‘লাটুদা, একটা ডিম টোস্ট ছাড়ো, ফটাফট।’ বাইক থেকে নামতে নামতে কথাগুলো ছুড়ে দিল সঞ্জীব। সকালের এই সময়টায় প্রতিদিনই দোকানের সামনে ছোটখাটো ভিড় লেগে থাকে। বেশিরভাগই রাজমিস্ত্রি। জলখাবার খেয়ে কাজে যায়। দোকানের ভিতর থেকে ভাজা তেল, মশলার গন্ধ আসছে। ভাঁড় ফেলার বিনের পাশে অলস ভঙ্গিতে শুয়ে রয়েছে একটা কুকুর। তার পাশেই বেঞ্চে খবরের কাগজ মুখে বসে ব্রজমোহন। পরনে হাফ হাতা পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি। পাশে রাখা এক ভাঁড় চা কখন জুড়িয়ে গিয়েছে। সঞ্জীবকে দেখে এক নিঃশ্বাসে পুরোটা গলায় ঢেলে দিয়ে বলে উঠলেন, ‘শুনলাম, তোরা নাকি রঞ্জনকে ডিম মেরেছিস?’
কান এঁটো করা হাসি নিয়ে তাকাল সঞ্জীব। হেলমেটটা বাঁ হাতের কনুইয়ে ঝুলছে। ডান হাতে জিনসের হিপ পকেট থেকে চিরুনি বের করে চুলে চালিয়ে নিয়ে কাটাকাটা গলায় বলল, ‘ঠিকই শুনেছ। পঞ্চায়েত প্রধান হয়ে তিনতলা বাড়ি? ব্যাটা পাক্কা চোর।’ মুখ দিয়ে চুক চুক করে শব্দ করলেন ব্রজ, ‘তাই বলে ডিম ছুড়বি? থানা পুলিশ আছে কী করতে? এটা কিন্তু তোরা ঠিক করছিস না।’
মুখে একটা হাসি খেলে গেল সঞ্জীবের। ভ্রু দু’টো নাচিয়ে বলল, ‘ববি দেওলের সেই ডায়লগটা শুনেছ?’ থতমত খেলেন ব্রজ, ‘কোনটা?’ ‘ফয়সলা অন দ্য স্পট। এখন থেকে এটাই হবে।’ ব্রজ চুপ করে গেলেন। লাটুদা টোস্টের উপরে গোলমরিচ ছড়াতে ছড়াতে বলল, ‘বিচারও এখন ফাস্ট ফুডের মতো। ধরো, আর মারো।’
বঙ্গ রাজনীতিতে এখন এ এক নতুন ট্রেন্ড। তৃণমূল নেতা দেখলেই পটাপট উড়ে আসছে ডিম। গায়ের জ্বালা মেটাচ্ছে জনতা। শুরুটা হয়েছিল তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে। ‘ভোট পরবর্তী হিংসায় নিহত’ দলীয় কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে সোনারপুরে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয় তাঁকে। প্রথমে বিক্ষোভ শুধু কালো পতাকা দেখানো আর ‘চোর চোর’ স্লোগানেই আটকে ছিল। কিন্তু অভিষেক যত এগিয়েছেন, ‘জনরোষ’ তত বেড়েছে। একই সঙ্গে ঢিলে হয়েছে তাঁর নিরাপত্তা বেষ্টনীও। সেই সুযোগেই শুরু হাতাহাতি-ধস্তাধস্তি। তার মাঝেই তৃণমূল নেতাকে লক্ষ্য করে আচমকা ডিম ছোড়া শুরু হয়। অভিযোগ, সুযোগ বুঝে চড়-থাপ্পড়ও বসিয়ে দেন কেউ কেউ! পরে যখন বিক্ষোভকারীদের চক্রব্যূহ থেকে অভিষেক বেরোলেন, তাঁর গোটা শরীরে ডিমের খোসা লেগে। চোখ-মুখও কুসুমে মাখামাখি। আর তার পর থেকেই বাংলার দিকে দিকে শুরু হয়ে যায় ‘ডিম থেরাপি’।
পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বার এমন দৃশ্য দেখা গেলেও, ডিম ছোড়ার ইতিহাস কিন্তু বহু পুরোনো। রোমান গভর্নর ভেসপিয়ানকে শালগম ছুড়ে মেরেছিলেন প্রজারা। সেটা ৬৩ খ্রিস্টাব্দ। সেই শুরু। পরে মধ্যযুগের ব্রিটেনে সেটাই ভয়াবহ রূপ নেয়। সেই সময়ে ‘পিলোরি’ নামে এক ধরনের কাঠের খাঁচা হতো। তার মধ্যে হাত আর মাথা আটকে বড় রাস্তার মোড়ে বসিয়ে দেওয়া হতো কুখ্যাত অপরাধীদের। আর তার দিকে ডিম, পচা ফল, আবর্জনা ছুড়ত সাধারণ মানুষ। ১৮৩৭ সালে আইন পাস করে এই প্রথা রদ করে দেওয়া হয়। তবে ততদিনে ডিমের জয়যাত্রা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে। রাজনীতির ময়দান হোক কিংবা থিয়েটারের মঞ্চ, অপছন্দ হলেই শুরু ‘ডিমাঘাত’।
