ব্যাংক ঋণে ৪১ হাজার কোটির জালিয়াতি, ২ বছরে বৃদ্ধি সাড়ে ৪ গুণ, গত অর্থবর্ষের রিপোর্টে উদ্বিগ্ন আরবিআই
বর্তমান | ১৫ জুন ২০২৬
বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: ঋণ সংক্রান্ত জালিয়াতিতে দিশাহারা দেশের ব্যাংকগুলি। জালিয়াতির অঙ্ক যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তাতে চিন্তিত রিজার্ভ ব্যাংকও। তাদের বার্ষিক রিপোর্ট বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে দেশে ঋণ সংক্রান্ত জালিয়াতির অঙ্ক ছিল ৮ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে সেই অঙ্ক পৌঁছেছে ৪০ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, দু’বছরের মধ্যে এই ধরনের জালিয়াতি বেড়েছে প্রায় সাড়ে চার গুণ। ঋণ জালিয়াতির এই রমরমায় ঘুরপথে আম জনতার টাকাই লুট হচ্ছে। কারণ, দিনের শেষে ব্যাংকের মুনাফার উপর চাপ বাড়াচ্ছে বিপুল টাকার প্রতারণা। গ্রাহকরা সুদের হারে যেটুকু সুরাহা পেতে পারতেন, তা অধরা থেকে যাচ্ছে।
জাল নথি দেখিয়ে ঋণ নিয়ে গায়েব হয়ে যাওয়াই হোক বা ভুয়ো সংস্থা খুলে ঋণ নেওয়া—জালিয়াতির কায়দা ভিন্ন ভিন্ন। গত দু’বছরে এই ধরনের জালিয়াতি কী হারে বেড়েছে, তা স্পষ্ট রিজার্ভ ব্যাংকের বার্ষিক রিপোর্ট থেকেই। গত অর্থবর্ষ অর্থাৎ ২০২৫-২৬ সালে দেশে মোট ব্যাংক প্রতারণার অঙ্ক ছিল ৪৮ হাজার কোটি টাকা। এর ৮৫ শতাংশই ঋণ সংক্রান্ত জালিয়াতি। অথচ দু’বছর আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে মোট ৩৫ হাজার ৮০০টি জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছিল। এর মধ্যে ২৮ হাজার ৮৩৬টি জালিয়াতি ছিল ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড, ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা ডিজিটাল পেমেন্ট সংক্রান্ত। গত অর্থবর্ষে এই ধরনের প্রতারণার সংখ্যা এক ধাক্কায় নেমে এসেছে ২৯৩টিতে। প্রতারণার অঙ্ক মাত্র ২৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ২০২৩-২৪ সালে ঋণ সংক্রান্ত প্রতারণার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ১০৫টি। সেই সংখ্যা দু’বছরের মাথায় বেড়ে হয়েছে ৮ হাজার ৬৪০। তথ্য বলছে, গত দু’বছরে বৈদেশিক লেনদেন, ডিপোজিট, নগদ, চেক ও ড্রাফট, ব্যাংকের শাখাগুলির অন্তর্বর্তী লেনদেন সংক্রান্ত প্রতারণা ইত্যাদি ঘটনা এবং এভাবে জালিয়াতির অঙ্ক কমে এসেছে। তার ঠিক উলটো পথে হেঁটেছে ঋণ সংক্রান্ত জালিয়াতি।
কেন বাড়ছে এই ধরনের প্রতারণা? অল ইন্ডিয়া ব্যাংক অফিসার্স কনফেডারেশনের রাজ্য সম্পাদক শুভজ্যোতি চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘ব্যাংকিং সেক্টরে ঋণ সংক্রান্ত গোটা বিষয়টিতেই গলদ রয়েছে। ব্যাংকে কর্মচারী ও অফিসারদের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। তাই ব্যাংকের নিজস্ব কাজেও মিডল ম্যান, থার্ড পার্টির রমরমা। বাইরের এজেন্সি ভাড়া করা হচ্ছে। যাঁরা ব্যাংকের নিজস্ব কর্মী, তাঁদের টার্গেট বেঁধে দিয়ে বিমা সহ একাধিক প্রকল্প বিক্রিতে বাধ্য করা হচ্ছে। ফলে কড়া নজরদারি বা যথাযথ নথি যাচাই ছাড়াই ঋণ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আবশ্যিকভাবে যেসব নথি ও বিষয়গুলি বিবেচনা করা উচিত, তার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছেন না কর্মীরা।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘ঋণ সংক্রান্ত প্রতারণায় আমরা ব্যাংকের কর্মী বা অফিসারকে গ্রেপ্তার হতে দেখি। কিন্তু তার পিছনে মাস্টারমাইন্ড কে, তা কি আদৌ সামনে আসে? এর জন্য কঠোর শাস্তি দরকার।’ অল ইন্ডিয়া ব্যাংক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় সভাপতি রাজেন নাগর বলেন, ‘এভাবে যে টাকা প্রতারণা হচ্ছে, তা কিন্তু জনগণেরই টাকা। তাই রিজার্ভ ব্যাংকের দায়িত্ব কঠিন নিয়ম জারি করা, যাতে কোনোভাবেই ঋণ জালিয়াতি না হয়। যাঁরা প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও জরুরি।’