলা যায় না। ওই জাতীয় কর্মসমিতি কয়েক দিন অন্তর বদলাতে হবে। কারণ যাঁকে ওই কমিটিতে রাখা হবে, তিনি যে সঙ্গে থাকবেন, তার নিশ্চয়তা নেই। এই পরিস্থিতিতে ওয়ার্কিং কমিটি না থাকাই ভালো।’
প্রতীকের অধিকার চেয়ে বিদ্রোহী বিধায়কদের ‘আসল তৃণমূল’ হওয়ার পরিকল্পনাকে আবার গুরুত্বই দিতে চাইছে না গেরুয়া ব্রিগেড। বিজেপির নেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘ভোটে হেরে যাওয়ার পরে তৃণমূলের অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাইছেন। এটা তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ নিয়ে আমরা মাথা ঘামাতে চাই না। তৃণমূল দল ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে।’
অফিশিয়াল প্রতীক এবং নামের অধিকার চেয়ে বিদ্রোহী শিবির নির্বাচন কমিশনে গেলে সেখানে কালীঘাটও পাল্টা দাবি জানাবে। সে ক্ষেত্রে দু’পক্ষের কথা শুনে, নথি যাচাই করে, শুনানির মাধ্যমে কমিশনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদদের বক্তব্য।