শুধু সাধারণ রাজনীতিবিদ নন। খোদ প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতিরা পর্যন্ত ডিমের হাত থেকে রেহাই পাননি। সেটা ১৯১৭ সাল। ভোটাধিকারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন মহিলারা। এতেই ক্ষেপে যান ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড। মেয়েরা আবার ভোট দেবে কী! ঘরদোর সামলাক। আর যায় কোথায়! একটি সরকারি সভায় সুযোগ পেয়ে তাঁকে ডিম ছুড়ে মারলেন মহিলারা। হইহই পড়ে গেল চারদিকে। আবার ১৯৩২-এর চরম অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে প্রচারে বেরিয়েছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভার। খুব ক্ষেপে গিয়েছিলেন সাধারণ মানুষ। দু’বেলা খাবার টাকা নেই, আর তুমি এসেছ ভোট চাইতে! তাঁর মুখেই ডিম ছুড়ে মারে জনতা।
ধীরে ধীরে ইংরেজি ভাষার অভিধানে একটা নতুন শব্দ জুড়ে গেল ‘এগিং’। ডিম ছোড়া হয়ে উঠল প্রতিবাদের ভাষা। মানুষের হাতে পাথর ছিল, লাঠি ছিল। তবু তারা ডিম বেছে নিল। কারণ, ডিমে রাগ আছে, কিন্তু হত্যার অভিপ্রায় নেই। আছে অপমানের কুসুম। তাই অপমানিত হওয়ার হাত থেকে বাঁচতেই একটা দেশের আস্ত পুলিশ বাহিনী তৈরি হয়েছিল। সেটা ১৯১৭ সাল। কুইন্সল্যান্ডের একটি জনসভায় ভাষণ দিচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী বিল হিউজ। আচমকাই উড়ে এল ডিম। রাগে অভিযুক্তকে গুলি করতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কোমরে হাত দিয়ে দেখেন, রিভলভার আনেননি। পুলিশকে বললেন, ‘পাকড়াও করো।’ কিন্তু সকলকে অবাক করে দিয়ে অম্লানবদনে পুলিশ জানিয়ে দিল, এটা প্রধানমন্ত্রীর উপরে আক্রমণ, মানে রাষ্ট্রীয় বিষয়। কুইন্সল্যান্ড পুলিশ শুধু স্থানীয় সমস্যা সামলায়। প্রধানমন্ত্রী হতবাক। রাজধানীতে ফিরেই নতুন বাহিনী তৈরির নির্দেশ দিলেন তিনি। জন্ম নিল ফেডেরাল পুলিশ।
তবে অদ্ভুত ভাবে অপমান সামলে নেওয়ার ক্ষমতাও কারও কারও থাকে। ২০০৩-এ ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন হলিউড অভিনেতা আর্নল্ড শোয়ার্ৎজ়েনেগার। লং বিচে নির্বাচনী প্রচারে তাঁকে ডিম ছুড়ে মারলেন এক যুবক। যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে জ্যাকেট খুলে হাসি মুখে শোয়ার্ৎজেনেগার বলে উঠেছিলেন, ‘এ বার একটা বেকন দিন। ডিম আর বেকন একসঙ্গে খেতে হয়।’ অবশ্য সব সময়ে এমন হাসিমজা হয় না। ডিমের ঘায়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী (২০০৪) ভিক্টর ইয়ানুকোভিচকে। অনেকে ভেবেছিলেন ইট বা পাথর লেগেছে বোধহয়। পরে জানা যায়, সেটা ডিম।
