জাতিগত শংসাপত্র ইস্যু: নড়েচড়ে বসল প্রশাসন, এবার খতিয়ে দেখা হচ্ছে নথি
বর্তমান | ১৫ জুন ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া উত্তর ২৪ পরগনায় পরিচয় সত্তার রাজনীতি নতুন বিষয় নয়। দেশভাগ, উদ্বাস্তু প্রবাহ, সীমান্ত পেরিয়ে আসা মানুষের বসতি— সব মিলিয়ে এই জেলার সামাজিক ও রাজনৈতিক চরিত্র বরাবরই অন্য জেলার তুলনায় আলাদা। সেই জেলার রাজনীতিতেই এবার নতুন করে সামনে এসেছে জাতিগত শংসাপত্র বা কাস্ট সার্টিফিকেটের বৈধতার প্রশ্ন। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, গত এক দশকেরও বেশি সময়ে জেলার বিভিন্ন মহকুমা থেকে ইস্যু হওয়া জাতি শংসাপত্রের নথি খতিয়ে দেখার কাজ শুরু হয়েছে। বিশেষ নজরে রাখা হচ্ছে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচনে লড়া প্রার্থী, পঞ্চায়েত স্তরের পদাধিকারী এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত শংসাপত্রগুলি। এই তৎপরতার নেপথ্যে রয়েছে বনগাঁ মহকুমার একটি সাম্প্রতিক ঘটনা। ক’দিন আগেই এক পঞ্চায়েতের প্রাক্তন প্রধানকে ভুয়ো জাতিগত শংসাপত্র তৈরির অভিযোগে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্তে তাঁর স্বামীর নামও উঠে আসে। পরে তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়। ওই ঘটনার পর থেকেই জেলার প্রশাসনিক মহলে পুরানো নথি ও শংসাপত্র নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশাসনের একাংশের দাবি, অভিযোগ উঠলেই তা সত্যি প্রমাণিত হয় না। কিন্তু এক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ভুয়ো শংসাপত্রের অভিযোগ এবং গ্রেপ্তারির ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই গোটা ব্যবস্থা নতুন করে খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।তাছাড়া, এই ইস্যুতে সরব হয়েছে বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে জেলার একাধিক এলাকায় সংরক্ষিত আসনের রাজনৈতিক সমীকরণকে সামনে রেখে ভুয়ো বা প্রশ্নবিদ্ধ জাতিগত শংসাপত্র তৈরি করা হয়েছে। পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের সময় বহু ক্ষেত্রে প্রকৃত জাতিগত পরিচয়ের পরিবর্তে কাগজে-কলমে পরিচয় তৈরি করে সংরক্ষিত আসনের টিকিট দেওয়া হয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ওই শংসাপত্রের ভিত্তিতে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুবিধাও ভোগ করেছেন কেউ কেউ। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, শুধু সাম্প্রতিক অভিযোগ নয়, গত কয়েক বছরে শংসাপত্র ইস্যুর ধরন এবং সংখ্যা নিয়েও খোঁজখবর শুরু হয়েছে। আবেদনকারীদের জমা দেওয়া বংশপরিচয় সংক্রান্ত নথি, স্থানীয় স্তরে যাচাইয়ের রিপোর্ট এবং শংসাপত্র অনুমোদনের প্রক্রিয়া নিয়ম মেনে হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এক কর্তার কথায়, ‘উত্তর ২৪ পরগনার মতো সীমান্তবর্তী জেলায় পরিচয় সংক্রান্ত নথির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। তাই অভিযোগ সামনে এলে তা গুরুত্ব দিয়েই দেখা হয়।’
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিষয়টির গুরুত্ব শুধুমাত্র প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিকও। উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ, বাগদা, গাইঘাটা, স্বরূপনগর, হাবড়া, দেগঙ্গা, অশোকনগর এবং জেলার আরও কয়েকটি এলাকায় সংরক্ষিত আসন স্থানীয় ক্ষমতার সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে জাতিগত শংসাপত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে পঞ্চায়েত ও স্থানীয় রাজনীতিতে— এমনটাই মনে করছেন অনেকে।