ডিমের আঘাতে অবশ্য অভিষেকও হাসপাতালে গিয়েছিলেন। কিন্তু কলকাতার নামকরা দু’টো বেসরকারি হাসপাতালই তাঁকে ভর্তি নেয়নি, অভিযোগ এমনটাই। তা নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। তবে সেই দিন থেকে ব্রিগেডের ‘ডিম্ভাত’ ব্যুমেরাং হয়ে দাঁড়াল তৃণমূলের নেতাদের কাছে। নিমতা থানায় স্থানীয় তৃণমূল কর্মীদের উপরে হামলার ঘটনায় স্মারকলিপি দিতে গিয়েছিলেন সাংসদ সৌগত রায়। তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে ডিম ছোড়েন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। সৌগতর দাদা ও বিজেপি নেতা তথাগত রায় রসিক মানুষ। ফেসবুক পোস্টে লিখলেন, ‘ডিমের গ্রেডেশন আছে। যেগুলো একেবারে পচা, ভাজা, সেদ্ধ কিছুই করা যায় না, তার নাম বোমপচা।’ এর পরেই তাঁর পরামর্শ, ‘তৃণমূলের চোরেদের উপরে ভালো ডিম নষ্ট করবেন না। ওগুলো খেয়ে নিন। বোমপচা কাজে লাগান।’
তথাগত প্রকারান্তরে ডিম ছোড়ায় সমর্থন দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠলেও, রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব অবশ্য এই ধরনের ঘটনা থেকে দলগত ভাবে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। প্রায় সব ঘটনার ক্ষেত্রেই তাঁরা বুঝিয়ে দিয়েছেন, এতে তাঁদের দলের কেউ জড়িত নন। এ সব সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। কোনও কোনও ঘটনায় তৃণমূলের একাংশও জড়িত বলে দাবি করেছেন বিজেপি নেতারা। অভিষেকের ঘটনা প্রসঙ্গে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘রাজ্যে সরকার বদলের পর তৃণমূল-তৃণমূল মারামারি করছে। আসলে গোটা ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ২৫-৭৫ ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে লড়াই। কেউ পেয়েছে। আর কেউ পায়নি। যাঁরা পাননি, সেই অতৃপ্ত আত্মারা এখন লড়াইয়ে নেমেছেন।’
তবে সব ক্ষেত্রেই যে দূরত্ব রচনা সম্ভব হয়েছে, তা-ও নয়। দিন তিনেক আগে কৃষ্ণনগর আদালতের সামনে কয়েক জন জমায়েত করেছিলেন তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রকে লক্ষ্য করে ডিম ছুড়বেন বলে। যদিও তাঁদের সেই আশাপূরণ হয়নি। সেই দিন কোনও অজ্ঞাতকারণে আদালতমুখো হননি মহুয়া। তবে আদালতের সামনে জমায়েতের যে ভিডিয়ো প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে দেখা গিয়েছে, বিক্ষোভকারী মহিলারা নিজেদের বিজেপির মহিলা মোর্চার কর্মী বলে দাবি করেছেন। এক জনকে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘মহুয়া মৈত্র আমাদের দেবী কালীকে নিয়ে খারাপ কথা বলেছিল। তখন থেকেই ওর বিরুদ্ধে আমাদের রাগ। ওর গায়ে ডিম ছুড়ে মারব।’ পাশ থেকে অন্য এক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘শুধু ডিম না, পচা ডিম। পচা টমেটোও এনেছি আমরা।’ মহুয়াও পরে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তাঁর গায়ে ডিম ছোড়ার মতো কাণ্ড ঘটানোর কথা ভাবলে সব ক’টাকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবেন! যদিও এতে পিছু হটেনি বিজেপি। দলের নদিয়া উত্তর সাংগঠনিক জেলার মুখপাত্র সন্দীপ মজুমদারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ‘আমরা বলব, উনি আন্তর্জাতিক আদালতে যান। কিন্তু উনি কৃষ্ণনগরে ফিরলেই ঝাঁটা-জুতো দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হবে।’
আশঙ্কা এখানেই। অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগছে, এই প্রবণতা কি শুধু ডিমেই আটকে থাকবে, নাকি ডিম ফেটে ঝাঁটা-জুতোও বেরোতে শুরু করবে এ বার? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মত, বিক্ষোভকারীদের চোখে-মুখে হিংস্রতার ছাপ থাকলেও, ডিমের মতো নিরীহ বস্তু দিয়ে এ ভাবে রাগ উগরে দেওয়ার প্রবণতা প্রাথমিক ভাবে অনেকের মনেই আমোদ জুগিয়েছিল। বঙ্গ-রাজনীতির গাম্ভীর্য থেকে খানিক ‘কমিক রিলিফ’ পেয়েছিলেন তাঁরা। ভাইরাল হওয়া ভিডিয়ো ক্লিপিংয়ের সৌজন্য হাসির খোরাক জুগিয়েছিল ডিমের ভয়ে জয়প্রকাশ মজুমদারের মতো নেতাদের পুলিশের পিছনে লুকিয়ে পড়ার দৃশ্য।
কিন্তু ডিম নিরীহ হলেও উন্মত্ত জনতা তো নয়! তারই প্রমাণ মিলেছে উজ্জ্বল বিশ্বাসের বাড়িতে। সেখানে প্রাক্তন শুধু মন্ত্রীর কপালে ডিম ফাটিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি সেই জনতা। অভিযোগ, তাঁর বাড়িতে কার্যত হামলা হয়েছে। এক মহিলাকেও মারধর করার অভিযোগ উঠেছে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে। সেই মহিলার ‘দোষ’, তিনি বিক্ষোভকারীদের শান্ত হতে বলেছিলেন। উজ্জ্বলের বক্তব্যও শোনার অনুরোধ করেছিলেন। নিন্দুকদের একাংশ বিস্ময় প্রকাশ করেছে, সৎ পরামর্শ আর বাঙালি কবে কানে তুলেছে!
প্রতিদিন এমন ডিম হামলার খবর দেখে-পড়ে সাধারণ মানুষের কেউ কেউ একপ্রকার উদ্বিগ্নও। ইতিউতি প্রশ্ন ঘুরছে, চাহিদা আর জোগানের খেলায় টান পড়বে না তো? এমন প্রশ্ন অবশ্য ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন পোলট্রি ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারি মদন মোহন মাইতি। তিনি অবশ্য রাজনৈতিক আকচাআকচিতে ঢুকতে চাননি। শুধু বললেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে প্রতিদিন সাড়ে ৪ কোটি ডিম লাগে। আমরাই বেশির ভাগ উৎপাদন করি। শুধু ৭০-৮০ লাখ বাইরে থেকে আসে।’ বোঝাতে চাইলেন, এতে ফারাক কিছু হবে না। দামও আয়ত্বের মধ্যেই রয়েছে। মদনমোহনের হিসেবে, ‘একটা ডিমের দাম সাড়ে ৬ টাকা। ক্রেটে ৩০টা থাকে, আর পেটিতে ২১০টা। পাইকারি কিনলে দাম কম।’ তাই ‘সানডে হো ইয়া মানডে, রোজ খাও আন্ডে’। কোনও চিন্তা নেই।
কিন্তু এখন তো শুধু খাওয়া নয়, তৃণমূল নেতাদের গায়ে ছুড়ে মারার জন্য ক্রেটের পর ক্রেট সম্ভবত আগেভাগে মজুতও করে রাখা হচ্ছে! চিন্তা সেখানেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মত, এমন ‘ফয়সলা অন দ্য স্পট’ মানসিকতা কিন্তু আসলে বিচারব্যবস্থার প্রতি অনাস্থারই ইঙ্গিত। আবার অনেকের মতে, ডিম ছুড়ে সাধারণ মানুষ কাউকে মেরে ফেলতে চাইছেন না। তিনি চাইছেন, ক্ষমতার বৃত্তে থাকা ব্যক্তিটি একটু থমকে দাঁড়ান। বুঝুন, সম্মানের সঙ্গে অসম্মান দেওয়ার ক্ষমতাও জনতার আছে। ডিম তাই প্রতিবাদের সবচেয়ে অদ্ভুত অস্ত্র। এতে রক্ত ঝরে না, কিন্তু মুখ ঝলসে যায় লজ্জায়। হাড় ভাঙে না, অথচ ভাবমূর্তি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। পাথর ছুড়লে শহিদ হয়। ডিম ছুড়লে ব্যঙ্গচিত্র।
তবে সেই প্রবণতা যদি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলাকে ‘ব্যঙ্গ’ করতে থাকে, তা যথেষ্ট উদ্বেগের বলেই মত বঙ্গ-রাজনীতির একনিষ্ঠ পর্যবেক্ষক তথা অধ্যাপক শুভময় মৈত্রের। এই সময় অনলাইনকে তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক অতীতে এমন প্রবণতা দেখা গিয়েছে বলে তো মনে হয় না। তবে বিষয়টি মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়। যিনি ডিম ছুড়ছেন, তিনি ইটও ছুড়তে পারেন। এটা অবিলম্বে আটকানোর প্রয়োজন আছে। এটা ঠিকই যে, মানুষের মধ্যে রাগ জমে ছিল। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সেই রাগ এখন মানুষ উগরে দিচ্ছেন। কিন্তু তার বহিঃপ্রকাশের ধরন নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। এই রকম ছোড়াছুড়ির প্রবণতা সমর্থন করা যায় না।’
রাজনীতির ইতিহাসে ডিমের একটা আলাদা জায়গা রয়েছে। বলা হয়, এটা ক্রোধের শেষ ধাপ নয়, বরং ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়া। এমন এক মুহূর্ত, যখন সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, তাঁর কথা কেউ শুনছে না। ভোটের দিন এখনও আসেনি, আদালতের রায় কবে মিলবে, কেউ জানে না। কিন্তু ক্ষোভেরও তো ভাষা দরকার। ডিম সেই ভাষারই ডিম্বাকার রূপক। অবশ্য এই ভাষা নিখুঁত নয়। এতে বিপদও আছে। কারণ, জনরোষের অভিধান একবার বদলে গেলে, ডিমের জায়গায় অন্য কিছু আসতে সময় লাগে না। তাই এটা একটা সতর্কবার্তাও। শুভময়ের মত, ‘এ বিষয়ে সরকার-প্রশাসনের বার্তা দেওয়া উচিত। আইনের চোখে ডিম-টমেটো ছোড়াছুড়ির কী সাজা রয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। প্রশাসন যতক্ষণ না তা স্পষ্ট ভাবে জানাচ্ছে, ততক্ষণ মানুষের এ নিয়ে ধারণা স্পষ্ট হবে না।’
‘তা হলে কী বলতে চাইছিস? এটাই এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়াল।’ হাহাকার করে উঠলেন ব্রজ। ডিম টোস্টের শেষ টুকরোটা পরম তৃপ্তির সঙ্গে মুখে পুরল সঞ্জীব। কোনও উত্তর দিল না। ধীরে সুস্থে হাত ধুয়ে, রুমালে মুখ মুছে মোটরবাইকে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল। বাইকের কালো ধোঁয়া এসে লাগল ব্রজর মুখে। লাটুদা সসপ্যানে নতুন ডিম ভাঙতে ভাঙতে বলল, ‘ডিমেরও কপাল আছে ব্রজদা। কোনওটায় ছানা হয়, কোনওটায় অমলেট, কোনওটায় আবার...।’ কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ফ্যাট করে একটা আওয়াজ হলো। সসপ্যানের উপরে ছড়িয়ে পড়ল হলুদ কুসুম।